সমাজ এবং মানসিকতা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

সমাজ এবং মানসিকতা

ফরিদা ইয়াসমিন ৮:০৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৯, ২০১৮

সমাজ এবং মানসিকতা

একজন মেয়ে শিশু জন্ম নেয়ার পর থেকে বেড়ে উঠা পর্যন্ত যতটা বাধার সম্মুখীন হয়, সেই তুলনায় ছেলে শিশুর জীবনটা অনেক বেশি সহজ। যার প্রভাব মানসিক বিকাশেও পড়ে। যেভাবে মুক্ত পরিবেশে একটা ছেলে বড় হয় একটা মেয়ে তার কিঞ্চিতই সুযোগ পেয়ে থাকে। ঘরে-বাইরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ছেলে আর মেয়ে শিশুর বৈষম্যটা প্রকট।

অনেকে বলবেন যুগ পাল্টেছে... কিন্তু যুগ পাল্টালেও কি পুরনো ধারণাগুলোতে সে রকম কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে? আজকাল প্রায় সব কিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু মনে? মন মানসিকতায় আমরা কি খুব একটা এগিয়ে যেতে পেরেছি?

যে সমাজের মূল চেতনাতে প্রথিত; নারী মানে নমনীয় কমনীয় রমনীয় বস্তু সম কিছু... সেই সমাজের কাছে বেশি কিছু আশা করা যায় না।

তবে সোনার চামচ মুখে নিয়ে যারা জন্মে তাদের পক্ষে এই ভগ্নদশা বুঝা সম্ভব নয়! এই শ্রেণির সংখ্যা অতি নগণ্য... এরা ব্যতিক্রম হতে পারে (যদিও অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আর স্বাধীন সত্তা এক নয়; ব্যক্তিগত ভোগ বিলাস মানুষের চিন্তার ঘরে কপাট পরিয়ে দিতে সক্ষম, ব্যতিক্রম থাকতে পারে)...

আমার দেশে নারী মানে মানিয়ে নেয়া মেনে নেয়া। নারী মানেই ত্যাগ স্বীকার করে নেয়ার অনন্য উদাহরণ (তা স্বেচ্ছায় হোক বা বাধ্য হয়েই হোক)।

প্রতিদিন নিজ অবস্থানে হেয় হতে হতে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করে তিল তিল করে এগিয়ে চলে যে তার পরিচয় নারী। আমার কেবলই মনে হয় নারী মানেই সমাজের দায়ভারে ন্যুব্জ এক স্তম্ভের নাম।

যার পথের বাধা অন্যে তো বটেই সে নিজেও!

আমাদের দেশে যদিও সন্তান পালনের দায়িত্বটা পুরাপুরি নারীর উপরেই ন্যাস্ত তবু খোদ নারী তার সব সন্তানকে বিশেষ করে মেয়ে শিশুকে ছেলে শিশুর সমান এবং সমান্তরাল সুযোগ দিতে পারেন না...। প্রথমত সামাজিক পরিবেশ দ্বিতীয়ত সমাজের মানুষ হিসাবে নারীর নিজস্ব চিন্তা ধারা এর জন্য দায়ী।

তাই প্রায়শই কন্যা শিশু আপন মায়ের কাছেই বৈষম্যের শিকার হয়... মা তার ছেলে সন্তানের জন্য যেমন উদারভাবে চিন্তা করতে পারেন, কন্যার জন্য তা পারেন না (কারণ সেও এই সামাজিক চাপেই বেড়ে উঠেছেন, তার মানসিকতায় সমাজেরই প্রতিফলন)।

কন্যা শিশু যখন পরিবারের গণ্ডির বাইরে পা মেলে তখন এই বৈষম্যের পরিধিটা আরো বড় হয়ে যায়। পরিবার থেকে দলিত মন নিয়ে সে যখন স্কুলের আঙ্গিনায় পা রাখে, নিজের ভেতরে আপনি গুটিয়ে থাকে। যা তার আচরণকেও প্রভাবিত করে। একজন ছেলে শিশু পরিবেশ গত কারণেই ভয়হীন মানসিকতা নিয়ে বড় হয় কিন্তু কন্যা শিশুর ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভাবেই সম্ভব হয় না! যা তাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রই সংকীর্ণ মন-মানসিকতায় আবদ্ধ করে ফেলে! সে যে আলাদা সত্তা তাই অনেক ক্ষেত্রে ভুলে যায়(আমি ব্যতিক্রমের কথা বলছি না)।

সমাজের কিছু ভ্রান্ত ধারণা বরাবর নারী নির্যাতনে উদ্দীপক হিসাবে কাজ করে। যেমন আমাদের সমাজে ছেলে সন্তান মানে অবলম্বন আর মেয়ে সন্তান মানে বুঝা বা দায় বা আমানত। এই চিন্তা থেকেই মূলত অধিকাংশ পরিবার ছেলে সন্তানের পেছনে বেশি টাকা খরচ করতে দ্বিধা বোধ করেন না। অনেক সময় ছেলে সন্তান জন্ম না দিতে পারার অপরাধে নারীকে বিবাহ বিচ্ছেদের স্বীকার পর্যন্ত হতে হয়। যদিও সন্তান ছেলে হবে কি মেয়ে তা নারীর উপর নির্ভর করে না।

সামাজিক বৈষম্যের মাঝেও অনেক মেয়ে সন্তান নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আদৌ কি মুক্ত ভাবে চলার অধিকার অর্জন করতে পারে?

যে সমাজের অধিকাংশ মানুষের চিন্তা ধারায় প্রথিত নারী মানে নির্ভরশীল একটা শ্রেণি... অর্থনৈতিক ভাবে না হলেও অন্য সব দিক থেকে! কখনো বাবার বাড়ি, বিয়ের পর স্বামীর বাড়ি, বুড়়ো বয়সে ছেলের বাড়ি! তেমন এক সমাজের নারী নিজেকে যতই যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত করুক সমাজ তাকে লিঙ্গের ভিত্তিতেই বিচার করবে, মানুষ হিসাবে নয়।