বাণিজ্য যুদ্ধে জয়ী হয় কে?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বাণিজ্য যুদ্ধে জয়ী হয় কে?

রিয়াজুল হক ১:৫৫ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ২৬, ২০১৮

বাণিজ্য যুদ্ধে জয়ী হয় কে?

সম্প্রতি বাণিজ্য যুদ্ধ নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। যেহেতু বিষয়টির সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর চীন জড়িয়ে রয়েছে, তখন আলোচনা না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শক্তিশালী অর্থনীতির দুই দেশ, আলোচনা হবেই। খুব সাধারণভাবে বাণিজ্য যুদ্ধ বলতে বোঝায়, একটি দেশ যখন অন্য দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক বা কোটা সীমাবদ্ধতা আরোপ করার মাধ্যমে ব্যবসায়িক ক্ষতি করার চেষ্টা করে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বাণিজ্য যুদ্ধ করে মূলত জয় হয় কার? এক কথায় যদি উত্তর দিতে হয়, তবে বলা যেতে পারে, এই যুদ্ধে কেউ জেতে না। আগে ঘটে যাওয়া বাণিজ্যিক যুদ্ধের মাধ্যমে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে।

তবে যারা বাণিজ্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে না, তারা এই যুদ্ধের মাধ্যমে লাভবান হয়। ধরুন, দুটি দেশ ‘ক’ এবং ‘খ’-এর মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধ সংঘটিত হলো। ‘ক’ দেশ ‘খ’-এর পণ্যের ওপর এবং ‘খ’ দেশ ‘ক’ দেশের পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দিল। এর ফলে, ‘খ’ এবং ‘ক’ দেশের রপ্তানি আয় কমে গেল। ‘খ’ তার পণ্য নতুন বাজার ‘গ’ দেশে কিছুটা কম মূল্যে রপ্তানি করা শুরু করল। নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য পণ্যের মূল্য কম রাখাটাই বাঞ্চনীয়। অর্থাৎ বাণিজ্য যুদ্ধে না থেকেই বরং দেশ ‘গ’ লাভবান হলো। অস্ত্রের মাধ্যমে যুদ্ধ করে যেমন নিজের শক্তির জানান দেওয়া হয় তেমনি একটি দেশকে আর্থিক সংকটে ফেলার জন্য বাণিজ্য যুদ্ধ করা হয়ে থাকে। তবে এই যুদ্ধ সবসময় একচেটিয়া হবে, বিষয়টি কিন্তু তা নয়। বৃহৎ বাজারের দুই বা ততধিক শক্তিশালী দেশের মধ্যেও বাণিজ্য যুদ্ধ সংঘটিত হয়ে থাকে।

তথ্য মতে, ১৯ শতকের শেষদিকে একটি বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয় ইতালি ও ফ্রান্সের মধ্যে। সে সময় নতুন সংঘবদ্ধ ইতালি স্থানীয় শিল্পায়নকে জোরদার করতে ফ্রান্সের আমদানির ওপর অত্যধিক ট্যারিফ আরোপ করে। এদিকে ফ্রান্স ছিল ইতালির চেয়ে ধনী ও শক্তিশালী। তারা প্রতিশোধ নিতে ইতালির পণ্যের ওপর বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করল। ফলে ইতালির রপ্তানি হলো ধরাশায়ী। এমনকি পরিস্থিতি বুঝতে পেরে ইতালি নিজেদের ট্যারিফ বাতিল করলেও ফ্রান্স শাস্তিস্বরূপ আরও বহু বছর বাড়তি ট্যারিফ বজায় রেখেছিল। এ ছাড়া, বিশ শতকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৩০ সালের স্মুট-হাউলির ট্যারিফ অ্যাক্টের মাধ্যমে। এটি দ্বারা প্রায় ২০ হাজার আমদানিকৃত পণ্যের ওপর মাত্রাধিক ট্যারিফ আরোপ করা হয়। কানাডার নেতৃত্বে আমেরিকার বাণিজ্যিক অংশীদাররা প্রতিশোধ নিতে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি পণ্যের ওপর ট্যারিফ বাড়িয়ে দেয়। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ১৯২৯ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত কমে ৬১ শতাংশ। ১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ট্যারিফ অ্যাক্টটি বাতিল করে।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ থেকে কার্যকর হয়েছে। তিন হাজার চারশ কোটি ডলারের চীনা পণ্যের ওপর এই শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এর জবাবে ৫৪৫টি মার্কিন পণ্যের ওপর সমহারে ২৫ শতাংশ শুল্কারোপ করেছে চীন। সেয়ানে সেয়ানে যুদ্ধ। ভিডিও গেমে এই যুদ্ধ হলে দেখতে মন্দ হতো না। কিন্তু এই যুদ্ধে সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষ সংশ্লিষ্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার চলতি বাণিজ্য যুদ্ধ যে বিশ্ব অর্থনীতির গতি কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা এখনই ধারণা করা কঠিন। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা নেতিবাচক প্রভাব পেতে শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় সংরক্ষণাগার সাধারণত আন্তর্জাতিক শস্য ব্যবসায়ীরাই চালান, সেখানে তারাই শস্য মজুদ করেন। চলমান বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শস্যের রপ্তানি কমে গেছে এবং সংরক্ষণাগারগুলোও ইতোমধ্যে অতিরিক্ত শস্যে ভরে গেছে।

শস্য বিক্রি করতে না পারার কারণে কৃষকরা চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক কৃষক ট্রাক্টর দিয়ে ক্ষেতের ফসল নষ্ট করে ফেলছে। সংরক্ষণাগারের অভাবে অনেকের শস্য পচে যাচ্ছে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রে ৮ কোটি ৯১ লাখ একর জমিতে সয়াবিনের চাষ হয়েছিল, যা এ যাবৎকালের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। চীনে সয়াবিনের চাহিদা বাড়তে থাকায় অন্য ফসলের চেয়ে সয়াবিনে বেশি লাভের আশা করেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র চীনা রপ্তানির ওপর শুল্কারোপের জবাবে বেইজিং ও যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন আমদানিতে ২৫ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে। এতে কার্যত চীনে যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রপ্তানি বন্ধই হয়ে গেছে, যেখানে গত বছর প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার এসেছিল এ খাত থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের সয়াবিন রপ্তানির ৬০ শতাংশই হয় চীনে। লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, বাণিজ্য যুদ্ধে অবতীর্ণ দুটি দেশের কারও জয় না হলেও অন্য দেশ এখান থেকে সুবিধা পেতে পারে। যেহেতু চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে সয়াবিন আমদানি করছে না, বাংলাদেশসহ অন্য দেশ যাদের সয়াবিনের চাহিদা রয়েছে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে এখন সয়াবিন আমদানি করতে পারে। অর্থনীতির ভাষায়, জোগান বেশি থাকলে দাম কমে যায়। অর্থাৎ তুলনামূলক কম মূল্যেই সয়াবিন আমদানি সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের সয়াবিন আমদানি করে থাকে।

অনেকেই যুক্তি দেখিয়ে থাকেন, দেশীয় কোন কোন শিল্পের সহায়তার জন্য আমদানিকৃত পণ্যের ওপর ট্যারিফ আরোপ করা হয়ে থাকে। এই ট্যারিফ আরোপ যদি দেশের স্বার্থে করা হয়ে থাকে, তবে সেটাকে সাধুবাদ জানানো যায়। তবে কাউকে শায়েস্তা করার চিন্তা করে যদি কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন বিষয়টা দেশীয় শিল্পের সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আরও একটি বিষয় হচ্ছে, আমদানিকৃত পণ্যের ওপর উচ্চ ট্যারিফ বসালেই যে দেশীয় শিল্প বেঁচে যাবে, বিষয়টি কিন্তু এত সহজ নয়। পণ্যের মান, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, মূল্য, ভোক্তার চাহিদা পূরণে সক্ষমতা ইত্যাদি অনেক কিছুই জড়িত থাকে।

শুল্ক নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই রেষারেষি দুদেশের অর্থনীতির জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ অনেক পণ্যের ডিজাইন হয় যুক্তরাষ্ট্রে, আবার অ্যাসেম্বল হয় চীনে। অ্যাপলের মতো বৃহৎ কোম্পানি দুই দেশেই বিনিয়োগ করে থাকে। এটি যে শুধু মার্কিন ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে তা-ই নয়, চীনের ভোক্তাদেরও ভোগাবে এ বাণিজ্য যুদ্ধ। এ ছাড়া যেসব দেশে অ্যাপলের পণ্য রপ্তানি হয়, সেসব দেশের ভোক্তাদেরও বেশি মূল্য দিয়ে পণ্য কিনতে হবে। ওয়ালমার্টের মতো অনেক খুচরা বিক্রেতা কোম্পানি চীন থেকে তাদের পণ্য আমদানি করে থাকে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।

বৈশ্বিকভাবে প্রায় সবাই একমত, বাণিজ্য যুদ্ধে কেউ ‘জেতে’ না। বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায় এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পায়। বাণিজ্য যুদ্ধে কেউ জয়ী না হলেও সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ ক্রেতাদের, যারা সংখ্যায় অনেকগুণ এবং বাণিজ্য যুদ্ধের বিষয়ে সামান্যতম আগ্রহ যাদের নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের এই বাণিজ্য যুদ্ধের পরিণতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা। তবে খুব তাড়াতাড়ি এই সমস্যার সমাধান হবে, এটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা। কারণ, মূল ভুক্তভোগী তো তারাই।

বি.দ্র : আমাদের দেশের মানুষরা প্রতিনিয়ত স্মার্ট হয়ে যাচ্ছে। আমার ধারণা ছিল, সামরিক যুদ্ধ সবাই সহজে বোঝে। রিকশায় যাচ্ছিলাম। একজন রিকশাওয়ালা আমাকে উদ্দেশ করে বলতে থাকলেন, ‘চীন আর এমরিকা এড্ডা অন্যডির দ্যাশের মালের উফরে ট্যাক্স বাড়াইয়া দেসে। এইবার দেখমু আসল যুদ্ধ’। বুঝলাম, বাণিজ্য যুদ্ধ এখন আর মুষ্টিমেয় মানুষের বিষয় না। এসব এখন সবাই বোঝে।

রিয়াজুল হক: উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

riazul.haque02@gmail.com