নির্বাচন অথবা সিঁদুরে মেঘ

ঢাকা, রবিবার, ২৪ মার্চ ২০১৯ | ১০ চৈত্র ১৪২৫

নির্বাচন অথবা সিঁদুরে মেঘ

শেগুফতা শারমিন ৭:২৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৬, ২০১৮

নির্বাচন অথবা সিঁদুরে মেঘ

সামনে নির্বাচন। মিডিয়া বা রাজনীতিকদের ভাষায় নির্বাচনী হাওয়া বইছে। একেবারে ছাপোষা সাধারণ মানুষ হিসেবে অনুভব করছি, উত্তরী হাওয়া বইতে শুরু হয়েছে। হাওয়ার সঙ্গে বাড়ছে ধুলো উড়া। রাস্তায় খানাখন্দ, উন্নয়নের চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে ধুলার নাচন। ভোরবেলা কখনো কুয়াশা বা ধোঁয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে চারপাশ। দেয়ালে ঢাকা এ শহরের দেয়ালগুলো ঢাকা পড়ছে পোস্টারে। রং-বেরঙের পোস্টার। একজনের ওপর দিয়ে আরেকজনের চিত্রপট। আর সময়ে-অসময়ে শোনা যাচ্ছে স্লোগান। একদা মিছিলের শহরে এমন স্লোগান যেন বহুদিন পর! সব মিলে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণের শহরে আরও ধুলা, আরও ময়লা, আরও শব্দ যোগ করছে নির্বাচন। বড় আকাঙ্ক্ষিত নির্বাচন!

যে দেশে রাস্তায় একজন তেলের শিশি নিয়ে বসলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে যায় অন্তত গোটা চল্লিশেক লোক। এক ক্যানভাসারকে কেন্দ্র করে অর্ধ দিন কাটিয়ে দেওয়ার একটা সুযোগ মানুষ হেলায় হারায় না। সেখানে নির্বাচন আসলে যে উৎসব হবে, এটাই স্বাভাবিক। তুলে রাখা জামা, শাড়ি, ভালো লুঙ্গিটা পরার এ সুযোগ হেলায় হারানো বোকামি। তাই মোটামুটি একটু সুযোগ পেলেই ভোটের ময়দানে নেমে আসে বাঙালি। তারপরেও এ চিরন্তন নির্বাচন প্রীতির পরিবেশ শঙ্কায় পড়ে গেছে পাঁচ বছর আগে। এ পাঁচ বছরে বাঙালির মনে তাই ঘুরেফিরে প্রশ্ন এসেছে আগামীবার কি নির্বাচন হবে? অথবা খুব সহজ ভাষায়, সরকার কি নির্বাচন দেবে? যদিও সংবিধান অনুযায়ী ‘নির্বাচন দেওয়া’র দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। তারপরেও ‘বুঝেও না বোঝার’ দল সরল বিশ্বাসে সরকারকেই দায়িত্ব দিয়ে ফেলতো।
সব জল্পনা-কল্পনা শঙ্কা আশঙ্কার পর সত্যি সত্যি ঘোষিত হয়েছে নির্বাচনের তারিখ। এবং সত্যি সত্যিই বইতে শুরু করেছে নির্বাচনী হাওয়া। এখন আবার জল্পনা-কল্পনা শঙ্কা-আশঙ্কা সঠিকভাবে ভোট হওয়া না হওয়া, কারও টিকে থাকা না থাকা, কারও জিতে আসা না আসা নিয়ে। কেউ ভাবছে যেমন ছিল তেমন, কেউ ভাবছে পরিবর্তন। কিন্তু যে যাই বলুক, নতুন কেউ আসুক বা পুরানরাই টিকে যাক, প্রশ্ন থেকে যায় আরও অনেক রকম।
যারা আছে, তারা ভালোর ফিরিস্তি গায়। আরও ভালোর গল্প শোনায়। যারা নাই, তারা সুযোগ পেলেই বর্তমানের দোষ দেখিয়ে দেয়। নিজেরা আসলে কত ভালো করবে তার বুলি আওড়ায়। কিন্তু বাস্তবতা বলে, আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, যায় দিন ভালো আসে দিন খারাপ। পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনে যেই আসুক না কেন বা টিকে থাকুক না কেন আগের আমলকে ছাড়িয়ে যায়, খারাপে।
৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হবে। হয়তো আওয়ামী লীগই জিতে থাকবে অথবা হয়তো যে কোনো মোড়কেই হোক বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। অথবা আরও অন্যকিছু হবে। ফলাফল যাই হোক, যেই জিতুক তাতে আদৌ কি মৌলিক জায়গাগুলোতে পরিবর্তন আসবে? এ আমলের দুর্নীতির রেকর্ড কি আগত আমলেও ছাড়িয়ে যাবে না? হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাওয়ার যে ধারা তৈরি হয়েছে, আগামী আমলে কি লোপাটের পরিমাণ কমবে নাকি বাড়তেই থাকবে? উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে লাগামহীন বাজেট বেড়ে যাওয়ার অভ্যাসে কি লাগাম লাগবে? দমন-পীড়ন গুম হত্যা এগুলো কি আরও বাড়বে না? জিনিসপত্রের দামের ঊর্ধ্বগতি কি আরও ঊর্ধ্বমুখী হবে না? টাকা লুটপাটের জন্য নতুন নতুন ব্যাংক, নিজের ঢাকঢোল বাজানোর জন্য নতুন নতুন টিভি চ্যানেলের আমদানি কি হবে না? এরকম প্রশ্ন লিখতে চাইলে, তার শেষ নেই।
কেন যেন মনে হয়, প্রশ্নগুলো প্রশ্ন হলেও উত্তর খুব বেশি অজানা নয়। আমজনতা আমরা ঘর পোড়া গরু। গত ২৮ বছরে আমরা বেশ বুঝে গেছি। এক দল আরেক দলকে ছাড়িয়ে যায়। অন্যায়ে, কুশাসনে। এ জন্য আমরা আতঙ্কে থাকি। বর্তমান দল যাই করুক, সেটাকে বেস লাইন ধরে আমাদের ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেখে ভয় পাই।
তারপরও আমরা নির্বাচনের অপেক্ষা করি। সুন্দর ভাষায় অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকি। আমাদের দাম কমে আসে, মান কমে আসে তবু আমরা সুশাসনের প্রতীক্ষা করতে করতে দুঃশাসনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। দুঃশাসনের রেকর্ড ভেঙে যায়, তবু আমাদের প্রতীক্ষা ফুরায় না, বিশ্বাস নড়ে না।

শেগুফতা শারমিন : কলাম লেখক, উন্নয়নকর্মী।
[email protected]