নির্বাচনের আগে পরিবহন ধর্মঘট কেন?

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

নির্বাচনের আগে পরিবহন ধর্মঘট কেন?

জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান ৪:৪৫ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৮

নির্বাচনের আগে পরিবহন ধর্মঘট কেন?

পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ডাকে ৪৮ ঘন্টার পরিবহন ধর্মঘট হলো। প্রশ্ন জাগে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে এই ধর্মঘটের প্রয়োজন কেন পড়লো? এই পরিবহন ধর্মঘট কি সরকারি ছত্রছায়ায় হয়েছে? এমন ভাববার কোনো কারণ দেখি না। কেন দেখি না তাই বলবো।

এই পরিবহন ধর্মঘটের কারণে মানুষের দুর্ভোগ হয়েছে প্রাণহানি হয়েছে সরকার এই পরিবহন ধর্মঘট ডেকে ভোটের আগে নিজের ভোট কেন কমাবে? নিজের ভালো পাগলেও বোঝে! সরকার বুঝবেনা তা কি করে হয়?

তার পরেও পরিবহন ধর্মঘট হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৎপরতা পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে আমরা দেখিনি। তারা নিশ্চুপ থেকেছে। এর জবাব সরকার চায়নি কিংবা সরকার তাদের পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে ব্যাবহার করার হিম্ম দেখায় নি। হতে পারে

এখানে শেষ নয়। পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের তরফ থেকে অদূর ভবিষ্যতে আরো কঠোর ধর্মঘটের হুমকি আছে নির্বাচনের পূর্বে। এটা কি শুধু আইন সংশোধনের জন্য? নাকি এর পিছনে পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের আরো কোনো গভীর উদ্দেশ্য আছে?

এই পরিবহন শ্রমিক নেতারা যাদের মধ্যে সরকারের মন্ত্রী যেমন আছেন তেমনি বিএনপিপন্থী নেতাও আছেন। সব মিলেমিশে সামনে হাঁটছেন কেন?

আমরা যদি দেখি বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করেন তাদের নিজস্ব শক্তির মধ্যে আছে দলীয় সমর্থকদের সমর্থন। কিন্তু যারা শ্রমিকদের সমর্থন নির্ভর রাজনীতি করেন তাদের শক্তির বহর সাধারণ রাজনীতিকদের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। কারণ শ্রমিকরা সংগঠনে সংঘবদ্ধ। এমন একটি শ্রমিক সংগঠন পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন

এর নেতৃবৃন্দের মধ্যে বাম ঘরানার রাজনীতিকরাই প্রধান। সময়ের প্রয়োজনে বহুবিধ কারণে আজ এরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিতে নাম লিখিয়েছেন

এর পিছনের কারণ শ্রমিক সংগঠনের বড় নেতা হলেও এদের জন সমর্থন নাই। তাই নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে ধীরে ধীরে দেশের ক্ষমতা নিজ হাতে কুক্ষিগত করতে আজ তারা ভোল পাল্টে কেউ সেজেছে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী কেউ জাতীয়তাবাদী

এই সব ভোল পাল্টানো কম্যুনিস্টরা তাদের মনের গহীনে রক্ষিত আদর্শকে প্রতিষ্ঠা দিতে লোক দেখানো অবস্থান থেকে কেবল মাথা তুলতে শুরু করেছে। কারণ এখন দেশে তাদের প্রতিপক্ষ কেউ আর শক্তিশালী নাই

সরকারকে দিয়ে বিএনপির খাতেমা বিল খায়ের করার কাজ এখন শেষ। যুদ্ধাপরাধীদের দমনের নামে জামাতে ইসলামীর চল্লিশা সম্পন্ন হয়েছে ইতিমধ্যেই শাপলা চত্বর আর দাওরায়ে হাদিসকে এম ডিগ্রির মর্যাদা দিয়ে হেফাজতে ইসলামকে নখরবিহীন করার কাজও এখন শেষ পর্যায়ে

আগে দেশে কম্যুনিস্টদের বিপক্ষে এই সব ডানপন্থীরা একটি ভারসাম্যমূলক অবস্থান রক্ষা করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ডানপন্থী রাজনীতির দৃঢ় খুঁটি হিসাবে কাজ করতো। বুঝে কিংবা না বুঝে আজকে বামপন্থী রাজনীতিকে সুবিধা দিতে এই অতিপ্রয়োজনীয় ভারসাম্যের খুটিকে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে

এর ফলশ্রুতিতে দেশের একদশতম সংসদের নিয়ন্ত্রণ নিতে দলের ভিতরে ঘাপটি মেরে থাকা বামপন্থীরা শক্তি প্রদর্শনের নমুনা হিসাবে পরিবহন শ্রমিকদের মাঠে নামিয়েছে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে। এটা ধারণা করা যায়

এমনও হতে পারে নির্বাচন যদি প্রতিযোগিতামূলক না হয় তবে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিপক্ষে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে নামবে সবখানে। সেক্ষেত্রে দলের মধ্যে নির্বাচনের মাঠে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে এটা আমার ধারণা। আমি এমনটাই ভাবছি

হতে পারে সরকার দলীয় প্রধানকে এই রাজনৈতিক অশনি সঙ্কেত থেকে নিরাপদ করতে আওয়ামী লীগের ভোল পাল্টানো বাম নেতারা পরিবহন ধর্মঘটের মাধ্যমে দলের মধ্যে শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে নির্বাচনের প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাদের মতামতের অপরিহার্যতাকে অপরিহার্য করে তুললো। যাতে একাদশ সংসদে তাদের ভাবশিষ্যদর যেন আধিক্য থাকে। একই সাথে নির্বাচনের সময় কেউ যেন মাথা তুলতে না পারে

যাতে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় হয় এবং তারা কিংমেকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে। যা বঙ্গবন্ধুর সময় তাদের পক্ষে কার্যকর করা সম্ভব হয় নাই

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্টের সাথে সংলাপের উদ্যোগ নিয়েছেন। এটা ভালো পদক্ষেপ। আমরা এর সফলতা কামনা করি। এটা ইতিবাচক ভাবে সম্পন্ন করে আগামী মার্চ মাসের দিকে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ব্যবস্থা করা গেলে অনেকের অস উদ্দেশ্য ঠাণ্ডা পানিতে ভেসে যাবে

লেখক: মেজর জেনারেল আ. ল. ম ফজলুর রহমান: সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ রাইফেলস-বিডিআর(বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি)।

আরো পড়ুন…
পেশা বনাম রাজনীতি
রোহিঙ্গা সমস্যার শেষ কোথায়?
রোহিঙ্গা সমস্যায় বাংলাদেশের করণীয়