বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রহীন?

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রহীন?

জেসমিন চৌধুরী ১১:৩০ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২২, ২০১৮

বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রহীন?

সম্প্রতি মাসুদা ভাট্টি-মইনুল ইসলাম টকশো ইস্যুতে জাতি নতুন অনেক কিছু জানার, বোঝার এবং শেখার সুযোগ পেল। প্রথমত, আমরা নতুন একটা শব্দগুচ্ছ শিখলাম- ‘বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রহীন’। সবার কথাবার্তা দেখেশুনে শেষ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির অভিধানের শরণাপন্ন হলাম। তারা বলছে, চরিত্রহীন মানে হচ্ছে- ভ্রষ্ট, লম্পট, ব্যভিচারী বা বিপথগামী। তা শব্দগত অর্থ যা-ই হোক না কেন, একটা শব্দের মূল অর্থ অনুধাবন করতে হলে তার ব্যবহারের দিকে তাকাতে হয়।

চরিত্রহীন শব্দের শাব্দিক অর্থ যদিও সার্বিকভাবে নৈতিকতার অধঃপতন বোঝায়, আমাদের সমাজে এই শব্দ দ্বারা মানুষের যৌন আচরণের প্রতিই ইঙ্গিত দেওয়া হয়ে থাকে এবং শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয় নারীদের ক্ষেত্রে, এমন সব বিষয়ে যার সঙ্গে নৈতিকতার কোনো সম্পর্কই নেই।

এখন আসি মূল কথায়। কয়েক দিন আগে একাত্তর টিভিতে একটি টকশোতে সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি যখন মইনুল ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করেন, প্রশ্নটির উত্তর না দিয়ে তিনি মাসুদা ভাট্টিকে বলেন, ‘আমি আপনাকে চরিত্রহীন বলতে চাই’। যথারীতি এই বিষয়টি নিয়ে জাতি কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একপক্ষ বলছেন, ‘এই আক্রমণ শুধু মাসুদা ভাট্টিকেই করা হয়নি, সমস্ত নারী জাতিকেই করা হয়েছে কারণ এই ক্ষেত্রে প্রশ্নকারী একজন পুরুষ হলে মইনুল ইসলাম কিছুতেই এই আপত্তিকর শব্দটি ব্যবহার করতেন না। মাসুদা ভাট্টি আসলে চরিত্রহীন কী না সেটা বিষয় নয়, এই ক্ষেত্রে তার চরিত্র আলোচনায় আসারই কথা ছিল না।’ অন্যপক্ষ বলছেন, ‘মাসুদা ভাট্টি একজন সুবিধাজনক মানুষ নন, তার প্রশ্নটাই ছিল উসকানিমূলক এবং মইনুল ইসলাম তার যৌনতার দিকে নয় বরং তার বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রহীনতার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন কাজেই মইনুল ইসলাম কোনো অন্যায় করেননি।’ তৃতীয় একপক্ষ বলছেন, “আচ্ছা বুঝলাম মাসুদা ভাট্টির সঙ্গে অন্যায় করেছেন মইনুল ইসলাম, তাকে অপদস্থ করেছেন। কিন্তু কোটা আন্দোলনে রাজপথে নারীরা যখন দৈহিকভাবে লাঞ্ছিত হলেন বা সংসদ সদস্য শামিম ওসমান যখন মেয়র আইভীকে গালি দিয়ে ‘রাস্তার মেয়ে’ বলে অপদস্থ করলেন তখন নারীবাদীরা কোথায় ছিলেন? যেসব নারীবাদী আজ তার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তারা কেন তখন নীরব ছিলেন?”

ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত লেখক তসলিমা নাসরিনও এ বিষয়ে একটি বক্তব্য প্রকাশ করেছেন। তার মতে, ‘মাসুদা ভাট্টি ভীষণভাবে চরিত্রহীন একজন মহিলা। চরিত্রহীন বলতে আমি কোনোদিন এর ওর সঙ্গে শুয়ে বেড়ানো বুঝি না। চরিত্রহীন বলতে বুঝি, অতি অসৎ, অতি লোভী, অতি কৃতঘ্ন, অতি নিষ্ঠুর, অতি স্বার্থান্ধ, অতি ছোট লোক। মাসুদা ভাট্টি এসবের সবই।’ এই বক্তব্যে তিনি আরও জানান যে, তিনি ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে মাসুদা ভাট্টির বিলেতে নাগরিকত্ব লাভে সাহায্য করার জন্য একটা মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে বিলেতের সরকারকে একটি চিঠি দেওয়ার ফলেই মাসুদা ভাট্টির বিলেতি নাগরিকত্ব নিশ্চিত হয়।

এই গেল কাহিনী। এই বিষয়ে আমার নিজের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

প্রথমত, যদি মাসুদা ভাট্টির প্রশ্ন রাজনৈতিক আক্রমণ হয়ে থাকত, জবাবে পালটা রাজনৈতিক আক্রমণ করা যেতে পারত। যদি তার প্রশ্ন উসকানিমূলক হয়ে থাকত তাহলে সভ্য ভাষায় উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানানো যেতে পারত। কিন্তু তার কোনোটাই না করে তিনি বললেন ‘আমি আপনাকে চরিত্রহীন বলতে চাই’। এখানে অনেকগুলো অপরাধ ঘটেছে- ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা, অশোভন ভাষার প্রয়োগ এবং নারীর অবমাননা কারণ হলফ করে বলা যায় প্রশ্নকারী একজন পুরুষ হলে তিনি ‘চরিত্রহীন’ গালিটা ব্যবহার করতেন না। মইনুল ইসলাম যে মাসুদা ভাট্টির ব্যক্তিগত জীবনের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। তিনি নিজেও এটা জানেন বলেই ইতিমধ্যে মাসুদার কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন।   

দ্বিতীয়ত, আমার যতদূর মনে পড়ে কোটা আন্দোলনের সময় নারী-লাঞ্ছনা অথবা মেয়র আইভী রহমানের অপমানিত হওয়ার ঘটনায়ও অনেকেই প্রতিবাদ করেছিলেন। যারা চুপ ছিলেন তাদের নিজস্ব কোনো এজেন্ডা থেকে থাকতে পারে। কিছু লোক সব সময়ই নিজের সুবিধামতো প্রতিবাদ করেন, প্রতিপক্ষকে হেনস্তা হতে দেখে বিকৃত সুখ লাভ করেন। তাদের কথা আলাদা। আমাদের মতো নির্দলীয় এজেন্ডাবিহীন মানুষ সব সময় সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এসেছে। তারপরও তর্কের খাতিরে ধরে নিচ্ছি মানব সভ্যতার ইতিহাসে কখনো কোনো দিন কোনো নারীর অপমানের বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করেনি। তার মানে কি এই দাঁড়ায় যে, আজও আমরা প্রতিবাদ করা থেকে বিরত থাকব? ধরুন, আমি একজন ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছি। আপনি কি তখন ক্ষুধায় মৃত্যুর ভূরি ভূরি উদাহরণ হাজির করে আমাকে নিরস্ত করার চেষ্টা করবেন? আগে একটা ভালো কাজ হয়নি বলে তা আজও হতে পারবে না, এ কেমন কথা?   

তৃতীয়ত, আমি তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য সম্পর্কে কিছু বলতে চাই। তসলিমা নাসরিনের সাহসিকতার, প্রতিভার, আপোসহীনতার একজন পরম ভক্ত আমি। কিন্তু অন্ধ ভক্ত নই। আমার মতে তসলিমা নাসরিন এক্ষেত্রে একটি ভুল করেছেন। সার্বিকভাবে বিষয়টাকে না দেখে ব্যক্তিগত তিক্ততা এবং ক্ষোভের দৃষ্টিতে দেখেছেন। চিরদিন নারীর অধিকার নিয়ে লিখেছেন তিনি, নারীর অধিকারের কথা বলতে গিয়ে সমাজ এবং দেশচ্যুত হয়েছেন। অথচ আজ যখন একজন নারী লাইভ টিভিতে একজন পুরুষের পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবসুলভ আক্রমণের শিকার হলেন তখন তার পাশে না দাঁড়িয়ে তসলিমা নাসরিন তার ব্যক্তিগত তিক্ততার গল্প বলতে বসলেন। তার গল্পটি নিঃসন্দেহে আমাদের অবাক করেছে, কিন্তু গল্পটি বলার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত সময় কি তিনি খুঁজে পেলেন না? তসলিমা নাসরিন আরও একটি বিষয় ভেবে দেখেননি। এই গল্পটিতে উঠে এসেছে মাসুদা ভাট্টির স্বার্থপরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতার কথা, কিন্তু তসলিমার নিজের একটা বিশাল অন্যায়ের কথাও কি উঠে আসেনি? মাসুদা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন তসলিমার সঙ্গে, আর তসলিমা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন বিলেতের সরকারের সঙ্গে। কোনটা বেশি খারাপ হলো? আমি চাইব আমার প্রিয় লেখিকা ভবিষ্যতে আরও একটু বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন। এই ইস্যুতে তার কাছ থেকে অন্যরকম আচরণ আশা করতে পারতাম আমরা।

সবশেষে আমার নিজের কিছু কথা বলতে চাই। মাসুদা ভাট্টির সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় থাকলেও আমি তার ‘ফ্যান’ নই বরং চাক্ষুষ তর্ক-বিতর্কে নিজের মত প্রকাশে ব্যর্থ হয়ে পিছু হটতে হয়েছে আমাকে। মাসুদা/মইনুল কারও প্রতিই আমার কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ/অপছন্দ নেই। আমি কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের চামচাও নই, কাজেই এদের কারও প্রতি আমার গভীর রাজনৈতিক সমর্থনও নেই। তারপরও এই ‘চরিত্রহীন’ গালিটা কেন আমার গায়েই এসে লাগল? সেই ব্যাখ্যাই দিচ্ছি।  

আমি জীবনে অসংখ্যবার সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে এই গালির শিকার হয়েছি। যখন আমার প্রথম ‘স্বামী’কে তালাক দেওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন বারবার আমাকে শুনতে হয়েছে আমার চরিত্র খারাপ, অন্য পুরুষের প্রতি আগ্রহ থেকেই আমি এই কাজটা করতে চাচ্ছি। আমি যখন তালাক রেজিস্ট্রি করতে যাচ্ছিলাম তখনো আমাকে শুনতে হয়েছে ‘ভালো মেয়েরা এমন সাজুগুজু করে তালাক দিতে যায় না।’ তালাক হয়ে যাওয়ার পর ইনবক্স মেসেজে আমাকে ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেওয়া হয়েছে, আমার মেয়েকেও ‘বেশ্যা’ বানানোর চেষ্টা করছি বলে দাবি করা হয়েছে কারণ সে পশ্চিমা পোশাক পরে। দেশে শুধুমাত্র পথে নিজে গাড়ি চালানোর জন্যও আমাকে ‘মাগী’ ডাকা হয়েছে। লেখালেখিতে নারীর সমস্যার কথা তুলে ধরার জন্য আমাকে চরিত্রহীন ডাকা হয়েছে। ধর্মীয় বা সামাজিক রীতিনীতির কারণে পিতার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আমাকে চরিত্রহীন ডাকা হয়েছে।
যেসব বিষয়ে আমাকে বারবার চরিত্রহীন ডাকা হয়েছে তার কোনো কিছুর সঙ্গেই চরিত্রের কোনো সম্পর্ক নেই। কাজেই যখনই কোনো নারীকে ‘চরিত্রহীন’ ডাকা হবে, সেই গালিটা আমার গায়েই এসে লাগবে।

পুরুষ ঠকামো করলে সে ঠক, মিথ্যা কথা বললে মিথ্যাবাদী, ভণ্ডামি করলে ভণ্ড, কিন্তু নারী যা-ই করুক না কেন সে ‘চরিত্রহীন’। সে প্রতিবাদ করলে চরিত্রহীন, প্রশ্ন করলে চরিত্রহীন, নিজের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হলে চরিত্রহীন। নারীকে বিচারের অন্য কোনো মানদণ্ড বানায়নি সমাজ। পুরুষের জন্য ‘দুশ্চরিত্র’ গালিটা তেমন একটা ব্যাপার নয় কিন্তু নারীর জন্য ‘চরিত্রহীন’ গালিটা মোক্ষম কারণ নারীর চরিত্রসুদ্ধিকে একটা ট্যাবু বানিয়ে রাখা হয়েছে। পুরুষ ভাবে এই গালিটা দিতে পারলেই একজন নারীকে ঘায়েল করা যাবে সবচেয়ে বেশি তাই নারীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তাকে এমন একটা গালি দেওয়ার কথা ভাবেন একজন উচ্চশিক্ষিত পুরুষও।

আমি নিজের চরিত্রের কাঁথা নিজের হাতেই পুড়িয়ে রেখেছি। এই গালিটা আমার গায়ে হয়তো লাগে কিন্তু ফুলের টোকার মতোই আলতোভাবে। আমার দৃষ্টিতে এটা কোনো গালিই না, কারণ যখন এই গালিটা দেওয়া হচ্ছে তখনই গালিদাতার অক্ষমতা এবং অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তার কিছু বলার নেই বলেই তিনি সেই বহু ব্যবহারে ভোঁতা হয়ে যাওয়া পুরনো হাতিয়ারটি ব্যবহার করছেন।
তাহলে কেন এই প্রতিবাদ? প্রতিবাদ গালিটার বিরুদ্ধে নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা সুপ্রতিষ্ঠিত সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে। এই ক্ষেত্রে মইনুল ইসলাম নিজেই নিজেকে পরাজিত এবং অপমানিত করেছেন। গালিটা শোনার পরও মাসুদা হাসছিলেন, সাবলীলভাবে কথা বলে যাচ্ছিলেন কিন্তু মইনুল ইসলাম সঠিক শব্দমালা খুঁজতে গিয়ে বাক্যের গঠনে বিভ্রাট ঘটাচ্ছিলেন বারবার। জানা গেছে, প্রকাশ্যে দেওয়া একটা গালির জন্য তিনি গোপনে ক্ষমাও চেয়েছেন। আমি গোপনে সংঘটিত অপরাধের জন্য প্রকাশ্যে ঘটা করে ক্ষমা চাওয়ায় বিশ্বাসী একজন মানুষ। আর কী বলব?

আপনারা যারা ‘বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রহীন’ চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন তাদের বলছি, ভাঁওতাবাজির একটা সীমা থাকা দরকার। আপনারা হয়তো ভাষাবিজ্ঞানের একটা উপকার করলেন, হয়তো আপনাদের আবিষ্কৃত এই নতুন শব্দগুচ্ছ বাংলা অভিধানকে সমৃদ্ধ করবে, কিন্তু আমার মতো যেসব নারীকে বারবার ‘চরিত্রহীন’ গালি দিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তাদের এসব বলে বোকা বানাতে পারবেন না আপনারা। অতএব, এবার ক্ষ্যান্ত দিন।

জেসমিন চৌধুরী : কলাম লেখক ও অনুবাদক।
jes_chy@yahoo.com