ব্যারিস্টার মইনুল গণতন্ত্র শেখেননি

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

ব্যারিস্টার মইনুল গণতন্ত্র শেখেননি

প্রভাষ আমিন ৫:২৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৮

ব্যারিস্টার মইনুল গণতন্ত্র শেখেননি

গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের একটা সাংঘাতিক ভুল ধারণা আছে। আমরা মনে করি ৫ বছর পর একবার জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে পারলেই বুঝি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে গেল। সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচনে ক্ষমতায় আসলেই যে সে সরকার গণতান্ত্রিক হবে এমন কোনো কথা নেই। গণতান্ত্রিকভাবে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারও গণবিরোধী হতে পারে। আসলে গণতন্ত্র শুধু সরকারে নয়, দলেও দরকার, পরিবারে দরকার, ব্যক্তির আচরণে দরকার।

শুধু ভোটগ্রহণের দিনে নয়, গণতন্ত্র চর্চা করতে হবে প্রতিদিন, প্রতিমুহুর্তে। গণতন্ত্র মানে মানুষের মর্যাদাকে উর্ধ্বে তুলে ধরা, নারীদের সম্মান দেয়া, ভিন্নমতকে ধারণ করা, সবার মতপ্রতাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, যুক্তির জবাব যুক্তি দিয়ে দেয়া। গণতন্ত্র মানে হলো- তোমার সাথে আমার ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় আমি শেষ পর্যন্ত লড়বো। কিন্তু ভিন্নমত সম্পর্কে যেন ধারনাটাই আমাদের এখানে নেই।

আমরা ধরে নেই, সবাই আমার মতের হবে। কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেই আমরা সাধ্যমত ঝাঁপিয়ে পড়ি। কেউ চাপাতি নিয়ে, কেউ গালি নিয়ে, কেউ হুমকি দিয়ে। কারো মত পছন্দ না হলেই সুবিধামত ট্যাগ লাগিয়ে দেই, যাকে যা দিয়ে ঘায়েল করা যায়। কাউকে বাকশালী, কাউকে জামাত-শিবির, কাউকে ছাগু, কাউকে সরকারের দালাল, কাউকে ভারতের দালাল বলে গালি দেই। আমি হয়তো বিএনপির সমর্থক। কিন্তু আওয়ামী লীগের সমর্থককে গালি দেই সরকারের দালাল বলে। কেন ভাই, আমি বিএনপি করতে পারলে, আরেকজন আওয়ামী লীগ করতে পারবে না কেন? আওয়ামী লীগ সমর্থক হলেই তাকে 'দালাল' বলতে হবে কেন? নারীরা হলেন সবচেয়ে সহজ টার্গেট। পছন্দ না হলে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেই হলো।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আরো এক দফা এগিয়ে। অপছন্দের দল বা দেশের নামও আমরা বিকৃত করে ফেলি আমাদের মতো করে। তথ্য বিকৃত করা তো অপরাধ। আমরা লিখি আম্লীগ, বিম্পি, রেন্ডিয়া, ফাকিস্তান। আপনি অপছন্দ করতে পারেন, বিরোধিতা করতে পারেন, বিপক্ষে জনমতও গড়তে পারেন। কিন্তু সেটা গালি দিয়ে নয়, বিকৃত করে নয়; যুক্তি দিয়ে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের না হয় দায়িত্বশীলতা নেই। কিন্তু আমাদের বড় মানুষেরাও অপছন্দ হলেই 'চরিত্রহীন মহিলা' গালি দিয়ে দেই। বড় মানুষেরাও প্রতিদিনের গণতন্ত্র চর্চা ভুলে গিয়ে মেতে থাকেন একদিনের ভোটের গণতন্ত্রে। এই যে এখন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে, সেও তো নির্বাচনকে সামনে রেখে, একদিনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য। মেনে নিলাম আওয়ামী লীগ খুব খারাপ, ফ্যাসিস্ট। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হারলে কারা ক্ষমতায় আসবে? বিএনপি। তো বিএনপি কোন দুধে ধোয়া তুলসি পাতা? তারা যে দেশে কোনো স্বর্গ আনবেন, সেও তো আমরা দেখেছি। যাদের দলে গণতন্ত্রের লেশমাত্র নেই; সেই ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, আ স ম আব্দুর রবেরা এখন গণতন্ত্র উদ্ধারের কাণ্ডারি। তাদের সাথে জুটেছেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন আর ডাঃ জাফরুল্লাহ চৌধুরী, যাদের আবার দলই নেই। গণতন্ত্রের জন্য তাদের এই লড়াইয়ে আমি অনুপ্রাণিত। তবে নির্বাচনের আগে আগে বলে নিছক ক্ষমতামুখী মনে হয়; গণতন্ত্রের লড়াইটা তো চালাতে হবে বছরজুড়ে, প্রতিদিন।

বলছিলাম ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের কথা। গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। কিন্তু কথার সাথে কাজের আকাশ-পাতাল ফারাক। একদলীয় শাসন বাকশাল প্রবর্তনের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল। সবাই যখন দলে দলে বাকশালে যোগ দিচ্ছিলেন, তখন তার পদত্যাগ দারুণ সাহস এবং গণতন্ত্রের জন্য তার ভালোবাসার প্রমাণ দেয়। কিন্তু ৭৫ এর ১৫ আগস্টের পর খন্দকার মুশতাকের দলে যোগ দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন গণতন্ত্র নয়, তার টান খুনীদের দিকেই।

১/১১এর সময় আবারও বুঝিয়ে দিয়েছেন গণতন্ত্র তার মুখের বুলিমাত্র। ব্যক্তিগত আচরণেও তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে তিনি গণতন্ত্রের কোনো পাঠ নেননি। ১/১১ এর সময় সবচেয়ে সরব ছিলেন ব্যারিস্টার মইনুল। যে ভাষায় কথা বলতেন, বোঝা যায়, তার ভেতরে বাস করে এক সামন্তপ্রভূ। কোনো ভিন্নমত নয়, তিনি শুধু 'হুজুর হুজুর' শুনতে চান। আবারও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে নেমেছেন ব্যারিস্টার মইনুল। কিন্তু নিজেকে বদলাননি এতটুকুও। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে তিনি জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করেন কিনা, এই প্রশ্নে তিনি যেভাবে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, তাতে মনে হচ্ছে ডালমে কুছ কালা হ্যায়। আরে ব্যারিস্টার সাহেব, রাজনীতি করতে নেমেছেন, গণতন্ত্র উদ্ধার করে ফেলবেন; আর প্রশ্ন শুনলে ক্ষেপে গেলে চলবে নাকি। আর সাংবাদিকরা তো আপনার পছন্দমত প্রশ্ন করবে না। তারা আপনাকে ফাঁদে ফোলতে চাইবে। আপনি সৎ হলে কৌশলে তাদের মোকাবেলা করবেন।

আপনি কিন্তু একাধিকবার শিবিরের অনুষ্ঠানে গিয়ে তাদের সার্টিফিকেট দিয়ে আসবেন আর আপনাকে জামায়াতের প্রতিনিধি বললে রেগে যাবেন; দুটো তো একসাথে হবে না। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে ক্ষেপে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাথা ঠাণ্ডা রেখে সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করাটাও গণতন্ত্রেরই শিক্ষা। মাসুদা ভাট্টিকে 'চরিত্রহীন মহিলা' বলে ব্যারিস্টার মইনুল নিজের চরিত্র খুলে দিয়েছেন। প্রমাণ করেছেন, তিনি একই সঙ্গে অসহিষ্ণু, অগণতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক। একজন নারীকে আক্রমণ করার সবচেয়ে সহজ অস্ত্র হলো, তাকে চরিত্রহীন বলে দেয়া। সেই অস্ত্রটাই প্রয়োগ করেছেন ব্যারিস্টার মইনুল। নামের আগে 'ব্যারিস্টার' দেখে বোঝা যায় উচ্চশিক্ষিত। দেশের সেরা সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার বড় ছেলে তিনি। কিন্তু আচরণ দেখে বোঝা যায়, তিনি আসলে কিছুই শেখেননি।

বরং মাসুদা ভাট্টি ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতি সামাল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে এ ধরনের পরিস্থতি মোকাবেলা করতে হয়। ব্যারিস্টার মইনুল বরং মাসুদা ভাট্টির কাছে শিখতে পারেন।

লাইভে 'চরিত্রহীন' বলে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে ক্ষমা চাইলে সমাধান হয় না। শুধু মুখে বড় বড় কথা বললে হবে না, আমাদের গণতান্ত্রিক হতে হবে কথায়, আচরণে, প্রতিক্রয়ায়, জীবনাচরণে, সংসারে, রাজনীতিতে, রাষ্ট্রে। শ্রদ্ধা থাকতে হবে ভিন্নমতের প্রতিও।

২০ অক্টোবর, ২০১৮