নদীকে ভালোবাসাও মাকেই ভালোবাসা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ | ৩ কার্তিক ১৪২৫

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী

নদীকে ভালোবাসাও মাকেই ভালোবাসা

তুহিন ওয়াদুদ ২:৩৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৪, ২০১৮

নদীকে ভালোবাসাও মাকেই ভালোবাসা

‘নদী’ শব্দটি কেমন যেন জাদুকরি-মায়া ভরা। কোমল-লাবণ্যময়তায় ভরপুর। প্রাণ-প্রাচুর্যের আধার। আমাদের দেশে সবার জীবনে নদীস্মৃতি রয়েছে। কেউ হয়তো নদী পাড়ের জীবনে সমৃদ্ধ, কেউ হয়তো নদীপথের জীবনে অভ্যস্ত, কেউবা কখনো কখনো নদীর কাছে গিয়েছেন। নদীর সঙ্গে আমাদের জীবনের গভীরতর সম্পর্কসূত্র বিদ্যমান। এ সম্পর্কসূত্র বিষয়ে সম্যক জ্ঞাত না থেকেও আমরা নদীর প্রতি অনুরক্ত। নদী আমাদের কল্পনার সহযাত্রী। শিল্প-সাহিত্যে নদী জীবনের উপমায় জ্বলজ্বলে। নদীর প্রতি আমাদের অযুত ভালোবাসা।

প্রতিদিনই আমাদের দেশে নদী কিছুটা করে মৃত্যুর দিকে ধাবিত। অশীতিপর বার্ধক্যে যারা পৌঁছেছেন তাদের অনেকেই স্মৃতি থেকে বলে থাকেন-এখানে একটা নদী ছিল, ওখানে ওই নদীর শাখা ছিল, এখানে এ বিলটি বর্ষায় নদীরূপ পেত; এ রকম অনেক কথাই শোনা যায়। ষড়ঋতুর বাংলাদেশে এখনো বর্ষা ঋতুতে অনেক বৃষ্টি নামে। বন্যায় ভাসে দীর্ঘ জনপদ। তবুও যে নদীর সংখ্যা দিনের পর দিন কমছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। নদীর সংখ্যা কমতে কমতে যে বাংলাদেশ নদীশূন্য দেশে পরিণত হতে পারে এমন ভাবনা হয়তো আমাদের মানসপটে কখনো ভাসে অথবা ভাসে না। নদী নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের উদাসীনতা আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চক্রান্ত-এ দুই কারণে বাংলাদেশ কালের গর্ভে নদীশূন্য দেশ হয়ে উঠবে না এ কথাও আমরা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারি না। আমাদের পাঠ্যপুস্তক, আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের সামাজিক কাঠামো কোথাও নদী সচেতনতামূলক কোনো পাঠ-আলোচনা-কর্মশালা হয় না। অথচ, নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রাণ হচ্ছে নদী। দেশকে যখন আমরা মা ডাকি তখন সেই মা ডাকের মধ্যে মাটি যেমন আমাদের মা তেমনি নদীও আমাদের মা, তা বোধ হয় আমরা উপলব্ধি করি না। আমরা যে খাদ্যশস্য উৎপাদন করি তার সঙ্গে নদীর রয়েছে অন্তঃশীলা সম্পর্ক। নদী বয়ে চলে যে পথে, সে পথে আমাদের কাছে শুধু উপরিতলের নদীটিই দৃশ্যমান। মাটির নিচে সেই নদী যে সজীবতা সঞ্চার করে সে খবর আমরা জানি না। শুধু তাই নয়, উজান থেকে নেমে যাওয়া নদীর পানি সামুদ্রিক লবণাক্ত জলকে চাপ দিয়ে রাখে, যাতে করে লবণাক্ত পানি ওপরের দিকে উঠে আসতে পারে না। আমাদের দেশের উত্তরাঞ্চলে যে প্রধান নদীগুলো আছে সে নদীগুলোর যত্ন করতে না পারলে, বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে উত্তরাঞ্চলের দৃশ্যপট নিকট ভবিষ্যতে বদলে যাবে। ধরলা-তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র-দুধকুমার-ফুলকুমারসহ উজানে ভারত থেকে নেমে আসা নদীগুলো না থাকলে দেশের ভেতরের ছোট ছোট নদীগুলোও মারা যাবে। কারণ এ নদীগুলোর পানিই ছোট নদীগুলোর প্রাণ। করতোয়া, ধরলা, আখিরা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট টেপা রত্নাইসহ যে ছোট নদীগুলো আছে সবই প্রাণ হারাচ্ছে। সারা দেশের ছোট নদীগুলোরও অভিন্ন বাস্তবতা।

পৃথিবীতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলে তা হবে পানি নিয়ে, এ আশঙ্কা কেউ কেউ ব্যক্ত করেছেন। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আবার হোক এটা কোনো অবস্থাতেই কাম্য নয়। তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হয় তাহলে পানি নিয়ে হওয়টা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তার কিছু কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে নদী দখলের হীন চেষ্টা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ-ভারত মিলে শতাধিত নদী আছে। তার মধ্যে স্বীকৃত সংখ্যা ৫৪টি। তার ৫৩টিরই উৎস ভারত। বাংলাদেশের উজানে থাকা ভারতের প্রায় সব নদীর পানি প্রত্যাহার করার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত যদি এ কাজ শুরু করে তাহলে বাংলাদেশের জন্য তা হবে মৃত্যুর নামান্তর। চীনও ব্রহ্মপুত্রের খাত পরিবর্তন করার কাজ করছে। এতে করে বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আমাদের দেশে  মৃত্যুপথযাত্রী প্রায় সব নদী। প্রকৃতির কোলে যখন বাংলাদেশ নির্বিঘ্ন শায়িত ছিল, রেল-সড়কপথ যখন বাংলাদেশের বুক চিড়ে বয়ে যায়নি, তখন কোনো নদীকে কৃত্রিম সংকট আঘাত করতে পারেনি। বরং সভ্যতা বিকাশের যে বিভিন্ন স্তর, সেখানে দেখা যায় মানুষ যখন যাযাবর জীবন ছেড়ে দিয়ে স্থানিক হয়েছে, তখন মানুষ বসবাসের জন্য বেছে নিয়ে নিয়েছিল নদীতীরবতী কোনো স্থান। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, প্রথম যোগাযোগ হিসেবে নৌপথই ছিল ভরসা। নদীতীরেই গড়ে উঠেছিল সভ্যতা। দেশে অনেক স্থানের নামের সঙ্গে গঞ্জযুক্ত আছে। দেশের যে স্থানগুলোর নামে গঞ্জযুক্ত তার সবই ছিল নদীতীরবর্তী। নৌপথে মানুষ বাণিজ্যিক কাজে যে নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়মিত হাট বসত তাই গঞ্জ বলে খ্যাত ছিল। বর্তমানে যে গঞ্জগুলো বিদ্যমান তার তার পাশ দিয়ে কখনো নদী ছিল কিনা সেই স্মৃতি চিহ্নও এখন আর নেই।

কালিক বিবর্তনে নদীপথ বাংলাদেশে উপেক্ষিত থেকেছে। সড়কপথ, রেলপথ দুয়েই আমাদের নদীগুলোকে তার স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর বাধা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ব্রিটিশকালে যখন রেলপথ বাংলাদেশে চালু হয় তখনই নদীর ওপর দিয়ে প্রচুর রেলসেতু করা হয়। এরপর জালের মতো বিছানো সড়ক, জালের মতো ছাড়ানো নদীর ওপর দিয়ে নির্মাণ করতে গিয়ে সেই নদীপ্রবাহে যে বাধা সষ্টি করা হয়েছে এতে করে প্রথমে যৌবনবতী অনেক নদী তার স্রোত হারাতে থাকে। ক্রমান্বয়ে প্রসারিত নদী হয়েছে ক্ষীণ এবং শেষাবধি সেই ক্ষীণ জলধারাও মিলিয়ে গেছে। যে নদীতে একদা জাহাজ ভিড়ত সে নদীতে পরবর্তী সময়ে নৌকা ভিড়ত। অবশেষে নদীর পরিচয় নেমে আসে ‘বিল’ পর্যায়ে। অতঃপর জলহীন প্রান্তর কয়েক দশক বছরের ব্যবধানে স্মৃতিতে বেঁচে থাকে সেই নদী।

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নদীপথ হতে পারত প্রধান অবলম্বন। বাংলাদেশের আশীর্বাদ এ নদীগুলো আমরা অভিশাপ বিবেচনা করে এগুলোকে কাজ না লাগিয়ে উপেক্ষা করেছি। বিশেষ করে পণ্য পরিবহনে খুবই কম ব্যয় নৌপথে। আমাদের দেশের নদীগুলো এমনভাবে জালের মতো বিছানো যে দেশের এক অঞ্চলের পণ্য অন্য অঞ্চলে অনায়াসে নদীপথেই পরিবহন করা সম্ভব ছিল। এখনো যে সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেছে তা নয়। এখনো সেই সম্ভাবনা অনেকটাই রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় তৎপরতা নেই বললেই চলে। জল পথে আমাদের আন্তর্জাতিক যেগাযোগ ব্যবস্থাও অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

বাঙালি জাতি সম্পর্কে বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘মাছে ভাতে বাঙালি’। এ মাছের প্রধান উৎস ছিল আমাদের নদী। দেশ নদীমাতৃক হওয়ায় প্রচুর মাছ হতো। আমাদের দেশের নদীগুলোর ভগ্নদশায় মাছের প্রধান উৎস লুপ্তমুখী। এখন দেশে প্রচুর মাস চাষ হয়। কিন্তু এ মাছে আর নদীর মাছে যে বিস্তর তফাত বলার অপেক্ষা রাখে না। বংশ পরম্পরায় অনেক জেলেকে বেছে নিতে হয়েছে ভিন্ন পেশা। নদী পাড়ের জীবনে বিষেশত জেলেদের যে ঐতিহ্যপূর্ণ জীবন তাও হারাতে বসেছে।

শহরের পাশ দিয়ে নদীপ্রবাহ না থাকলে সে শহরের সৌন্দর্য যতই হোক না কেন তা অসম্পূর্ণ থাকে। নদী দেশের জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি শহর-জনপদের জন্যও। যে গ্রামের পাশ দিয়ে নদী বয়ে গেছে আর যে গ্রামে নদী নেই এ দুই গ্রামের মানুষের চিন্তাগত-সংস্কৃতিগত পার্থক্য বিদ্যমান।

যদি বাংলাদেশ থেকে নদী হারিয়ে যায় তাহলে বাংলাদেশ আর এমন সবুজ থাকবে না। একশ-দুশ-তিনশ-চারশ বছর পরের প্রজন্ম পড়বে-

একদা নদীমাতৃক ছিল বাংলাদেশ। নদীমাতৃক বাংলাদেশে শরতের আকাশে শান্ত নদীর ওপর শ্বেত-শুভ্র মেঘ খেলা করত। সেই দৃশ্য যে কোনো বেরসিক মানুষকেও কবিমনস্ক করে তুলত। গ্রীষ্মের নদীতে থাকত স্বচ্ছ স্বল্প জল। প্রবাহ থাকত ঝিরঝিরে। বর্ষায় নদী থাকত উন্মাত্ত। ভরা যৌবনা। দুকূল প্লাবিত স্রোতে ভাঙত দুপাড়। একেক ঋতুতে একেক রকম তার রূপ। নদী ছিল বলে ভূমির অল্প গভীরে থাকত জলের স্তর। ফলে ভূমির উপরিতল থাকত সজীব। পাখি ফল খেয়ে কোথাও উচ্ছিষ্ট ফেললে সেখান থেকে আপনা-আপনি গাছ হতো এবং সেই গাছ অনুরূপ ফল দিত। সে মাটিকে বলা হতো সোনার চেয়ে দামি।

নদীগুলো মারা গেলে কয়েকশ বছর পরের প্রজন্ম পড়বে-

জলপথে বিশ্বব্যাপী সহজ ছিল যোগাযোগ। অথচ, শুধু অবহেলা আর উপেক্ষা করে একরে পর এক নদীগুলোকে মেরে ফেলেছে আমাদের পূর্বপ্রজন্ম। নদীর প্রতি দায়বদ্ধ ছিল না আমাদের দেশের মানুষ, আমাদের দেশের সরকার। নদীমুখী সরকার না থাকার কারণে রাষ্ট্র নদীবান্ধব হতে পারেনি। কয়েকশ বছর পরের প্রজন্ম আরও পড়বে-

তাদের অতীত প্রজন্ম অদূরদর্শী ছিল, অযত্ন করেছে নদীর প্রতি। তারা কি আমাদের কথা ভেবে দেখেনি? কত সুন্দর ছিল আমাদের নদী-সবুজ বাংলাদেশ। আমাদের দেশের মুক্তিযোদ্ধারা ৩০ লাখ প্রাণ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির মধ্য দিয়ে লালসূর্যের বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিল আর নদী পরিচর্যায় অনেক কার্পণ্য ছিল স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রনায়কদের।

আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাতে নদীশূন্য বাংলাদেশের ভয়বহতার মুখোমুখি না হয়, আমরা যে রকম বাংলাদেশ জন্মের সময় পেয়েছি তার চেয়েও যেন ভালো স্বদেশ রেখে যেতে পারি সে জন্য নদীর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নদীর জন্য কাজ করতে হবে। নদীকে ভালোবাসাও দেশকেই ভালোবাসা, মাকে ভালোবাসা। ভালো থাকুক আমাদের নদী, প্রবহমান জলরেখা, বিস্তৃত সবুজ; নদীমাতৃক বাংলাদেশ।

তুহিন ওয়াদুদ: সহযোগী অধ্যাপক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও পরিচালক, রিভারাইন পিপল

wadudtuhin@gmail.com