প্রেমের ঢাকা, ঢাকার প্রেম!

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

প্রেমের ঢাকা, ঢাকার প্রেম!

রায়হান উল্লাহ ৬:২২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০২, ২০১৮

প্রেমের ঢাকা, ঢাকার প্রেম!

রাজধানী ঢাকা। আজব নগরী। মানুষের ভারে ন্যুব্জ। হয় তো স্বপ্নেও। এখানে ইট-কাঠ-পাথরে হরেক রঙে সময় বয়। বিরতিহীন চলে জীবনের আজব লেনাদেনা। মানুষগুলো জীবনের মুট বয়। বুঝে উঠতে চায় কোথায় গন্তব্য? ঠিক বুঝতে পারে না! এভাবেই সময় চলছে, চলছে ঢাকা, চলছে জীবন-আগামী গন্তব্যে!

এখানে নতুন এক একটি ভোর জাগে। শুরু হয় অফুরান ছোটাছুটি। ক্রমে ফুলেফেঁপে ওঠে ডাস্টবিন-অফিসপাড়া-টেবিলের ফাইলপত্র। কারও পকেট হয় ফুটো, কারও ফুলেফেঁপে ওঠে। এভাবেই চলে নাগরিক ছলাকলা, স্বপ্ন বুনন। এক সময় তা আংশিক শেষ হয়। আবার দে ছুট। ঢুকে যেতে হবে নাগরিক খোপে। ঠিক সময়ের মধ্যে না হয় কাল ছুটবে কে? এভাবেই চলছে বোধ! মানুষগুলো মানুষ থেকে হয়ে উঠছে নাগরিক। ঢাকার মিশ্র পরশে!

নগরে কত না সময় বয়। কেউ ধোঁয়ায় দুঃখ উড়ায়। কেউ চায়ের পরশে রুটি ভেজায়। কেউ বা অর্থের তরে প্রিয় পরশ। এরই মাঝে ছুটছে ঢাকা। সাইরেন বাজিয়ে চলে বিশেষ যান। তার বুকে সাঁটা জাতীয় মনোগ্রাম। চলে বিশেষ গোত্রের হোমো সেপিয়েনসরা। দুপাশে আজব দৃষ্টি-ভাবনা-খেদ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ। ভাবে সবকিছু নষ্টদের অধিকারে কেন? এও ভাবে-জন্মই তাদের আজন্ম পাপ। না হয় এমন হবে কেন?  

এখানে কেউ ঘুম যায়, কেউ ঘুম খায়। এখানে কারও যাত্রায় লাখো যাত্রায় বিঘ্নতা। মরণাপন্ন শিশু অপেক্ষা করে অভ্যর্থনার গলিপথে। তারও আবার জীবন। এখানে হারিয়ে যায় জীবন, পিচের গোলকধাঁধায়। সব মানানসই। মেনে নিতেই হয়!

নগর দেখায় স্বপ্ন, নগর ভাঙে স্বপ্ন। নগর অনেক কিছুই দিয়ে যায়, ঠিক অঢেল কেড়েও খায়। কী আর করা? বেলাও যে বয়ে যায়! বলা যায় নগর বিদায়! এও কি সহজ? নগর নাগরিককে যে প্রেমেও ভাসায়!

নগর ঢাকায় ঘুম যায় স্বপ্নের লাশ। ঘুম যান রাষ্ট্রীয় কর্ণধাররা। ফার্মগেটে কুকুরসহ ঘুম যান নাম না জানা বয়স্ক মানুষটি। শীতে একটু ওম ভাগাভাগি করে মানুষ ও পশু। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ঘুমায় অসংখ্য স্বপ্ন। ডোমের ছুরির নিচে ঘুম যায় অসংখ্য বেওয়ারিশ লাশ। রেললাইনের কাটা পড়ে ঘুম যায় অগুনতি টোকায়। ময়লার পাশাপাশি ঘুমায় অসংখ্য স্বপ্ন। বেওয়ারিশ জীবনে ‘ড্যান্ডি’র দম নিয়ে ফ্লাইওভারের নিচে ঘুমায় অসংখ্য শিশু-কিশোর। তারা   খুঁজে ঢাকার রূপ, জীবনের রূপ। কোথায় হারালো সব, প্রিয়জন, সংসার। তবুও যে ঘুম যেতে হয় তাদের। এভাবেই ঘুমেরও হয় রকমফের। জেগে থাকে ঢাকা নিজেই!

জেগে থাকে শাহবাগ। পাঁচ টন ট্রাক পার হয় তার বুক চিড়ে। জেগে থাকে কিছু নারী। খদ্দের না ধরলে তাদের আহার ঝুটবে না। জেগে থাকে শীতার্ত মানুষ। ক্ষুধার জ্বালায় জেগে থাকে অনেকেই। নিয়ন আলোয় তারা জীবন খুঁজে। বুঝতে চায় নগরকে, নাগরিককে। জেগে থাকে রাতের কর্মজীবীরা। রাতটি তাদের জাগতে হয়; প্রিয়বধূ-সন্তানকে নিজ জেলায় একটু শান্তিতে ঘুম পাড়াতে। 

এভাবেই নিত্য কর্মযজ্ঞে জেগে থাকে ঢাকা। তার জাগতে হয়। না হয় মানুষগুলো ঠিক ঘুমাতে পারবে না। সে জানে একদিন সে নিজেও ঘুমাবে। কিন্তু অনেক সময় পর। সেই পর্যন্ত মানুষগুলোর ঘুম যাওয়া চায়। এ ব্যবস্থা যে তারই করতে হবে, হয়।

নগর ঢাকা এও জানে এ ঘুম যাওয়া মানুষগুলোই তার চিরতরে ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণ হবে! সে দেখে ক্রমশ সে বোঝাই হচ্ছে, অসংখ্য সিমেন্টের ঝঞ্জালে, পরিকল্পনাহীন। দুঃস্বপ্ন দেখে সে-সবকিছু ধসে পড়ে আছে। যেন এক মৃত নগরী। আশাহত হয়ে ভাবে- সবকিছুর শেষ আছে, একদিন তার পথচলা থেমে যাবে। চিরতরে ঘুমিয়ে পড়বে সে। থেমে যাবে সময়। থেমে যাক, কী আর করা? খেদ একটাই মানুষগুলো ঢাকার প্রেমে পড়লে তার চিরতরে ঘুমিয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে না, পারত না!

সে এও দেখছে বিস্তর সংখ্যায় জোটবেঁধে মানুষগুলো তার চিরতরে ঘুমিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে। সে মুখ বুজে দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এ দীর্ঘশ্বাস যত না তার জন্য, তার চেয়ে বেশি ওই মানুষগুলোর স্বার্থে। ঢাকা ঠিক এও চায়, তার পরশের মানুষগুলো সবসময় চাক ও সে অনুযায়ী কাজ করুক; যেন সে শত-সহস্র বছর বেঁচে থাকে, বাঁচার মতো করে!

সে আবার এও জানে তার প্রেমে মশগুল অনেকেই এর থেকেও বেশি কিছু নিয়ে তার জন্য অপেক্ষা-প্রতীক্ষা সব করে। সে এও জানে তার তরে আজন্ম তিয়াসা বুকে নিয়ে তার অনেক প্রিয় সারথি সারা বিশ্বে স্বমহিমায় অবস্থান করছেন। তারা তার তরে কাঁদেন-হাসেন। তাদের জন্য ঢাকার কষ্ট এবং গর্ব হয়। কী করা? সময়ের বিবর্তনে কত কিছুই যাবে-আসবে। কষ্ট হলেও মেনে নিতেই হয়!
 
এভাবেই অফুরন্ত রহস্য ও ভাবনা ছড়িয়ে ছুটছে ঢাকা। ছুটছে নাগরিকরা। ছোটাছুটির এ খেলা থামার নয়। এ জীবনের একটি নাগরিক অধ্যায়, কিংবা ঢাকা অধ্যায়! আর নাগরিক জীবন যে বাকি জীবনের পূর্ণতা দেয়! বাকি জীবন চলার পথ সহজ করে, মসৃণ করে। তাই এ জীবনকে কি হেলা করা যায়, করা উচিত?

আর সব নগর ছাড়িয়ে ঢাকা তার বুকে ঠাঁই নেওয়া মানুষের জীবনকে সমৃদ্ধ করবেই। ঢাকা তাদের তার প্রেমে ফেলবেই। আর ঢাকার প্রেমেও তাদের পড়তে হবে। তাই অন্তত ঢাকা তাদের বিশেষ কিছু দেবেই! বিশেষ কিছুর সান্নিধ্যে বা তা পেতে ছুটছে মানুষ। ছুটছে চিরায়ত শিল্পের শহর ঢাকা!
পুনশ্চ : এ নিতান্তই নির্দিষ্ট সময়ে একজন ব্যক্তিবিশেষের ভাবনা। সামষ্টিক কোনো গবেষণা নয়। ব্যক্তির দৃষ্টিসীমার গবেষণা হতে পারে! এটি গুরুগম্ভীর কোনো প্রবন্ধও নয়। নগর ঢাকার পূর্ণ ও চিরকালীন চিত্রও নয়। সময় ও ভাবনার পার্থক্যে এ ভাবনা অন্যরকম হয়, হবে। বাস্তবতা ও সময় তাই বলে। একুশ শতকের ঢাকা ক্রমশ বদলাবে। ঢাকায় ঢাকা পড়বে বিগত ও যাপিতজীবন। ঢাকা আঁকবে স্বপ্ন সুন্দরের। এমনই আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন নিয়ে বলতে হয়; প্রিয় ঢাকা তুমি বেঁচে থাক পৃথিবীর সমান বয়স নিয়ে। তুমি জয় করো পৃথিবীকে। হ্যালো ঢাকা, শুনতে কি পাও তুমি; অক্ষরের কষ্ট, হৃদয়ের কথামালা, ভালোবাসার পঙ্ক্তি? জয়তু ঢাকা! 

রায়হান উল্লাহ : কবি ও সাংবাদিক
raihanullah12@gmail.com