উজ্জ্বল-বর্ণিল আলোর নিচে বৈষম্য

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

উজ্জ্বল-বর্ণিল আলোর নিচে বৈষম্য

সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান ১২:৩৭ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০১৮

উজ্জ্বল-বর্ণিল আলোর নিচে বৈষম্য

ক’দিন আগে একাধিক অনলাইন পোর্টালে একটি সংবাদে চোখ পড়ে গেল। সংবাদটি ছিল বাংলাদেশের ধনীদের ধনী হওয়ার মাত্রা ও গতি পৃথিবীর অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি। বড় বড় অর্থনৈতিক শক্তি যেমন চীন, ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ধনীরাও বাংলাদেশের ধনীদের চেয়ে কম গতিতে সম্পদ বাড়িয়ে চলছেন। নব্য উদারবাদের নানা অনুষঙ্গের একটি ধনী-গরীবের বৈষম্যের একটি ভালো উদাহরণ এখন বাংলাদেশ। অথচ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অজর্নের একটি বড় চালিকাশক্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের বাড়তে থাকা বৈষম্য। এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে।

অর্থনীতিবিদদের অনেকেই এই বৈষম্য দেখানোর জন্য জিনি সূচকের কথা বলেন কিংবা জিডিপির কথা বলেন। অথচ বৈষম্য দেখার জন্য তাত্ত্বিক জায়গা দেখানোর চেয়ে নিজের চোখের ইস্তেমালই বড় সম্পদ। ঢাকা শহরে আগে সোনারগাঁ কিংবা শেরাটন ছাড়া পাঁচতারা হোটেলই ছিল না। এখন শহরে এই দুটির বাইরে আরো অনেক পাঁচতারা হোটেল তৈরি হচ্ছে কিংবা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় চলতে ফিরতে কোটি টাকার বিএমডব্লিউ, মার্সিডিস কিংবা পোরশে গাড়ি খুব অস্বাভাবিক কিছু এখন না।

কয়েক বছর আগেও এতটা জমকালো ঢাকা ছিল না, যতটা এখন সে।

উজ্জ্বল-বর্ণিল ঢাকার আলোর নিচে বৈষম্যেরও রয়েছে এক বিস্তর অন্ধকার। দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে সামাজিক বৈষম্য অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে। নাগরিক সুবিধার প্রাপ্তির দিক থেকে এই শহরের মানুষের কষ্টের কথা বলতে শুরু করলে বই লিখে ফেলা যাবে। ২০০৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি হিসেবে। সেখানে গিয়ে দেখি, কোরিয়ান ছেলে-মেয়েরা বাংলাদেশকে চেনে পৃথিবীর অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে। আর এবার ঢাকা এশিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্টতম নগরীর তকমা পেয়ে গেছে। যানজট, ধুলোবালি, দুর্গন্ধ ও জনবান্ধব পরিবহনের অভাব ঢাকার এই তকমা পাওয়ার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু এই সবকিছুই সমাজের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য।

একদিকে পাবলিক বাসে মানুষের চাপে উঠা যায় না আরেক দিকে ব্যক্তিগত গাড়ির চাপে রাস্তায় পাবলিক বাসের জায়গা হয় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ৭৪ শতাংশ ধনিক পরিবারের প্রসূতি সন্তান প্রসবের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী পাশে পান। অথচ, ৭৪ শতাংশ দরিদ্র পরিবারের সন্তান, প্রসবের সময় দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী পাশে পান না। একটি সমাজে এত বৈষম্যই বা কেন? কিসে বাড়ছে এই বৈষম্য? এই প্রশ্নের উত্তর আসবে হাজারো রকমের।

ছোট একটি উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। ধরে নিই, আপনি যে রিকশায় চড়ছেন তার মালিকের একশ রিকশা সে ভাড়ায় দেয়। আর ঐ মালিকের প্রতিবেশী যে রিকশার গ্যারেজের আড়ালে ইয়াবা ব্যবসা করে অনৈতিক অর্থ অর্জন করে চলেছে, তার রিকশার সংখ্যা হয়ত পাঁচশ। ইয়াবা ব্যবসার তরল টাকা সে বিনিয়োগ করেছে অন্যান্য খাতে। আপনি বিসিএস পাশ করে আসা একজন সৎ চাকরিজীবী। অথচ আপনারই ব্যাচম্যাট কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে, বেশ ভালো জায়গায় পোস্টিং নিয়ে নিয়েছে। যেখান থেকে তার আয় বেতন থেকে কয়েকশ গুণ বেশি। সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে আপনাকে কাঠখড় পোড়াতে হয়, অথচ আপনারই সহকর্মী তার সন্তানকে এমন এক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়ান যেখানে নবম গ্রেডের একজন শিক্ষার্থীর বার্ষিক বেতন ২০ লাখ টাকা। আর এমনই বৈষম্য প্রতিটি স্তর থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায় পর্যন্ত। নব্য উদারবাদের প্রতিফলন এটি। যেখানে ধনী আরো ধনী হচ্ছে, গরীব হচ্ছে আরো গরীব। মাঝের মধ্যবিত্তের অস্তিত্ব সংকটে।

কিন্তু ইতিহাস বলে, মধ্যবিত্তের সংকট সমাজে অস্থিরতা আরো বাড়িয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১১ সালের আগে সেখানে স্কুলে যাওয়ার হার বাড়ছিল, দারিদ্রের হার কমছিল, কমছিল মাতৃ মৃত্যুর হার। কিন্তু সামাজিক বৈষম্যের তীব্রতা বাড়ার কারণে মধ্যবিত্তের অসন্তোষ সেই সময় মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের সমাজব্যবস্থাকেই ওলটপালট করে দেয়। 

নব্য উদারবাদের কারণে বাংলাদেশে একটি শ্রেণির হাতে বিপুল সম্পদ জমা হচ্ছে। একটি শ্রেণির হাতে যখন সব সম্পদ পুঞ্জীভূত হয়, তখন তার প্রভাব সমাজের স্তরে স্তরে পড়ে। যা নিয়ে আসে এক অস্থিরতা ও অসন্তোষ। কিন্তু সমাজব্যবস্থার এই বৈষম্য নিয়ে যাদের উচ্চকণ্ঠ হওয়া উচিত সেই গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী-প্রত্যেকে শ্রেণিই নিজেদের পাওয়া-না পাওয়া নিয়েই ব্যস্ত। ফলে সামাজিক বৈষম্য কিংবা ধনী-গরীবের বৈষম্যের বিষয়টি রয়ে যাচ্ছে তিমিরেই।

লেখক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়