কেমন আছে রেমিট্যান্স মেশিনেরা?

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ২৯ কার্তিক ১৪২৫

কেমন আছে রেমিট্যান্স মেশিনেরা?

লীনা পারভীন ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০১৮

কেমন আছে রেমিট্যান্স মেশিনেরা?

ফিরছিলাম ব্যাঙ্গালোর থেকে। একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন থেকে ফেরার পথে আমার কানেক্টিং ফ্লাইট ছিল দিল্লিতে। দিল্লি এয়ারপোর্ট থেকে জেট এয়ারওয়েজের বিমানে চড়ার লাইনে দেখলাম বিশাল এ বিমানের ৮০ শতাংশ যাত্রী বাংলাদেশি।

আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি বিষয়টা কী? বিমানের উঠার লাইনে আমার সামনেই ছিল দুজন বোরকা পরা নারী। দেখে বুঝা যাচ্ছিল তারা ওখানে কী কাজ করেন। উৎসুক হয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কী বাংলাদেশি? উত্তর দিলো হ্যাঁ। কেন? জানতে চাইলাম, কোত্থেকে আসতেছেন? ছুটিতে আসছেন না একবারেই ফিরে আসতেছেন? সামান্য সন্দেহের চোখে আমাকে উত্তর দিলো সৌদি থাইকা কিন্তু আপনে এত কথা জানতে চাইতেছেন কেন? হাসি দিয়ে জানালাম যেহেতু আপনি আমাদের দেশি আর পত্রিকায় পড়েছি বিদেশে আমাদের দেশের লোকগুলো অনেক অত্যাচারে থাকে। তাই আর কি। অনেক কষ্টের হাসি দিয়ে জানালো, আর কষ্ট। দালালের মাইদ্যমে গেছিলামগো মা, পয়সা উসুল করার আশায় এত দিন আছিলাম। কিন্তু গায়ে আর সয় না তাই এইবার একবারেই আইসা পড়ছি। আর যামু না। ক্ষোভ ও কষ্টের এক অদ্ভুত অভিব্যক্তি দেখলাম।

লাইন ধরে বিমানে চড়ে বসলাম। নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও বিমান ছাড়ছিল না। বিমানের ক্যাবিন ক্রু’র কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি জানালেন এখনো ৪০ জন যাত্রী আসা বাকি। এবং জানলাম এরা সবাই বাংলাদেশি। বিমানের ভেতরে এদের সামলাতে বিমান বালাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছিল কারণ ভাষাগত একটা জটিলতা এখানে বড় ভূমিকা রাখে। এরা হিন্দি বা ইংরেজি কোনো ভাষাতেই যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছিল না। সব ঝামেলা শেষ করে বিমান চলা শুরু করল প্রায় ৩০ মিনিট দেরি করে। আমার পাশের দুই সিটে বসেছিলেন দুই বাংলাদেশি। আশপাশের সব সিটেই বাংলাদেশিরাই ছিল। শুরু হলো নিজেদের মধ্যে আলাপ। এরা এই সিট থেকে সেই সিটে একে অন্যকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করা থেকে শুরু কে কোন দেশ থেকে ফিরছে, কেন ফিরছে? মালিক কেমন, কাজের কী অবস্থা ইত্যাদি সংবাদ জানছিল। তাদের এসব আলাপে আমি ফিল করিনি যে আমরা কোন ইন্টারন্যশনাল ফ্লাইটে বসে আছি। একদমই দেশি লোকাল বাসের একটা ফিল পাচ্ছিলাম।

পাশের সিটে বসা ছিল ফরিদপুরের জামাল মিয়া। জীর্ণশীর্ণ শরীরে ময়লা জামা কাপড় পরা কিন্তু মুখে প্রাণখোলা হাসি। আলাপের প্রসঙ্গে জানতে পারলাম তিনি ওমানে থাকতেন কিন্তু গত চার মাস ধরে মালিক কাজ করিয়েছে বেতন দেয়নি। না খেয়ে না দেয়ে কোনো রকমে চেষ্টা করে যাচ্ছিল যদি বেতনের টাকাটা ফিরত পাওয়া যায়। এর মধ্যে মামলা মোকদ্দমার ঝামেলাও হয়েছে এবং তারা পালিয়ে কোনো রকম বেঁচে ছিল। পরে ব্যবস্থা করে চার মাসের বেতনের টাকা না পেয়েই দেশে ফিরত চলে এসেছে। প্রায় ৭ বছর পর তিনি ফেরত আসছেন দেশে। মোট ১০ বছর ছিলেন বিদেশে। যাই কাজ করতেন চলে যেত কোনো রকম কিন্তু এখন ওখানে বাংলাদেশিদের বাজার খুব খারাপ। কাজও পাওয়া যায় না তেমন। জানতে চাইলাম আর যাবেন কোন দেশে? উত্তর দিলো না গো বইন, দ্যাশে কামলা খাইট্টা খায়াম তাও আর বিদেশে যামু না। এত অপমান, লাঞ্ছনা আর সওয়া যায় না।

এমন কাহিনী শুনলাম সৌদি, বাহরাইন, ওমান থেকে আসা যাত্রীদের মুখেও। সবাই ওখানকার মালিকদের গালাগাল করছিল অকথ্য ভাষায়। বিমান থেকে নামার আগে একেকজনের মুখে যে তৃপ্তির হাসি দেখেছি তার মূল্য কোনো অর্থ দিয়ে আদায় করা যাবে না। একেকজন প্রবাসী মানেই একেকটা জীবনের গল্প। প্রসঙ্গক্রমে আরেকটা অভিজ্ঞতা না বলে পারছি না। মালয়েশিয়া গিয়েছিলাম মে মাসে। বিখ্যাত শপিংমল বুকিত বিনতাং এ হোটেলে ফেরার গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম আমি আর আমার এক বন্ধু। হঠাৎ শুনলাম মোবাইলে কেউ একজন বাংলায় কথা বলছেন। আবারও উৎসাহ আবারও প্রশ্ন। জানতে চাইলাম ভাই এখানে কত বছর? কী কাজ করেন? জানালেন তিনি শপিংমলে প্লাম্বারের কাজ করতে এসেছেন। কোনো স্থায়ী কাজ পাচ্ছেন না তাই এমন খেপের কাজ করেই জীবন চালাচ্ছেন। দেশে ফোনে কথা বলছিলেন। দেখলাম আবেগের সঙ্গে তিনি তার পরিবারকে জানাচ্ছেন আমাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথাও। টাকা পয়সা খরচ করে এসেছেন তাই দেশেও ফিরত যেতে পারছেন না দেনা শোধ করতে হবে।

জেট এয়ারওয়েজের যে বিমানের কথা এখানে বলেছি তার ৮০ ভাগ বাংলাদেশি যাত্রীর মধ্যে ৬০ ভাগ একেবারে দেশে ফিরত চলে আসছেন কাজের অভাবে, কষ্ট সইতে না পেরে। বলেছিলাম নারীর কথাও। গতকালই জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ভয়াবহ রিপোর্টটি আবারও প্রকাশ করল আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের করুণ কাহিনী অথচ এদের পাঠানো অর্থই বর্তমানে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। কতটা নির্দয় পরিবেশে তারা জীবনের বিনিময়ে কাজ করে যাচ্ছেন কেবল একটু ভালো থাকার আশায়। কিন্তু সেই ভালো কী তারা থাকছেন না তাদের পরিবার থাকছে? যেসব নারীরা গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি বা অন্য দেশে যাচ্ছে তারা এখন দলে দলে ফিরছে শরীরে ও মনে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে। জমি জিরাত বিক্রি করে সহায় সম্বলহীন হয়ে তারা ভিন দেশে পাড়ি দিচ্ছে পরিবারকে ভালো রাখার কামনা নিয়ে। ভেবেছিল দেশের মাটিতে টাকা কামাই অনেক কষ্ট তার চেয়ে বিদেশের মাটিতে কষ্ট করলে অনেক টাকা কামাই করা যায়। সিনেমার পর্দায় দেখা বিদেশ আর বাস্তবের বিদেশ যে এক নয় এসব অসহায় মানুষেরা কী আর বুঝতে পারে? তাদের বুঝানোরও কেউ নাই পাশে।

আমাদের দেশের উন্নয়ন এখন অন্য দেশের জন্য রোল মডেল। আল্ট্রা ধনীর তালিকায় বাংলাদেশ এখন ওপরের সারিতে অথচ এ একই দেশের কিছু মানুষ এখনো জীবিকার সন্ধানে জীবন মরণ হাতে নিয়ে কী অসহায় দিন কাটাচ্ছেন পরদেশে যেখানে অসুস্থ হলে দেখার কেউ নেই, মরে গেলেও খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই। আপনজনের মুখ দেখতে চাইলে কেবল চোখের পানি সম্বল। একজন মহিউদ্দীন দীর্ঘ তিন বছর পর দেশে ফিরছেন অথচ তার সন্তানের বয়স তিন বছর। অর্থাৎ, জন্মের পর থেকে তিনি তার সন্তানের মুখ দেখতে পারেননি। যখন ফিরছেন তখন হাতে নেই কিছুই। সন্তানের জন্য একটি খেলনা কিনে আনবেন সেই সামর্থ্যটুকুও নিয়ে ফিরেননি কারণ তিনি চাকরি খুইয়ে বিনা বেতনে দেশে ফিরছেন।

এ কষ্টের শেষ কোথায়? আমাদের দেশের যারা পুঁজিপতি শ্রেণি আছেন যারা বিদেশের মাটিতে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছেন তারা চাইলেই কিন্তু সেই অর্থে দেশেই গড়ে তুলতে পারেন আরেকটি সৌদি বা ওমান যেখানে আমাদের সেসব হতভাগা বাইবোনেরা কাজ করে নিরাপদ জীবন পেতে পারে।

যেসব প্রবাসী নারী বা পুরুষরা নির্যাতিত হয়ে ফিরছেন, তাদের মানসিক অবস্থার দায় কে  নেবে? জানা গেছে মন্ত্রণালয়ের কাছে রিপোর্ট জমা হয়েছে কিন্তু বরাবরের মতোই প্রশ্ন থেকে যায় মন্ত্রণালয় কী নেবে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা?

এসব অসহায় মানুষগুলোর এক টুকরো স্বপ্নকে এভাবে মেরে ফেলার দায় কী কারও আছে? 

লীনা পারভীন : কলাম লেখক ও সাবেক ছাত্রনেতা।
priompritom@gmail.com