কীভাবে ভাল ইলিশ চিনবেন?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ | ৩ কার্তিক ১৪২৫

কীভাবে ভাল ইলিশ চিনবেন?

সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন ৫:১৩ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৮

কীভাবে ভাল ইলিশ চিনবেন?

মাছের রাজা ইলিশ। আর স্বাদের রাজা পদ্মার ইলিশ। তাই বাজারে সবাই পদ্মার ইলিশ খোঁজে। ভাল স্বাদের ইলিশ খেতে হলে প্রথমে তাজা ইলিশ হতে হবে। আর তা নদীর হতে হবে। এখন সময় ইলিশের। তাই ইলিশ সর্ম্পকে কিছুটা ধারণা নিয়ে ইলিশ কিনতে গেলে লাভবান হবেন।

ইলিশের গুণ

এসেনসিয়াল ফ্যাটি এসিড মস্তিষ্কের বুদ্ধি বিকাশে খুবই উপকারি। ইলিশ মাছ কর্মদক্ষতা বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়; চোখের দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি করে; প্রজননতন্ত্র গঠন ও বিকাশে সাহায্য করে। এটি ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। তাই রূপচর্চ্চায় সচেতনরা ইলিশ খান ইলিশের মৌসুমে।

ভাল ইলিশ কিনতে হলে আপনার হাত,চোখ, নাক তিনের ব্যবহার করতে হবে। কী করে ভাল ইলিশ চিনবেন? চলুন জেনে নেই।

চোখ:
ভাল ইলিশের চোখ স্বচ্ছ থাকবে, দেখাবে উজ্জ্বল। পুরানো কোল্ড স্টোরেজে রাখা ইলিশ মাছের চোখ ভিতরের দিকে ঢুকে থাকবে এবং চোখ ঘোলা দেখাবে। মনে রাখবেন যে ইলিশের চোখ লাল তারচেয়ে নীল চোখের ইলিশের স্বাদ বেশি পাবেন। তাই লাল চোখের ইলিশ তাজা হলেও এড়িয়ে যান।

মুখ:

ইলিশের মুখ যত সরু তার স্বাদ তত বেশি।

ফুলকা বা কানকা:

মাছের কানকা বা ফুলকাটি ফাঁক করে দেখুন। তাজা ইলিশে লালচে ভাব থাকবে। যদি পুরানো মাছ হয় তবে লালচে ভাব থাকবে না। ফুলকার রং ধূসর বা বাদামি থাকবে।

গন্ধ:
মাছটি হাতে নিয়ে নাকের কাছে ধরুন। আপনি যে গন্ধ প্রত্যাশা করেছে ইলিশের থেকে সেই গন্ধ পাবেন তাজা ও ভাল ইলিশ থেকে। যদি পুরাতন ইলিশের নিজস্ব গন্ধ থাকবে না। তাজা ইলিশ মাছ লোনা পানি থেকে ধরা হলে, মাছে লবণাক্ত গন্ধ থাকবে। মিঠা পানির হলে পানির মতো গন্ধ থাকবে। যদিও মিঠা পানির ইলিশের স্বাদ বেশি। ইলিশ যতই সমুদ্র থেকে দূরে আসে দেহে লবনের পরিমাণ কমতে থাকে। তার স্বাদ তত বাড়ে।

দেহ ও রং:

তাজা ইলিশের দেহে অনেকটাই নমনীয় হবে। মাছের গায়ে চাপ দিলে স্পঞ্জ করে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন বরফে রাখা ইলিশ যখন অনেকটা শক্ত হয়ে যায়। চকচক করলে সোনা হয় না। তবে তাজা ইলিশ মাছ চকচক করবে। রূপালী রঙের ঝলক আপনি পাবেন ভাল ইলিশে। চকচক দেখাবে। তাজা ইলিশের দেহে পিচ্ছিল একটা ভাব থাকে। হাত দিয়ে ধরলে টের পাবেন। ঘাড় মোটা হবে।

পেট:

মাছটি হাতে নিয়ে হালকা চাপ দিন তার পেটে যদি মুখ বা ফুলকা দিয়ে রক্ত বের হয় তবে এই মাছ বাদ দিন। এটি দীর্ঘ দিন বরফে রাখা মাছ। পেট যদি ফুলা থাকে তবে ডিম আছে মাছে। ইলিশের ডিম অনেকের প্রিয়। ডিম হলে ছোট ইলিশের স্বাদ কমে যায়। কিন্তু বড় ইলিশ বিশেষ করে ১ কেজির উপরে হলে কোনো সমস্যা নেই। স্বাদ পাওয়া যায়। তবে ডিম এড়াতে চাইলে পেট মোটা ইলিশ বাদ দিন।

সাগর ও নদীর ইলিশ:

সাগরের ইলিশে থেকে নদীর ইলিশের স্বাদ ভাল। নদীতে আসার পর খাবারের কারণে ইলিশের স্বাদ বাড়ে। সাগরের ইলিশে নোনা ভাব বেশি থাকে। তাই ভাল স্বাদ পেতে নদীর ইলিশ কিনতে হবে। সাগরের ইলিশ লম্বাটে হয়। নদীর ইলিশ খাটো ও গোলাকার, রূপালী ভাব বেশি। যে নদীর পানি যত স্বচ্ছ সেই নদীর ইলিশের পিঠ তত কালচে হয়। ঘোলা নদীর ইলিশের পিঠে কালচে ভাব কম।

ছোট করে বলি- ঘাড় চওড়া, চোখ নীল, মুখ সরু, পেট সমান মাছ কিনলেই জয়ীই হবার সম্ভাবনা বেশি। ভুল করেও লম্বা, সরু ইলিশ মাছ কিনবেন না। তাতে স্বাদ পাবেন না ভাল ইলিশের।

এ গেল স্বাদের ইলিশের বর্ননা। মুখের স্বাদ ছাড়াও ইলিশের অন্য অনেক স্বাদ আছে। বাংলাদেশের প্রাণবৈচিত্র ও অর্থনীতিকে ইলিশের ভূমিকা আছে। বাংলাদেশে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ইলিশের অবদান এক দশমিক ১৫ শতাংশ। দেশের মোট মাছের ১২ শতাংশই ইলিশ। এর অর্থমূল্য প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা।

বাজারে থেকে আপনি ইলিশ কিনে দামের কারণে হতাশ হতেই পারেন। কিন্তু হাজার হতাশার মাঝে বাংলার ইলিশ আশার আলো। বিশ্বের কোনো দেশের সাথে এই ইলিশের তুলনা করা যাবে না। স্বাদ, গন্ধ, অর্থনৈতিক দিক বিবেচনায় আমাদের ইলিশ সেরা। দেশে দেশে যখন ইলিশের উৎপাদন কমছে। তখন ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ রেকর্ড গড়েছে। বিশ্বের ৬০ শতাংশ ইলিশই উৎপাদিত হয় বাংলাদেশে। মাত্র দেড় দশকের ব্যবধানে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ ছাড়িয়ে গেছে পাঁচ লাখ টনে।

রপ্তানীর নামে চিড়িং চাষ করে যখন পরিবেশ প্রকৃতির বারটা বাজাচ্ছি। তখন প্রকৃতির দান ইলিশ আর্শিবাদ। ইলিশ ডিম ছাড়ার জন্য বেছে নেয় বাংলাদেশের সীমানাকে। বর্ষায় এ দেশের নদীগুলো ‘মা’ইলিশে ভরে ওঠে। এই মা ইলিশ আমাদের সৌভাগ্যের প্রতীক। তাকে রক্ষার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে ইলিশের উৎপাদন আরও কয়েক লাখ টন বাড়ানো সম্ভব।

ভাল স্বাদের ইলিশে আপনি ও আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মন ভরাতে চাইলে আপনাকে মা ইলিশ ও জাটকা ইলিশ রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। স্বপ্ন দেখতে হবে এদেশের প্রতিটি নদী জাটকা ইলিশের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে হবে। হাজার হাজার তরুণ ইলিশের ব্যবসায় আসবে। ৭ হাজার কোটি টাকার বর্তমান ইলিশ বাণিজ্য তখন ৭০ হাজারে বিস্তৃত হবে।

লেখক: বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, পরিবেশ কর্মী।