বাংলাদেশ কি ধনকুবেরের কারখানা?

ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮ | ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বাংলাদেশ কি ধনকুবেরের কারখানা?

উমর ফারুক ৬:৩৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৮

বাংলাদেশ কি ধনকুবেরের কারখানা?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্সের ‘ওয়ার্ল্ড আলট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট ২০১৮’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ এখন ব্যাপক হারে ধনকুবের সৃষ্টি করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ধনকুবের উৎপাদন কারখানার ধারক এখন বাংলাদেশে। প্রতিবেদন বলছে, ‘এটা আশ্চর্যজনক যে ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকে চীন বিশ্বের এক নম্বর দেশ নয়। এ অবস্থান বাংলাদেশের।’

সবাইকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ আজ সবার ওপরে। ভাবা যায়, আমরা এখন খুব দ্রুতগতিতে ২৫২ কোটি টাকাওয়ালা মানুষ তৈরি করতে পারছি! ২০১২ সাল থেকে শুরু করে, গত পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়েও বাংলাদেশ বেশি ধনী মানুষ উৎপাদন করেছে।

এ সময়ে দেশে ধনী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে গড়েছে ১৭ শতাংশেরও বেশি হারে, অথচ সারা বিশ্বে যার গড় প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। খবরটা আনন্দের, নাকি দুঃখের? লজ্জার, নাকি গর্বের? আশার নাকি হতাশার? প্রশ্নগুলো থেকেই যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে যখন আমরা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের কথা বলছি, তখন ধনী মানুষ তৈরির মহাকর্মযজ্ঞ কোনো ইতিবাচক খবর হতে পারে না, বরং নিঃসন্দেহে বৃহৎ অর্থে নেতিবাচক। মুক্তবাজার একটি নির্মম ব্যবস্থার নাম। বিশ্বায়ন একটি প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতার নাম। তবু আজকের বিশ্বে এই শব্দ দুটি সবচেয়ে বেশি জৌলুস ছড়াচ্ছে। ফলে সেই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়ায়, ধনীরা ক্রমাগত আরও ধনী আর গরিবরা আরও গরিব হয়ে উঠছে।

বিশ্বায়ন যন্ত্রের সঙ্গে তাল দিতে গিয়ে, দাতাদের প্রণাম জানাতে গিয়ে, কখনো কখনো রাষ্ট্র তোয়াজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। এতে সমতার নামে সারা বিশ্বে বৈষম্য বপিত হচ্ছে। তাতে জল দেওয়া হচ্ছে, যত্ন নেওয়া হচ্ছে। তাই তার ফলটার নামও বৈষম্য। এভাবে চলতে পারে না। এভাবে চললে পৃথিবী আগামীতে প্রচণ্ডভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে। সমাজ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়বে।

বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৪ কোটি মানুষ আজও দরিদ্র এবং ২ কোটিরও বেশি মানুষ আজও হতদরিদ্র। শতকরা হিসাবে যথাক্রমে ২৪.৩ শতাংশ ও ১২.৯ শতাংশ।

রংপুর বিভাগে গরিব মানুষ বেশি। দারিদ্র্য হার সবচেয়ে বেশি এরকম ১০টি জেলার মধ্যে রংপুরেই ৫টি। কুড়িগ্রাম, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাট, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, জামালপুর, কিশোরগঞ্জ, মাগুরা দেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চল। আমাদের অর্থনীতির মূল সমস্যা সম্পদ নয়, বরং সম্পদের অসম বণ্টন। প্রতিবেদন বলছে, আমাদের দারিদ্র্যও ব্যাপক অসমভাবে বণ্টিত। জেলা হিসেবে কুড়িগ্রাম দেশে সবচেয়ে দরিদ্র জেলা। এখানকার ৭০.৮ ভাগ মানুষ দরিদ্র। কোথাও কোথাও এই হার ৭৭ শতাংশ, তবে ৬৪ নিচে কোথাও নয়।

অন্যদিকে দেশে সবচেয়ে কম দরিদ্র নারায়ণগঞ্জে। শতকরা হারে যার পরিমাণ ২.৬। স্থানভেদে এর পরিমাণ ৪ থেকে ৬ শতাংশ। ঢাকায় দারিদ্র্য হার ১০ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১৩.৭ শতাংশ। অর্থাৎ বলা যায়, দেশে অঞ্চলভেদে দারিদ্র্য হারের পার্থক্য একাত্তর থেকে আড়াই। পার্থক্যটা খুবই হতাশাজনক।

এটা কোনো সুস্থ অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। কিন্তু কেন এ বৈষম্য? বৈষম্যের নেপথ্যই বা কী? তার উত্তর খুঁজতে দীর্ঘসময়ে আমরা চেষ্টা করিনি, অথবা পারিনি। ফলে আমরা ক্রমাগত একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রের পথেই এগিয়ে চলেছি।

বর্তমানে আমরা নিম্ন-মধ্যআয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। কিন্তু দেশের সার্বিক সুষম উন্নয়ন চিত্র আদৌ সন্তোষজনক নয়। উপযুক্ত উল্লিখিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমাদের গড় মাসিক খানা আয় ১৫ হাজার ৯৪৫ টাকা।

২০১০ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে, তাদের মাসিক আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। যার বিপরীতে, একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় কমে দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়। কিন্তু ২০১০ সালে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৭৯১ টাকা। আজকের হিসাব বলছে, ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ৩৮.১৬ শতাংশ আয়। কিন্তু ছয় বছর আগেও আমাদের চিত্রটা এরূপ ছিল না। তখন ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ছিল ৩৫.৮৪ শতাংশ আয়।

অন্যদিকে, বর্তমানে ১ শতাংশ আয় করেন ১০ শতাংশ মানুষ। কিন্তু কয়েক বছর আগেও এমনটি ছিল না। তখন এই সমপরিমাণ মানুষের হাতে ছিল ২ শতাংশ আয়। অপর প্রান্তে, দারিদ্র্য কমার গতিও ক্রমাগত কমে আসছে। ২০০০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত ১.৭৮ শতাংশ হারে আমাদের দারিদ্র্য কমেছে। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে ২০১০ পর্যন্ত বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমার হার নেমে এসেছে ১.৭-এ। আর পরের ছয় বছর তা আরও কমে নেমে এসেছে ১.২ শতাংশে। এটা আজকের বাংলাদেশের বৈষম্যমূলক অর্থনীতির প্রকৃত চিত্র। যা আমাদের ভাবায়, হতাশ করে।

আজকের অর্থনীতি উন্নয়ন বলতে বোঝে সুষম উন্নয়ন। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে সুষম উন্নয়ন অনেকখানি প্রশ্নবিদ্ধ। এটা সত্য, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটছে। এটা প্রচণ্ড আনন্দের। সে জন্য বাংলাদেশকে হৃদিক অভিনন্দনও।

কিন্তু এভাবে বাংলাদেশ যদি ক্রমাগত একটি ধনকুবের তৈরির কারখানায় পরিণত হয় তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট হবে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। একশ্রেণির মানুষের হাতে একসময় কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে রাষ্ট্রের সমগ্র সম্পদ। ক্ষুধামুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়বে। সমাজে বৈষম্যরেখা আরও প্রশস্ত হতে থাকবে। ধনী রাষ্ট্র তৈরির প্রক্রিয়ায় হয়তো আমরা এগিয়ে যাব, তবে সুস্থ, সুষম উন্নয়ন রাষ্ট্র বিনির্মাণ প্রক্রিয়ায় অনেকটা পিছিয়ে পড়ব।

হতাশার খবর হলো, গত দেড় দশকে, প্রায় এক লাখ ধনকুবের ভারত ছেড়ে চলে গেছে। বিদেশে অর্থপাচার করেছে। দেশের সম্পদ নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে ভিনদেশে। বাংলাদেশও এই একই ঘটনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তবে সঠিক হিসাবটা আমাদের জানা নেই।

একটি রাষ্ট্র যখন ধনীবান্ধব হয় তখন তা দীর্ঘ ও স্বল্প উভয় মেয়াদেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি রাষ্ট্র যখন জনবান্ধব না হয়ে, বৈষম্যবান্ধব হয় তখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ব্যাপকভাবে উন্নয়ন বঞ্চিত হয়।

তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রয়োজন বৈষম্যহীন উন্নয়ন এবং তা অতি দ্রুততম সময়ে, এবং এখনই অর্থপাচার প্রতিরোধ করতে হবে, ধনকুবেরদের বিদেশে যাওয়া বিদেশে পাড়ি জমানো বন্ধ করতে হবে।

তথ্য-উপাত্ত বলছে, বাংলাদেশ ক্রমাগত একটি বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় ক্রমাগত বৈষম্যের অন্ধকার নেমে আসছে। প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্রকে বৈষম্যহীন করতে, সুষম উন্নয়নের ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমরা কী কী উদ্যোগ গ্রহণ করেছি? যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করছি সেগুলো কি যথেষ্ট? যদি যথেষ্টই হবে তবে কেন বৈষম্যের পথ ক্রমাগত প্রশস্ত হচ্ছে? যদি আমরা আজ, এখনই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে কার্যকর, প্রয়োগিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে না পারি, তবে খুব খারাপ সময় আসছে আমাদের জন্য।

আমাদের প্রত্যাশা, আজকের বাংলাদেশ সারা বিশ্বে বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের উদাহরণ হয়ে উঠুক। সুষম উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক। কেন আমরা ধনকুবের তৈরির দৃষ্টান্ত হচ্ছি? কেন আমরা স্বীকৃত ধনকুবের তৈরির কারখানায় পরিণত হলাম? এটা আমরা চাইনি। চাই না। আমরা চাই, বাংলাদেশ হোক সুষম উন্নয়ন ধারার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাম্য ও সমতার এক অনুকরণীয় কারখানা।

তা না হলে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্ট হবে। অধিকারের প্রশ্নে আমাদের যে সমাজতন্ত্র তা বিনষ্ট হবে। মনে রাখতে হবে, কয়েকজন ধনকুবেরের হাতে আমাদের সমগ্র সম্পদ জিম্মি হতে পারে না। আমরা তা হতে দিতে পারি না।

উমর ফারুক : শিক্ষক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

faruque1712@gmail.com