নির্বাচনী যাত্রা, যাত্রীদুর্ভোগ ও নেতার ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

নির্বাচনী যাত্রা, যাত্রীদুর্ভোগ ও নেতার ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’

মাসুদ কামাল ২:১৬ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৮

নির্বাচনী যাত্রা, যাত্রীদুর্ভোগ ও নেতার ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’

ভদ্রলোক আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত। বয়স্ক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। অবসর জীবনে পত্রপত্রিকা পড়েন, টেলিভিশনের টকশোগুলো দেখেন। তার বিশেষ আগ্রহ রাজনীতি নিয়ে। দেশ কিংবা বিদেশ-সকল রাজনীতির খবরই তিনি আগ্রহ নিয়ে পড়েন, শোনেন। এসব পড়েন আর হতাশ হন। হতাশার মাত্র বেড়ে গেলে ক্ষিপ্ত হন। যেমন, সেদিন তার ক্ষোভ প্রকাশিত হলো ওবায়দুল কাদেরের প্রতি।

আমার সঙ্গে দেখা হতেই বললেন, ‘আচ্ছা, রাজনীতিতে কি সৌজন্যবোধ, ভদ্রতা এসব থাকতে নেই? অযৌক্তিক কথাবার্তা বলা কিংবা ঔদ্ধত্য কি রাজনীতির প্রধানতম শর্ত?’

আমি শুরুতে বুঝতে পারলাম না, কি প্রসঙ্গে কেন উনি বলছেন এমন। এক দু’ কথা বলতেই বুঝতে পারলাম- ক্ষোভটা তার ওবায়দুল কাদেরের উপর। বহুল আলোচিত ট্রেনযাত্রা, সেখানে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ এবং সবশেষে এনিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের নিরুদ্বেগ মন্তব্য তাকে কেবল হতাশই নয়, রীতিমত ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

রাগত স্বরে বললেন, ‘তার কথাগুলো শুনেছো? পাঁচ ঘন্টা লেট করে ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছেছে, আর সেটাকে নাকি যাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিয়েছে! ওই ট্রেনের সব যাত্রীর সঙ্গে তার কথা হয়েছে? দেখা হয়েছে? উনি কী করে সকলের মনের কথা পড়ে ফেললেন? ট্রেনের সবাই কি আওয়ামী লীগ করে নাকি?’

ভদ্রলোকের কথাগুলো খুবই যৌক্তিক। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বাস্তব সম্মত হয়তো নয়। এখানকার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে আমরা কী দেখি? রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে যখন নেতা, কর্মী, সমর্থকরা যান, হইচই করতে করতে যান। সড়ক পথে গেলে কোনো মালিকের কাছ থেকে বাস সংগ্রহ করে নেন, হয়তো নামেমাত্র কিছু অর্থ, বড়জোর তেল খরচ, দেয়া হয় মালিককে। অনেক ক্ষেত্রে কিছুই দেয়া হয় না, প্রায় জোর করেই বাস নেয়া হয়। আর ট্রেনে গেলে, যদি সেটা সরকারে থাকা দলের কর্মসূচি হয়, সবাই অবধারিতভাবে বিনা টিকেটে ট্রেনে উঠে। এটাই আমাদের দেশে প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি। সে বিবেচনায় আওয়ামী লীগের এবারের এই ট্রেনযাত্রাকে বরং কিছুটা ব্যতিক্রমই বলতে হবে। নেতাকর্মীদের জন্য তারা ৮৪টি টিকেট কিনেছিল। রেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য দুটো অতিরিক্ত বগি জুড়ে দিয়েছে, যাতে নিয়মিত যাত্রীদের উপর চাপ না পড়ে। এতটুকু পর্যন্ত ভালোই ছিল। ঝামেলা হয়ে গেল ট্রেনটি চলতে শুরু করার পর থেকেই।
সেটি ছিল নীলসাগর এক্সপ্রেস।

ঢাকা থেকে নীলফামারী রুটের সবচেয়ে ভালো ট্রেন। নয় ঘন্টায়, ঢাকা থেকে সকাল আটটায় রওয়ানা হয়ে নীলফামারী পৌছে চারটা পঞ্চান্ন মিনিটে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ- লম্বা জার্নির ধকল যাদের জন্য ক্ষতিকর, তাদের কাছে এটি অত্যন্ত প্রিয় একটি ট্রেন। এই ট্রেনটিকেই বেছে নেয়া হয় আওয়ামী লীগের প্রথম ‘নির্বাচনী যাত্রা’র বাহন হিসাবে। ‘নির্বাচনী যাত্রা’ বললাম এ কারণে যে, উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে এই শব্দ দুটিকেই বেছে নেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য হিসাবে তারা বলেছিলেন, নির্বাচনের আগে দেশজুড়ে নেতা-কর্মীদের চাঙা করা এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমকে জনগণের কাছে তুলে ধরার লক্ষ্য হিসাবেই তাদের এই ট্রেন যাত্রা।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে টানা দশ বছর। এর আগে অন্য কোনো দল এই দেশে একটানা এতবছর সরকারে থাকতে পারেনি। কেবল সময়ের বিবেচনাতেই নয়, ক্ষমতার বিবেচনাতেও এটা একটা অসাধারণ উদাহরণ। এই দেশে এর আগে এত দাপটে আর কোনো সরকার ছিল না। প্রতিটি সেক্টরে তাদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ। এমনকি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর উপরও। এই নিয়ন্ত্রণটা এমন যে, কার্যকর বিরোধীদল বলতে তেমন কিছুর অস্তিত্বই যেন দেশ থেকে তারা প্রায় বিলীন করে দিয়েছে।

দেশের কোথাও, তা সে যত প্রত্যন্ত অঞ্চলেই হোক না কেন, বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণ বা দাপট দেখা যায় না। এমন একটা আয়েশী পরিস্থিতিতে দলের নেতা-কর্মীদের চাঙা করার প্রয়োজনটা কেন মনে হলো, সেটা হয়তো গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে একথা ঠিক যে, নির্বাচনী যাত্রার শুরুতে খোদ ওবায়দুল কাদের সাহেবই কিন্তু ‘চাঙা’ শব্দটা উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘সামনে নির্বাচন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা পূর্ণ হবে। প্রস্তুতি সেভাবেই নিতে হবে। অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা থাকলে তা নিরসন করা হবে। আমাদের এই যাত্রা তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাঙা করবে।’

তাহলে কি এত বেশি অনুকূল পরিস্থিতির পরও আওয়ামী লীগের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে কিছুটা দ্বিধা দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে? ভীতি কিছু রয়ে গেছে সহজ জয় নিয়ে।

মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের আরও একটি বক্তব্য আমাকে কিছুটা বিভ্রান্তিতে ফেলেছে। যাত্রা শুরুর আগে উনি সাংবাদিকদের বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উন্নয়ন বার্তা তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই সফর।’ এই কথাটি আমি ঠিক বুঝতে পারিনি। উন্নয়নের বার্তা পৌছে দেয় কিভাবে? উন্নয়ন তো দৃশ্যমান বিষয়। আমার এলাকায় যদি উন্নয়ন হয়, আমার জীবন মানের যদি ইতিবাচক পরিবর্তন হয়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি গণমানুষের অনুকূলে হয়, তাহলে সেটা কি আমরা দেখতে পাবো না? ঢাকা থেকে এসে কাউকে দেখিয়ে দিতে হবে? আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন মিডিয়াতে আসে। উনার জনসভা কিংবা সাংবাদিক সম্মেলনগুলো টেলিভিশনে লাইভ দেখানো হয়। এর আগে অপর কোনো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য টেলিভিশনে এতবেশি লাইভ দেখানো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। সেই হিসাবে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন বার্তা তৃণমূলে পৌঁছে দেয়ার উনি নিজেই তো যথেষ্ট। অন্য কাউকে, বিশেষ করে অতিকথনের জন্য যিনি এরই মধ্যে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন, কেন ব্যস্ততা দেখাতে হবে। আর যদি সেই কর্মযজ্ঞ সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরক্তির কারণ হয়, তবে কি পুরো উদ্যোগটাই হিতে বিপরীত হয়ে যাবে না?

বিরক্তির কারণটি এবার একটু বলি। নীলসাগর এক্সপ্রেস সেদিন নির্ধারিত সময়ের পাঁচ ঘন্টা পর, রাত নয়টা ছাপ্পান্ন মিনিটে নীলফামারীতে পৌঁছেছিল। এই পথ যেতে নীলসাগরের জন্য যে কয়টি স্টেশন যাত্রাবিরিতির জন্য নির্ধারিত ছিল, তার চেয়ে বেশি জায়গায় থামতে হয়েছে। থেমে নেতারা সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তৃতা করেছেন। ১২টি জায়গায় রীতিমত পথসভা হয়েছে। পথসভা যতক্ষণ চলেছে, ততক্ষণ ট্রেনটিকে বাকি যাত্রীদের নিয়ে স্টেশনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। আবার প্রতিটি পথসভা থেকেই অতিউৎসাহী নেতাকর্মীরা ট্রেনে উঠে পড়ে, পুরো ট্রেনজুড়ে তৈরি করেছে এক দুর্বিসহ উপচে পড়া ভিড়। এভাবে পরে যারা উঠেছেন ট্রেনে, তাদের উপর কারও নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে মনে হয় না। আসলে এটা সম্ভবও নয়।

এই নিয়ন্ত্রণহীন আরোহণ, ঢাকা থেকে যাওয়া নিয়মিত যাত্রীদের দুর্ভোগ বা কষ্টের যে কারণ হয়েছে, সেটা নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়ে না। আর সেই সঙ্গে অতিরিক্ত পাঁচ ঘন্টার অনির্ধারিত যাত্রা বিরতির যে ভোগান্তি, তার দায়ই বা কে নেবে?
নিতে পারতেন, খোদ ওবায়দুল কাদের। তিনি কেবল মন্ত্রীই নন, সেই সঙ্গে সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। আগেই বলেছি, এই দেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, তিনি চাইলেও আবেগপ্রবণ কর্মী সমর্থকদের হয়তো নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। কিন্তু যেটা পারতেন, সেটা হলো দুর্ভোগে পড়া যাত্রীদের কাছে বিনয় প্রদর্শন করা, তাদের এই সমস্যায় ফেলার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। উনি যদি বলতেন, ‘আমাদের এই রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে আপনারা যারা দুর্ভোগে পড়েছেন, কিছুটা দেরিতে গন্তব্যে পৌছেছেন, তাদের কাছে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী,’ তাহলে সেটা হতো প্রত্যাশিত সৌজন্যবোধ। যাত্রীরা কিছুটা হলেও নিজেদের দুঃখ ভুলতেন, আওয়ামী লীগের ইমেজ বাড়তো। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, মানুষ সেটা পছন্দ করতো। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। তিনি যখন করেননি, অন্য কেউই তাই সেই লাইনে যায়নি।

বরং উল্টো নেতার অহমিকাই দেখতে হয়েছে জনগণকে। একদিন পর সাংবাদিকরা যখন যাত্রীদের এই ভোগান্তির কথাটি তুলেছে, জবাবে ওবায়দুল কাদের কী বললেন? তিনি বললেন সেই মোক্ষম কথাটি, যেটি এই লেখার শুরুতে বলা হয়েছিল। ‘যাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিয়েছে!’ এই তথ্যটি কি ওই ট্রেনের সেদিনের যাত্রীদের বাদ দিন, দেশের সচেতন কোন একজন মানুষও বিশ্বাস করেছে? আর যে লোক এই ধরনের অবিশ্বাস্য কথা বলেন অবলীলায়, তিনি যখন প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের কথা প্রচার করতে গ্রামে গঞ্জে সাধারণ মানুষের কাছে যান, তখন সরকারেরই বা লাভ কতটুকু হয়?

পাদটিকা:
ট্রেন যাত্রার সময় ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, এই ধরনের নির্বাচনী যাত্রা নাকি অব্যাহত থাকবে। এরপর আসবে লঞ্চ যাত্রা, তারপর বাস যাত্রা। আশা করা যায়, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা তখন আরও বৃদ্ধি পাবে।

মাসুদ কামাল: সিনিয়র নিউজ এডিটর, বাংলাভিশন টিভি