ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কতটুকু কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলো?

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কতটুকু কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলো?

আহমেদ শরীফ ১:৩১ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৮

ভারত যুক্তরাষ্ট্রের কতটুকু কাছাকাছি পৌঁছাতে পারলো?

বহু প্রতীক্ষার পর গত ৬ই সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী দিল্লীতে অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো ‘২+২ ডায়ালগ’, যার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীরা বৈঠক করেন এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই বৈঠক বহুল প্রতীক্ষিত ছিল দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত ‘কমিউনিকেন্স কম্প্যাটিবিলিটি এন্ড সিকিউরিটি এগ্রিমেন্ট’ (সিওএমসিএএসএ) বা ‘কমকাসা’ চুক্তির কারণে। এই চুক্তি নিয়ে বহুদিন ধরেই উভয় দেশের পররাষ্ট্র এবং প্রতিরক্ষা দপ্তরের মাঝে কথাবার্তা চলছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিস যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সিথারামান ভারতের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের মাঝে সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হতে যাচ্ছে।

‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্স’-এ এক লেখায় ভারত, পাকিস্তান এবং দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো আলিসা আয়ার্স বলেন যে, বাণিজ্য এবং রুশ-ভারত সামরিক সম্পর্কের ব্যাপারে উভয় দেশের মাঝে টানাপোড়েন থাকলেও এই চুক্তি মার্কিন-ভারত নিরাপত্তা সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই চুক্তির ফলে ভারত এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ প্রযুক্তি ক্রয় করতে পারবে, যা কিনা চীনের সামরিক শক্তিকে ব্যালান্স করার জন্যে ভারতের কাজে আসবে। ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছে এই যোগাযোগ প্রযুক্তি থাকার কারণে দুই দেশের মাঝে সরাসরি সংবেদনশীল সামরিক তথ্য আদানপ্রদান সম্ভব হবে।

ভারতের বেশিরভাগ অস্ত্র এখনও রাশিয়ায় তৈরি। ‘স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইন্সটিটিউট’এর হিসেবে ২০০৮ থেকে ২০১৭ সালের মাঝে ভারত যত অস্ত্র কিনেছে, তার প্রায় ৭০ শতাংশ এসেছে রাশিয়া থেকে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে ১০ শতাংশেরও কম অস্ত্র। রুশ অস্ত্রগুলি যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সাথে একত্রে কাজ করতে সক্ষম নয় যোগাযোগ প্রযুক্তি আলাদা হবার কারণে। যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র কৌশলগতভাবে তাদের খুব কাছের দেশগুলির সাথেই এই যোগাযোগ প্রযুক্তি আদানপ্রদান করে। এই প্রযুক্তি ‘লিঙ্ক-১৬’ নামের এক যোগাযোগ পদ্ধতি বা ডাটালিঙ্কের মাধ্যমে কাজ করে থাকে। ‘টাইম ডিভিশন মাল্টিপল একসেস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ৯১৫ থেকে ১,২১৫ মেগাহার্টজের ফ্রিকুয়েন্সির মাঝে ৫১টা ব্যান্ডে এই ডাটালিঙ্ক কাজ করে থাকে। বিশ্বব্যাপী এই ফ্রিকুয়েন্সিতে অন্য কোনো ধরনের যোগাযোগ না রাখার ব্যবস্থা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমিতে থাকা সেনারা সরাসরি আকাশে থাকা যুদ্ধবিমানের সাথে যোগাযোগ করতে পারে এবং বোমা হামলা করার জন্যে টার্গেট দিতে পারে। এই যোগাযোগ অতি-সংবেদনশীল এবং এই নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অতি মূল্যবান।

যুক্তরাষ্ট্র এতদিনে ভারতের কাছে বেশকিছু অত্যাধুনিক বিমান এবং সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে, যেমন – ‘সি-১৩০জে সুপার হার্কিউলিস’ ও ‘সি-১৭ গ্লোবমাস্টার ৩’ পরিবহণ বিমান, ‘পি-৮আই পসাইডন’ এন্টি-সাবমেরিন বিমান, ‘এএইচ-৬৪ই এপাচি’ এটাক হেলিকপ্টার, ইত্যাদি। ‘সী-গার্ডিয়ান’ ড্রোন এবং ‘এম-৭৭৭’ অতি-হাল্কা আর্টিলারিও যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সরবরাহ করছে। এই সরঞ্জামগুলির সাথে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর কমান্ডের যোগাযোগের নিমিত্তে সেগুলিতে বাণিজ্যিকভাবে কেনা যোগাযোগ যন্ত্র বসানো হয়েছে। ‘লিঙ্ক-১৬’ প্রযুক্তি এগুলির সাথে যুক্ত করা হলে ভারতীয়দের হাতে এসব সরঞ্জামগুলি শুধু ভারতীয় কমান্ডের সাথেই যোগাযোগ করতে সক্ষম হবে না, মার্কিন কমান্ডের সাথেও সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে।

২০১৬ সালে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এরও একটা গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করে। ‘লজিস্টিকস এক্সচেঞ্জ মেমোর্যাোন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট’ (এলইএমওএ) বা ‘লেমোয়া’ চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশ একে অপরের সামরিক স্থাপনা ব্যবহার করার অনুমতি পায়। অন্যকথায়, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ভারতীয় সামরিক বিমান ঘাঁটি এবং নৌঘাঁটিগুলি ব্যবহার করতে পারবে। ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’এর এক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে যে, ‘কমকাসা’ চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে দিল্লীতে অনেকেই অস্বস্তিতে ভুগছেন একারণে যে, এই চুক্তি স্বাক্ষরের ফলে ভারতের পক্ষে তাদের যুদ্ধবিমান বা যুদ্ধজাহাজের অবস্থান মার্কিনীদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

এই চুক্তি স্বাক্ষর অনেকদিন ঝুলে থাকার গুরুত্বও কম নয়। ভূ-রাজনৈতিক গবেষণা সংস্থা ‘স্ট্রাটফর’-এ এক লেখায় বলা হচ্ছে যে, ভারত সর্বদাই চাইছে কৌশলগত ব্যাপারে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখতে। কিন্তু ভারত মহাসাগর এবং হিমালয় অঞ্চলে চীনের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে ভারতের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে হেলে যাওয়া ছাড়া কোন উপায়ও থাকছে না। আর পরপর কয়েকটা অতি-গুরুত্বপূর্ণ সামরিক চুক্তির মাধ্যমে ভারতকে তার কৌশলগত চিন্তা থেকে এতটাই সরে আসতে হয়েছে যে, তাতে সামনের দিনগুলিতে ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতেই আমূল পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে।

অন্যদিকে ভারতকে নিজের বলয়ে আরও শক্তভাবে নিয়ে আসতে যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করে যাবে। এক্ষেত্রে ইরানের কাছ থেকে তেল ক্রয়ের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কিছুটা ছাড় দিতে পারে। কারণ ইরানের সহায়তা ছাড়া ভারতের পক্ষে স্থলবেষ্টিত আফগানিস্তানে মার্কিন-সমর্থিত সরকারকে সহায়তা দেয়া সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি যাবার ফলে ভারত একইসাথে রাশিয়া, ইসরাইল এবং ফ্রান্সকেও প্রযুক্তির ব্যাপারে ছাড় দিতে অনুরোধ করবে, যাতে ভারত তার সামরিক শিল্পকে উন্নত করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে পারে, যা কিনা মোদি সরকারের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নীতির অংশ।

আলিসা আয়ার্স মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র কেনার জন্যে ভারতের উপরে কোনো নিষেধাজ্ঞা দেবেন কিনা সেটা এখনও পরিষ্কার নয়। হঠাত করেই ভারতের পক্ষে সকল রুশ অস্ত্র যেহেতু বর্জন করাও সম্ভব নয়, তাই রাশিয়াকে টার্গেট করে মার্কিন কংগ্রেসে পাস করা আইন ‘কাউন্টারিং আমেরিকাস এডভার্সারিস থ্রু স্যাংশনস এক্ট’ (সিএএটিএসএ) বা ‘কাটসা’ ট্রাম্পের হাতে ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখার একটা হাতিয়ার হিসেবে থাকবে। ‘স্ট্রাটফর’ বলছে যে, ভারত যুক্তরাষ্ট্রের আরও কাছাকাছি এলেও তাদের সম্পর্ক সমস্যা-বিবর্জিত হবে না।

লেখক: ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক