জন্মদিন দীর্ঘজীবী হোক

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

জন্মদিন দীর্ঘজীবী হোক

মাসুদ কামাল হিন্দোল ১১:০০ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৮

জন্মদিন দীর্ঘজীবী হোক

জন্মের চেয়ে জন্মদিনের গুরুত্ব বেশি কিনা সে বিতর্কে যাচ্ছি না। তবে জন্মদিন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে জন্মদিন পালনের রেওয়াজ তেমন একটা ছিল না।

আগে জাতীয় পর্যায়ে রবীন্দ্র-নজরুল জন্মবার্ষিকীতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যক্তি পর্যায়ে খুব স্বল্পসংখ্যক মানুষ জন্মদিন পালন করতেন। সমাজে উচ্চবিত্ত বলে পরিচিতরাই কেক কেটে জন্মদিন উৎসব করতেন। মধ্যবিত্তের একটি ক্ষুদ্র অংশ জন্মদিনে দোয়া (মিলাদ) ও ভালো-মন্দ খাওয়ার আয়োজন করত। কিন্তু হাল আমলে দেশে জন্মদিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আম জনতার কছে। নানা ধরনের জন্মদিন উৎসব পালনের খবর পাওয়া যায়। 

ক্লাস বন্ধ রেখে নিজ নির্বাচনী এলাকার অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষককে হাজির করে নিজের ৭৭তম জন্মদিনের অনুষ্ঠান করেছেন রাজধানী ঢাকার এক সংসদ সদস্য। অভিযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের উপস্থিত থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। জন্মদিন পালনে পিছিয়ে নেই সাংবাদিকরা। তারাও এখন ঘটা করে পাঁচ তারকা হোটেলে জন্মদিনের আয়োজন করেন। ৫০তম জন্মদিন পালনের গুরুত্বপূর্ণ খবর ৫০ পাউন্ডের কেক কাটা ও অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ কারা কারা এসেছিলেন সে সংবাদও গুরুত্ব পায় সংবাদ মাধ্যমে। জন্মদিন সার্টিফিকেটের তারিখে হলো নাকি অরিজিন্যাল ডেটে হলো সেটা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই। উৎসবটা হলো কিনা এবং উৎসবের খবরটা প্রচার পেল কিনা সেটাই বড় কথা।

সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের জন্মদিন। বিভিন্ন চ্যানেলের জন্মদিনে সাজসাজ রব পড়ে যায় দেশব্যাপী। জেলার কর্তাব্যক্তিরা র‌্যালির নেতৃত্ব দেন জেলায় জেলায়। নিজ চ্যানেলে লিড নিউজ হয় আজ  আমাদের জন্মদিন। রচিত হয় জন্মদিনের গান কবিতা। মেগা সাইজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাইজের কেক আসতে থাকে। বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক উৎসবকেও ছাড়িয়ে গেছে চ্যানেলের জন্মদিন। লাইভ অনুষ্ঠানে দেখা যায় রাষ্ট্রের সরকারি-বেসরকারি কর্তাব্যক্তিদের উজ্জ্বল দৃষ্টিনন্দন ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। রংবেরঙের পোশাক আর নাকে মুখে কেক খাওয়ার অভূতপূর্ব দৃশ্য। তাদের ভাবভঙ্গি আচরণ দেখে বোঝা যায় না অনুষ্ঠানে এসে তারা ধন্য, নাকি তাদের পেয়ে চ্যানেল ধন্য(?)

আর এসব তুঘলকি কারবার আর ঝলমলে অনুষ্ঠান দেখে আমাদের পাড়ার অনুকরণ প্রিয় বাবু ভাই ৩৫ প্লাস বয়সেও তার জন্মদিন ঘটা করে পালনের বজ্র কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এ মহৎ আনন্দ উৎসব থেকে কেউ তাকে থামাতে বা ফেরাতে পারবে না। তিনি এক কথার মানুষ। মুখে এক অন্তরে আরেক এমন না। জন্মদিন উৎসব হবেই হবে। বাবু ভাই ঘোষণা দিয়েছেন তার আসন্ন জন্মদিনে উপস্থিত থাকবেন দেশের বিশিষ্ট সুরকার, গীতিকার, মডেল, অভিনেতা-অভিনেত্রী ও সাংবাদিক ভাইরা। 

মানুষের বিভিন্ন ধরনের হবি বা শখ থাকে। বাবু ভাইয়ের শখ হলো বিশিষ্ট বিখ্যাত ব্যক্তিদের আশপাশে থাকা। বাবু ভাই সুযোগ পেলেই তারকাদের(?) সঙ্গে সখ্য-হৃদ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তাদের সঙ্গে ছবি তোলা, কোনো অনুষ্ঠান উদ্বোধনের সময় তারকাদের পেছনে দাঁড়ানো। টিভি ক্যামেরা দেখলে সেখানে আনাগোনা করা। সব শিল্পীকেই নিজের প্রিয় শিল্পী বলে সম্বোধন করা। 

মাঝে মাঝে সংবাদপত্রে বাবু ভাইয়ের ছবি ছাপা হয়। টিভিতেও তাকে দেখা যায়। অবশ্য শিল্পীদের পেছনে। সংবাদকর্মীদের কাছেও এখন তিনি পরিচিত মুখ। উপযাক্তক হয়ে তারকাদের উপকার করা। লাইভ টিভি শোতে তারকাদের ঘন ঘন ফোন করা। ফোন করেই আপনাকে খুব সুন্দর লাগছে জাতীয় কথাবার্তা বলা। দু’একবার লাইভ অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হয়েছেন ভাগ্যবান বিশেষ দর্শক হিসেবে। তার বিগত জন্মদিনে তারকা সমাবেশ ঘটিয়ে তিনি বন্ধু আত্মীয় ও পাড়া-মহল্লায় তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। পাড়ায় এখন বাবু ভাইয়ের একটা ইমেজ তৈরি হয়েছে। অনেক সমীহ করে চলে। বাবু ভাইয়ের এক এক করে বয়স বাড়ছে আর প্রতিবছরই তিনি জন্মদিনে নতুন চমক দেখিয়ে যাচ্ছেন। তার চমকে সবাই চমকিত। এবার তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তার জন্মদিনে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে অতিথি হিসেবে আনবেন। কিন্তু এ ঘোষণা শোনার পর পাড়ার সবাই আর বাবু ভাইকে স্বাভাবিক ভাবে না। 

ভাবে, তার মতিভ্রম ঘটেছে। তার কথা উঠলেই আড়ালে-আবডালে মুখ টিপে হাসে। শেষ মুহূর্তে বাবু ভাই জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আর প্রায় শতাধিক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনে সময় দিতে ব্যস্ত। তাই তার অতিথির তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতিকে সাময়িকভাবে বিরত রাখছেন। তবে তার জন্মদিনে কয়েকজন হাফ ও ফুল মন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। কিন্তু তার কথা কেউ আমলে নিচ্ছে না।

যুক্তি হিসেবে বাবু ভাই দেখিয়েছেন ডজন ডজন মন্ত্রী-মিনিস্টাররা যদি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে টিভি চ্যানেলের জন্মদিনে যেতে পারেন। মন্ত্রী যদি যাত্রী ছাউনি উদ্বোধন করতে যেতে পারেন পাড়া-মহল্লায়। তাহলে তার জন্মদিনে মন্ত্রী মহোদয়রা আসবেন না কেন? আলবাত আসবেন। আসতেই হবে তাদের। আজ সন্ধ্যায় বাবু ভাইয়ের শুভ জন্মদিন। কততম জন্মদিন তা অবশ্য জানা যায়নি। ছোট-খাটো একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জন্মদিন আয়োজনের। বিকাল থেকে সম্মানিত আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। সবার মাঝে চাপা উত্তেজনা। কখন তিনি আসবেন। সত্যিই কি তিনি আসবেন? মেগা সাইজের চকলেট কেকের সামনে নাদুস-নুদুস একাধিক রংবেরঙের মোমবাতি জ্বলছে। হঠাৎ লোডশেডিং। অন্ধকারের মধ্যেও বাবু ভাইয়ের চকচকে মুখাবয়ব কলপ দেওয়া চুল দৃশ্যমান। পুরো এলাকা অন্ধকারে নিমজ্জিত। সবার মাঝে উৎকণ্ঠা কখন তিনি আসবেন। তিনি আসবেন তো?
সন্দেহ বিরক্তি কার কার মাঝে। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে লালবাতি জ্বালিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন বাবু ভাইয়ের জন্মদিন উৎসবে। ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে এলো। চারদিক সরব হয়ে উঠল দিনের ঝলমলে আলোর মতো। সবাই ভিআইপির সঙ্গে সেলফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। ততক্ষণে এলাকাবাসী বুঝে গেছেন বাবু ভাইয়ের হ্যাডম কত। স্থানীয় নেতাদের স্লোগান শুরু হয়ে গেল নেতা তোমার ভয় নাই রাজপথ ছাড়ি নাই...।

মাসুদ কামাল হিন্দোল : সাংবাদিক ও রম্যলেখক
ই-মেইল : hindol_khan@yahoo.com