বঙ্গবন্ধুর দয়া ক্ষমা ও দানশীলতা

ঢাকা, বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

বঙ্গবন্ধুর দয়া ক্ষমা ও দানশীলতা

শেখ শাফিনুল হক ৯:২৯ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১৮, ২০১৮

বঙ্গবন্ধুর দয়া ক্ষমা ও দানশীলতা

‘বাঙালি কি বাঙালি হয় শাড়ি, ধুতি, লুঙ্গি ছাড়া?
থাকে না তার বর্গ কিছুই না থাকলে টুঙ্গিপাড়া।

সুর অসুরে হয় ইতিহাস, নেই কিছু এ দু’জীব ছাড়া
বাংলাদেশের ইতিহাসে দেবতা নেই মুজিব ছাড়া।’

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, মহাবিদ্রোহের মহানায়ক, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যার হাত ধরে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ব মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’-নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। 

আমরণ যিনি দেশ ও দশের জন্য সংগ্রাম করে গেছেন, বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করে গেছেন, কারাবরণ করেছেন, অনশন করেছেন এবং নিজস্ব উন্নয়ন দর্শন অনুযায়ী, একটি সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়ায় স্বার্থান্ধ ঘাতক গোষ্ঠীর হাতে যাকে প্রাণ দিতে হয়েছে, তিনিই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। টুঙ্গিপাড়ার খোকা, দুরন্ত মুজিব, আমাদের মুক্তির দূত, আমাদের স্বপ্নদ্রষ্টা, আমাদের পিতা-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ মুজিবুর রহমানের শৈশব কাটে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। তিনি মধুমতী নদীর তীরে আবহমান গ্রাম-বাংলাকে দেখেছেন। বাংলার মানুষকে দেখেছেন। মহাজন-জোদ্দারদের দ্বারা প্রজাপীড়ন দেখেছেন। বাংলার জলে-স্থলে কাদায় মিশে মানুষ হয়েছেন। শৈশব থেকেই গ্রাম-বাংলার দরিদ্র, কৃষক, শ্রমিক ও মজুর তথা মেহনতি মানুষ ছিল তাঁর মূল আকর্ষণ। 
শেখ মুজিবুর রহমানের গৃহশিক্ষক ছিলেন হামিদ মাস্টার। যিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ও কারাবন্দি ছিলেন। শেখ মুজিব তার গৃহশিক্ষকের মুখে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের কথা, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামের ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার অধিকারে নেওয়ার কথা শুনে ভীষণ অনুপ্রাণিত হন। 

তৎসময়ে মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ও ক্ষুদিরাম বসুদের ত্যাগ-সাহসিকতা তরুণদের মাঝে মন্ত্রের চেয়েও বেশি কাজ করত। রাজনীতির প্রতি তীব্র আকর্ষণ ও ঝোঁক থাকার ফলে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনেরও হাতেখড়ি ঘটে তাঁর গৃহশিক্ষক হামিদ মাস্টারের হাতে। 
তার গৃহশিক্ষক হামিদ মাস্টার তৎকালে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন এবং যার মাধ্যমে তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধান-চাল সংগ্রহ করে ধর্মগোলা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখান থেকে গরিব-দুঃখীদের মাঝে সেসব বিলিয়ে দিতেন। বলা যায়, গরিব-দুঃখীদের দুঃখ-দুর্দশা বুঝতে ও তাদের সাহায্য করার শিক্ষা বা মানসিকতা শেখ মুজিবের শৈশবেই গড়ে উঠেছিল। স্কুলের বন্ধুর ছাতা নেই বলে তাকে নিজের ছাতা দিয়ে দেওয়া, নিজের জামা ও বই পর্যন্ত দেওয়ার বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে শেখ মুজিবের।

এটাই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিজীবনের অন্যতম চারিত্রিক গুণাবলি। এ কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, একজন বিশ্ববরেণ্য জননন্দিত নেতার ব্যক্তি চরিত্রে যেসব মানবিক গুণাবলি থাকার কথা তার সবকিছু নিয়েই যেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ জন্যই আরব্য সাহিত্যের কবি আব্দুল হাফিজ লিখেছেন, ‘আমি তার মধ্যে তিনটি মহৎ গুণ পেয়েছি, সেগুলো হলো-দয়া, ক্ষমা ও দানশীলতা।’

এ বিশ্ববরেণ্য নেতা ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। প্রচলিত জাতিভেদ প্রথার তোয়াক্কা না করে তিনি সব সময় সামনের বেঞ্চে বসতেন। স্কুলের হেড মাস্টার শ্রী গিরিশ বাবু শেখ মুজিবকে খুব স্নেহ করতেন ও ভালোবাসতেন। 
ইতিহাস ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়। খেলাধুলার ঝোঁক ছিল প্রচণ্ড। ফুটবল ও ভলিবল ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। তিনি ছিলেন ডানপিটে কিন্তু নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী। স্কুলের ছাত্ররা তাকে ‘মুজিব ভাই’ বলে ডাকত। 

স্কুলজীবনেই তাঁর নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে থাকে। ১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক এবং তাঁর বাণিজ্য ও পল্লী উন্নয়নমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ পরিদর্শনে আসেন। কংগ্রেসের বাধা উপেক্ষা করে সাহসিকতার সঙ্গে শেখ মুজিব মন্ত্রীদের সংবর্ধনার পক্ষে কাজ করেন। স্কুল পরিদর্শন করে ফেরার পথে শেখ মুজিব তাদের সামনে দাঁড়ান এবং ছাত্রাবাসের ছাদ নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানান। তিনি ন্যায্যতার ভিত্তিতে দৃঢ়তা ও সাহসিকতার সঙ্গে তাঁর দাবির প্রতি অবিচল থাকলে মন্ত্রীরা বাধ্য হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে স্কুল ফান্ডে ১ হাজার ২০০ টাকা বরাদ্দ দেন। 

বাংলার দুই বর্ষীয়ান ও মহান নেতার সঙ্গে এটাই ছিল শেখ মুজিবের প্রথম সাক্ষাৎ। প্রথম সাক্ষাতেই তাঁরা শেখ মুজিবের প্রতিভার পরিচয় পেয়ে যান। পরবর্তী সময়ে তাদের এই পরিচয় অবশ্য ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়। মন্ত্রীরা চলে যাওয়ার পর কংগ্রেস কর্মীদের অভিযোগে শেখ মুজিব গ্রেপ্তার হন। এবং সাত দিন কারাবাস শেষে মুক্তি পান।

এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম কারাবরণ, যখন তিনি সপ্তম শ্রেণির একজন ছাত্র! জীবনের প্রথম কারাবরণ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমার যেদিন প্রথম জেল হয়, সেদিন থেকেই আমার নাবালকত্ব ঘুচেছে বোধ হয়।’

নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে এক ছাত্রসভায় ছাত্রদের উদ্দেশে বক্তৃতা দেওয়ার সময় শেখ মুজিব দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তার হন এবং সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি পান। গোপালগঞ্জে হোসেন সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের সফর উপলক্ষে এক সভার আয়োজন করা হয় এবং সে সভাকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি হয়। 

সভায় গোলাগুলির মিথ্যা অজুহাতে তৃতীয়বার গ্রেপ্তার হন এবং বঙ্গবন্ধু কয়েকদিন জেল খাটেন। বাংলা ভাষা দাবি দিবসে সচিবালয়ের গেটে পিকেটিং করার সময় পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমানকে চতুর্থবার গ্রেপ্তার করে ১১ মার্চ, ১৯৪৮ সালে। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সম্পাদিত চুক্তির শর্তানুযায়ী, অন্য ছাত্রনেতার সঙ্গে ১৫ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া হয়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের দাবিতে উপাচার্যের বাড়ি ঘেরাও করার জন্য বঙ্গবন্ধুকে যষ্ঠবার পুলিশ গ্রেপ্তার করে ১৯ এপ্রিল ১৯৪৯ সালে। এই আন্দোলন করার জন্য ১৫ টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো জরিমানা ও মুচলেকা দিতে রাজি হননি। কারাবন্দি থাকাকালে ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়, শেখ মুজিব যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২৭ জুলাই তিনি মুক্তি লাভ করেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ, ১৯৭১ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। স্বাধীনতার ঘোষণার অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি শেষবারের মতো গ্রেপ্তার হন। তাকে পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে প্রেরণ করা হয়। ৮ জানুয়ারি, ১৯৭২ সালে মুক্তি পেয়ে লন্ডন দিল্লি হয়ে ১০ জানুয়ারি, ১৯৭২ স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কর্মময় জীবনে সর্বমোট ১৭ বার কারাবরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনের পরিণতি ও পারিবারিক জীবনের তার প্রভাব তিনি তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বর্ণনা করেন এভাবে-

‘একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’ ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু’ আপা, ‘হাচু’ আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু ‘আব্বা’ বলি।’ আমি আর রেণু দুজনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে গিয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ 

কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেকদিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনাবিচারে বন্দি করে রাখা আর তাঁর আত্মীয়স্বজন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চরিত্র ও কৃতিত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি এমনই এক ব্যক্তিত্ব যিনি ত্যাগের মহিমা ও দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ, গৌরবে গৌরবান্বিত। তিনি বাঙালির প্রাণের প্রদীপ, বিদ্রোহের অগ্নিশিখা। যিনি বাংলা ও বাঙালির মুক্তির জন্য দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। 

আগস্টের মাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ও তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

শেখ শাফিনুল হক : তৃতীয় সচিব, বাংলাদেশ হাইকমিশন কলকাতা
ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ভাতিজা