গুজব বনাম মুক্তচিন্তা

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫

গুজব বনাম মুক্তচিন্তা

জেসমিন চৌধুরী ১১:৪৫ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ১০, ২০১৮

print
গুজব বনাম মুক্তচিন্তা

প্রেক্ষাপট
নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশ বিভ্রান্তির কালো মেঘে ছেয়ে গেছে, জনজীবন বিপর্যস্ত, চির-বিঘ্নিত নিরাপত্তা আরও বেশি বিঘ্নিত। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হওয়া বাচ্চাদের শান্তিপূর্ণ এবং অভূতপূর্ব আন্দোলনটি চোখের পলকে একটা ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়ে তোলপাড় করে দিয়েছে দেশটাকে, বিভক্ত করে দিয়েছে দেশের মানুষকে।

নির্লিপ্ত সুশীলরা এখনো নির্লিপ্ত, দলকানারা নিজের দলের সাফাই গেয়েই চলেছেন, ছাগুরা আন্দোলনের আগুনে আলু পোড়াতে ব্যস্ত, সাধারণ মানুষ জানে না তারা কোনদিকে যাবে।

সতীর্থদের অকাল মৃত্যুর প্রতিবাদে স্কুল-কলেজের বাচ্চারা পথে নেমে এসেছে, চালকদের লাইসেন্স চেক করছে, লাইসেন্স/রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়িতে বড় বড় করে ‘লাইসেন্স নাই’ অথবা ‘চোরাই গাড়ি’ লিখে দিচ্ছে। পুলিশ, আমলা, রাজনীতিবিদ, হোমরা-চোমড়া কাউকেই ছাড় দিচ্ছে না। ট্রাফিকের গতি নিয়ন্ত্রণ করছে তারা, সুন্দর করে সারি বেঁধে চলছে রিকশা, বেবিট্যাক্সি, প্রাইভেটকার। পুলিশের লাঠিচার্জের মুখেও পিছিয়ে পড়ছে না বাচ্চারা। গর্বে আমাদের বুক ফুলে উঠেছে, আমরা স্বপ্ন দেখছি-এই শিশুরাই বড় হয়ে আমাদের একটা সুন্দর দেশ উপহার দেবে।

ঠিক তখনোই আন্দোলনটা হাইজ্যাক হয়ে গেল ইউনিফর্ম পরিহিত নকল ছাত্রদের দ্বারা। বাচ্চারা একদিকে মার খাচ্ছে পুলিশের হাতে, একদিকে ইউনিফর্মের আড়ালে লুকানো ছাগুদের হাতে, অন্যদিকে ছাত্রলীগ এবং যুবলীগের গুন্ডাদের হাতে। তারপরই শুরু হলো ধরপাকড়। না গুন্ডাদের নয়, ধরপাকড় শুরু হলো গুজব ছড়ানোর অপরাধে লেখক এবং মুক্তমনাদের।

আমার এক বন্ধু যে নিতান্তই নিরীহ একজন মানুষ, রাত জেগে ফুটপাতের অভুক্ত ভিক্ষুকদের মধ্যে বিয়েবাড়ির বেঁচে যাওয়া খাবার বিলোয়, যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানববন্ধনে হাত ধরে দাঁড়ায়, সামাজিক অসংগতির বিরুদ্ধে লেখালেখি করে, তাকে এই আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্য ধরে নিয়ে গেল ডিবি পুলিশ। আটকে রাখার মতো যথেষ্ট কারণ না পেয়ে চব্বিশ ঘণ্টা পর ছেড়েও দিল। তারা যে শুরুতেই এই মানুষটাকে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট কারণ পেয়েছিল সেটাই অবাক হওয়ার মতো বিষয়।

সন্দেহভাজন যে কাউকে গ্রেপ্তার করার অধিকার নাকি পুলিশের আছে। ভালো কথা, সে ক্ষেত্রে এই কদিনে হামলাকারীদের কেন ধরে ধরে জেলে পোরা হলো না? এতদিনে তো জেলহাজত উপচেপড়ার কথা ছিল কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশি তৎপরতার অভাব দেশের সাধারণ মানুষকে ব্যথিত করেছে।

গুজব নামের গজব

এই গেল ব্যাকগ্রাউন্ড, এখন মূল বক্তব্যে আসি। এই আন্দোলনের সুবাদে যে শব্দটি এ বছরের সর্বাধিক ব্যবহৃত শব্দ হিসেবে গিনেস বুকে উঠবার মর্যাদা অর্জন করে বসেছে সেটা হলো ‘গুজব’। এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রচুর গুজব ছড়িয়েছে। যেসব দলকানারা গুজবের কারণে দেশের ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে বলে মাথা চাপড়েছেন তারা নিজেরাও গুজবনামক গজবের দোহাই দিয়ে দলের স্বার্থে সত্যকে ঢাকতে চেয়েছেন, নিজেদের মিথ্যাকে সত্য বানিয়ে আন্দোলনের আগুনে আলু পোড়াতে ব্যস্ত হয়েছেন। আসলে উনারা গুজবের মার্কেট মনোপলি চান, বাজারে থাকবে শুধু উনাদের স্পেশাল ব্র্যান্ডের গুজব। অন্যসব গুজব দূষণীয়। আমার দৃষ্টিতে সত্য গোপনের চেষ্টার চেয়ে দূষণীয় আর কিছুই হতে পারে না।

গুজব, যাকে ইংরেজিতে রিউমার বলা হয়, সবখানেই ঘটে। পশ্চিমা দেশগুলোতে গুজব একটা আমোদের বিষয়, বিনোদনের উপলক্ষ। বিলেতে শুধু তারকাদের নয়, বরং রাজপরিবার নিয়েও গুজব ছড়ানো হয়। ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলোর কাজই হচ্ছে গুজব ছাপানো। পয়সা দিয়ে এসব কেনে লোকে পড়ে, মজা পায়, কিন্তু হন্তদন্ত হয়ে কান পুনরুদ্ধারে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে চিলের পেছনে ছোটে না পুরো জাতি।

অথচ গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে কী ঘটতে দেখলাম আমরা? মুহুর্মুহু ইনবক্সে আসছে নানান রকম ছবি, ভিডিও। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত লাশের রক্তাক্ত ছবিকে আন্দোলনে নিহত ছাত্রী বলে দাবি করা হচ্ছে, পাঁচ বছর আগের অডিও-ভিডিও ক্লিপকে ছবিকে বর্তমানের বলে দাবি করা হচ্ছে। আন্দোলনরত শিশুদের জন্য উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষরা সহজেই এসব গুজবের ফাঁদে পা দিয়েছেন, সেগুলোকে আরও বেশি ছড়িয়ে দিয়েছেন। এর ফলে সরকারি দল কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জানি না, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাচ্চাগুলো, তাদের আন্দোলন, তাদের ন্যায্য দাবির বাস্তবায়ন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশ, দেশের মানুষ।

কেন আমরা এতটা গুজবপ্রিয়?

একথা সত্যি যে, দেশের বেশিরভাগ মানুষই কমবেশি গুজবে কান দিয়েছেন, কিন্তু তাদের মধ্যে খুব কম লোকেরই উদ্দেশ্য ছিল মিথ্যাচারিতা। সত্যে উপনীত হওয়ার চেষ্টা থেকেই তারা গুজবের আশ্রয় নিয়েছেন। এর সুযোগ নিয়েছে ছাগুরা এবং ক্ষমতালোভী রাজনীতিবিদরা। যে দেশে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে, যে দেশে কেউ মুখ খুলতে গেলেই তার মুখে কুকুরের মতো মাউথগার্ড পরিয়ে দেওয়া হয়, সেই দেশে গুজব রটবে ফাটবে ফাটাবে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? আকাশ কুয়াশাচ্ছন্ন থাকলে মানুষ অনুমানের আশ্রয় নেবেই, তার ওপর যদি সেই অনুমানকে উসকে দিতে উপস্থিত হয় নানান রকম স্থির-অস্থির অডিও-ভিডিও, মানুষ তখন কী করবে? তা ছাড়া যদি সরকারের ওপর মানুষের আস্থা থাকলে গুজবগুলো এতটা সফল হতো বলে আমার মনে হয় না।

আমার একজন বন্ধু এই পরিস্থিতির একটা সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন-‘গুজব হলো ব্ল্যাক মার্কেট, যখন হোয়াইট মার্কেট কাজ করে না তখনোই এই মার্কেট সক্রিয় হয়। সাত দিন ধরে যখন ছাত্ররা মন্ত্রী/বিচারক/নির্বাচন কমিশনের লাইসেন্সবিহীন গাড়ি আটকে দিচ্ছিল, তখন ‘হোয়াইট মার্কেট’-এর উচিত ছিল সঠিক খবর সততার সঙ্গে পরিবেশন করে জনগণকে সচেতন রাখা। প্রকৃতপক্ষে সচেতন জনগণ কখনোই গুজবে কান দিত না।’

এ দেশের মানুষ একটা ভয়ভীতির পরিবেশে বেড়ে ওঠে। সন্ত্রাসীদের ভয় পেতে হয়, বিরোধী দলকে ভয় পেতে হয়, মোল্লাদের ভয় পেতে হয়, সরকারকে ভয় পেতে হয়। ভয় থেকেই গুজব জন্ম নেয়, ভীতু মানুষরাই গুজবে বিশ্বাস করে। সেদিন যখন রটে গেল কয়েকটা বাচ্চা খুন হয়েছে এবং কয়েকটা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে আমি নিজেও ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমি জানি আমার দেশে এটা ঘটতেই পারে। ঘটনাটা মিথ্যা হতেই পারে, কিন্তু যদি সত্য হয়, যদি অন্য বাচ্চারা বিপদে থাকে? আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না। যদি জানতাম আমার দেশের পুলিশ বাচ্চাদের পাশে এসে দাঁড়াবেই তবে আমি এতটা উতলা হতাম না। আমি দেখেছি কী নির্দয়ভাবে পুলিশ পিটিয়েছে বাচ্চাদের কদিন আগেও। কার ওপর ভরসা করে স্থির থাকব আমরা বলতে পারেন?

মুক্তচিন্তার অভাব

আমাদের দেশের মানুষ মুক্তমনে, ঠাণ্ডা মাথায়, স্বচ্ছ বুদ্ধি দিয়ে কোনো কিছুকে বিচার- বিশ্লেষণ করতে শেখেনি এখনো। এই অপরাধ কার? বিলেতের স্কুলে দেখেছি একেবারে ছোট ক্লাস থেকে ‘রিজনিং’ নামে একটা বিষয় পড়ানো হয়, যেখানে বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করতে শেখে বাচ্চারা। আমাদের পাঠক্রমে তো এসবের বালাই নেইই, বরং যারা নিজে থেকে এই ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেন তাদের প্রতি পদে পদে বিপদে পড়তে হয়। চোখ- কান বুঁজে সবকিছু মেনে নিতে হয় এ দেশে। নিজের যুক্তিপ্রসূত চিন্তাভাবনা রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে গেলে গ্রেপ্তার হতে হয়, ধর্মের বিরুদ্ধে গেলে কোপ খেয়ে মরতে হয়। তখন ঘাতকদের গ্রেপ্তার না করে সরকারি প্রতিনিধিরা বলেন ‘অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করবেন না’।

যে দেশে চিন্তা থেকে অনুভূতির প্রাধান্য বেশি সে দেশের মানুষ গুজবে কান দেবে না তো কী? ক্ষমতায় কোন দল আছে তাতে কিছু আসে যায় না, সরকারি দল সবসময়ই চায় এক পাল বোকার হদ্দ জনগণ যারা নিজেরা কিছুই ভাববে না। তাদের যা দেখানো হবে দেখবে, যা শোনানো হবে শুনবে, যা বোঝানো হবে বুঝবে। কিন্তু যখন অন্ধ বধির মূক জনগণের বোকামি বুমেরাং হয়ে সরকারের গায়েই এসে পড়ে তখন দোষটা হয়ে যায় জনগণের।

আপনারা যারা কথায় কথায় বিদেশের উদাহরণ টানা অপছন্দ করেন তাদের বলছি, বাংলাদেশের মানুষের কাছ থেকে যখন উন্নত বিশ্বের জনগণের মতো আচরণ আশা করা হয়, তখন তুলনা করতেই হয়। একটা সরকারের পক্ষে অন্য দেশের সরকারকে অনুকরণ করার চেষ্টা যতটা কঠিন, দেশের মানুষের জন্য অন্য দেশের মানুষের মতো আচরণ করা আরও অনেক বেশি কঠিন। মুখে মাউথগার্ড আর মগজে এন্টি-মুক্তচিন্তা ভাইরাস নিয়ে চলতে হয় যে জনগণকে তাদের কাছ থেকে বেশি কিছু আশা না করাই ভালো।

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী লেখক, অনুবাদক।
jcs_chy@yahoo.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত জেসমিন চৌধুরী এর সব লেখা
 
.


আলোচিত সংবাদ