সন্তানকে প্রয়োজন এবং চাহিদার পার্থক্য বোঝান

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

সন্তানকে প্রয়োজন এবং চাহিদার পার্থক্য বোঝান

রিয়াজুল হক ৭:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৮, ২০১৮

সন্তানকে প্রয়োজন এবং চাহিদার পার্থক্য বোঝান

আমরা অনেকেই প্রয়োজন এবং চাহিদা বিষয় দুটি নিয়ে আলাদা করে ভাবি না। প্রয়োজন বলতে আবশ্যক কোনো কিছুকে বোঝায়। কোনো কিছু না হলে যদি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তবে সেটা প্রয়োজন। চাহিদা বলতে কোনো কিছু পাওয়ার ইচ্ছাকে বোঝানো হয়ে থাকে, সেটা প্রয়োজন না হতেও পারে। অর্থাৎ প্রয়োজন সব সময় চাহিদার অন্তর্ভুক্ত কিন্তু চাহিদা সবসময় প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত নয়।

বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, একটি কিংবা দুটি সন্তানের চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই বাবা-মায়ের মাথার ঘাম পায়ে ঝরাতে হচ্ছে। এ জন্য সন্তান যেমন দায়ী, বাবা-মাও তেমন সমানভাবে দায়ী। যখন সন্তান ছোট থাকে, তখন তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জিনিস দিয়ে এমন এক চাহিদা তৈরি করে দিয়েছেন, এখন একটু বড় হওয়ার পর তার বাড়তে থাকা চাহিদা পূরণ করা আপনাদের জন্য সত্যিই অনেক কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

আমাদের মায়েরা এখন শিক্ষিত। তবে সন্তানদের ক্ষেত্রে তারা ভুলগুলো একটু বেশি করে থাকেন। মায়েরা চাকরি করে। হাতে টাকা আছে। সন্তান যদি একবেলা না খেয়ে আইফোন কিনে দেওয়ার জেদ ধরে, মায়েরা কিনে দিচ্ছে। এতে করে কি সন্তানের মঙ্গল হচ্ছে আসলে অমঙ্গল ডেকে আনা হচ্ছে। এরপর মোবাইলের মডেল পরিবর্তনের বায়না ধরবে। আসলে আপনি যদি আপনার সন্তানের প্রয়োজন এবং আপনার সামর্থ্য তাকে বোঝাতে না পারেন, তবে আপনি কোনো কিছু কিনে দিয়ে সন্তানের মন দীর্ঘমেয়াদে জয় করতে পারবেন না। বাবা-মা সন্তানকে ভালোবাসবে এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক বাবা-মায়ের কাছে সন্তান অনেক আরাধ্য। সন্তানের জন্যই বাবা-মা সব ধরনের কষ্ট করে থাকেন। তবে সন্তানের জন্য অহেতুক ব্যয় করা থেকে বিরত হোন। যার কোনো প্রয়োজনই নেই, আপনার সন্তান যদি খুব ছোট বয়সেই সেসব জিনিস পেয়ে যায়, তবে সে বাস্তবতা বিবর্জিত হয়ে বেড়ে উঠবে। এটা তার জন্য কল্যাণকর হবে না।

বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন। টাকা-পয়সার অভাব নেই। সন্তানকে সময় দিতে পারেন না। সময়ের অভাব পূরণ করেন বিভিন্ন রকমের অপ্রয়োজনীয় উপহারসামগ্রী কিনে দেওয়ার মাধ্যমে। প্রতিদিন বাড়িতে আসার সময় বাচ্চার জন্য একই জিনিস কিনে আনছেন। প্রয়োজন নেই, তবু আনছেন। সন্তানেরও নিত্যনতুন বায়না শুরু হচ্ছে। বাবা-মা কিনে দিচ্ছে। মায়েরা চাকরি করলে কোনো কথাই নেই। আর যদি মায়েরা চাকরি না করেন, তবে মায়েরা বাবাদের ফোন করে মনে করিয়ে দিচ্ছেন তাদের সন্তানদের নিত্যনতুন বায়নার কথা। কিন্তু অহেতুক উপহারের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ পায় না। এতে করে আপনি আপনার সন্তানদের লোভী করে গড়ে তুলছেন। এখন অনেকের কাছেই শোনা যায়, সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে ঘরে ঢুকলে, আদরের সন্তান বাবার হাতের দিয়ে তাকিয়ে থাকে। কি এনেছে তা দেখার জন্য।

আপনার সন্তান মাধ্যমিক কিংবা উচ্চমাধ্যমিকে পড়ে। প্রাইভেট পড়তে যাবে। এখন তার বায়না মোটরবাইক কিনে দিতে হবে। এতে করে তার প্রাইভেট পড়তে যেতে সুবিধা হবে। কি সুন্দর আবদার! এই চাহিদা পূরণ করে আপনি আপনার সন্তানকে অহেতুক ভোগবিলাসের পথে ঠেলে দিচ্ছেন। তার যদি যাতায়াতের জন্য কোনো বাহন দরকারই হয়, তবে রিকশা ব্যবহার করুক। আপনার সন্তানের যদি বেশি শখ হয়ে থাকে, তবে সাইকেল কিনে দিতে পারেন। এতে করে শরীরও ভালো থাকে।

সেলিম হোসেন (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত। মাসিক বেতন ১২ হাজার টাকা। এই টাকায় বাসাভাড়াসহ সব খরচ চালাতে হয়। একমাত্র ছেলে কেবল সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। ছেলের অভিযোগ সহপাঠীদের অনেকের মোবাইল আছে কিন্তু তার কোনো মোবাইল নেই। তাকে মোবাইল কিনে দিতে হবে। যে কোনো মোবাইল হলে চলবে না, স্মার্টফোন কিনে দিতে হবে।

এ জন্য মাঝে মাঝেই তার ছেলে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। সন্ধ্যার সময় ঘুমিয়ে পড়ে। লেখাপড়া করবে না বলেও হুমকি দেয়। সেলিম তার ছেলের আবদারের যথার্থতা বুঝতে পারে না। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রের মোবাইল কি দরকার? বাড়ির ১০০ গজের মধ্যে স্কুল। যোগাযোগের কোনো সমস্যা নেই। সেলিমের মাথায় শুধু ঘুরেফিরে আসে তার ছেলেবেলার কথা। সে যখন স্কুলে পড়ত কোনোদিন আবদার করে আব্বার কাছে একটা জামা কিনে দেওয়ার কথা বলেনি। মা ছেঁড়া জামা সেলাই করে দিয়েছে, সেলিম তা পড়েই স্কুলে গিয়েছে। সপ্তাহে একদিন মাছ না পেলেও কোনোদিন বলেনি আজ ভাত খাবে না।

সন্তানকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে সহায়তা করুন। কয়েকদিন আগে একটি খবরে দেখলাম, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ত্রিশ বছর বয়সী এক যুবক বাবা-মায়ের আশ্রয় ছেড়ে নিজের বাসা নিয়ে স্বাবলম্বী হতে চাইছিলেন না। উপায়ন্তুর না দেখে ওই যুবকের বাবা-মা আইনের আশ্রয় নিলে আদালত তাদের পক্ষে রায় দিয়ে যুবককে বাবা-মায়ের বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমাদের বাবা-মায়েদেরও শক্ত অবস্থান নেওয়া উচিত। এখন অনেক ধনী পরিবারের স্কুলের ছেলেরা বিভিন্ন গ্যাং তৈরি করছে। পরিবারের মধ্যে খেয়াল করারও কেউ নেই। ১০-১২ বছরের ছেলেরা বিভিন্ন নায়কের স্টাইলে চুল কাটছেন, বাবা-মায়েদের লক্ষ্য রাখা উচিত।

আজকের শিশুকিশোর আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। দেশ চালাবে তারা। তাই সবার আগে তাদের দিকে নজর দিতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী, সন্তানদের প্রয়োজন পূরণ করুন, তবে অহেতুক কোনো চাহিদা পূরণ করবেন না। আমাদের নতুন প্রজন্মের সামনে আজ অনেক ধরনের আগ্রাসনের হাতছানি।

নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সবারই বেশি আকর্ষণ থাকে। তথ্যপ্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার তাদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে এবং যাবে। বয়ঃসন্ধিকাল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই বয়সী ছেলেমেয়েদের প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা। শিশুকিশোরদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি করে দিতে হবে। প্রকৃতির কাছে তাদের নিয়ে যেতে হবে। মাঠের খেলাধুলায় যাতে তারা সময় কাটায়, সে ব্যবস্থা অভিভাবককেই করতে হবে। কারণ তাদের উন্নতি ও অগ্রগতির ওপর নির্ভর করছে দেশ ও জাতির উন্নতি। শিশু-কিশোরদের সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা অপরিসীম। আজ যদি বিষয়টি আমরা আমলে না নেই, তবে আগামীতে এই সমস্যা মহামারী আকার ধারণ করবে এবং আমাদের জাতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। 

প্রয়োজনের অতিরিক্ত ১০ টাকাও সন্তানের হাতে দেবেন না। যে টাকা দেবেন, সেই টাকার হিসাব নিন। ছোট থেকেই শুরু করুন, বড় হয়ে আপনি কোন সমস্যায় পড়বেন না। আপনার সন্তান কীভাবে বেড়ে উঠবে সে দায়িত্ব আপনার। সময় পেলে সন্তানকে নিয়ে শুধু শপিংমলগুলোতে না নিয়ে রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ডের ছিন্নমূল বাচ্চাদের দেখাতে নিয়ে যান। আপনার সন্তানকে বোঝান, চারপাশের মানুষ কত কষ্টে আছে। সেই তুলনায় তাদের অবস্থান কত ভালো সেটা তাদের বুঝতে সহায়তা করুন। সন্তানদের নিয়ে হাসপাতালে যান। জীবনের সবদিক তাদের দেখা উচিত। কারণ প্রয়োজন এবং চাহিদা যদি আপনি সন্তানদের বোঝাতে না পারেন, তবে বাবা-মা হয়ে তাদের চাহিদার বোঝা আপনি বইতে পারবেন না।

রিয়াজুল হক : উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

riayul.haque02@gmail.com