আমাদের অবাক ভালোবাসা

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

আমাদের অবাক ভালোবাসা

রায়হান উল্লাহ ৭:৩১ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৮, ২০১৮

আমাদের অবাক ভালোবাসা

ফুটবল ও এর বিশ্বকাপকে ঘিরে আমাদের ভালোবাসা প্রদর্শন কেমন? কেমন তার রূপ। কী তার গতিবিধি? আমাদের বলতে বাংলাদেশ ও এ দেশের মানুষকে বুঝানো হয়েছে।

বাংলাদেশ কখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। অন্তর্জাল বলছে বাংলাদেশ ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৯৪ নম্বরে আছে। তবুও এ দেশ বড় বেশি ফুটবল জ্বরে ভোগে। আরও এগিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপ জ্বরে ভোগে। এ দেশের শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই চার বছর অপেক্ষা করে কখন সবুজ চত্বরে গড়াগড়ি খাবে চর্মগোলক। কখন উন্মাদনায় মাতবে তারা। ফুটবল বিশেষ করে ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতি আমাদের ভালোবাসা সীমাহীন।

এ সীমাহীনতায় আমরা অনেক কিছুই করি। সবই ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। কখনো এ প্রকাশ অনেক ক্ষতির কারণ হয়। ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে ঘৃণা ছড়িয়ে দেই, চেতনে-অবচেতনে।

ফুটবল বিশ্বকাপের কল্যাণে আমাদের আত্মার আত্মীয় হয়ে যান সুদূর আর্জেন্টিনার এক খর্বকায় যুবা লিওনেল মেসি, সাম্বার দেশ ব্রাজিলের তরুণ নেইমার। কখনো বা পর্তুগিজ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। এভাবেই অনেক নাম আসবে। সবার তরে কারও না কারও ভালোবাসা সীমাহীন। এ সবই সুখের।

তবে অসুখের কথা আমরা বিশ্বকাপের সময়টায় ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে কখনো ঘৃণা প্রদর্শন করি। এ ঘৃণা ব্যক্তি ছাপিয়ে দেশ, দেশের পতাকা ও জনগোষ্ঠীতে চলে যায়। ভালোবাসার দুর্বলতায় কেউ কেউ তখন হয়ে যান মহান। তার সবকিছু আমাদের ছুঁয়ে যায়। বিপরীতে না জেনে বাকি সব দেশ ও মানুষকে আমরা ঘৃণা করি। আবার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় কখনো আমাদের ভালোবাসা বুমেরাং হয়, ঘৃণায় রূপ নেয়।

প্রতিটি ফুটবল বিশ্ব আসরের সময় এ দেশের প্রতি পরতে বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা উড়ে। মাপ, রং ও আকারের বালাই থাকে না তখন। তখন আমরা ওই দেশের জাতীয় পতাকার সম্মান রাখি না। এমনকি কিম্ভুতকিমাকার যতসব জঞ্জালে ভরিয়ে তুলি দেশ। একবার পতাকা টানাই তো তা ঝড়, ঝঞ্জা সব সহ্য করে। এমনও দেখা গেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ছিঁড়ে নষ্ট হয়, টুকরো হয়ে ঝুলে। দিন-রাত উড়তে থাকে। সম্মান দেখাতে গিয়ে এভাবেই অসম্মান করি দেশ, মানুষ ও পতাকাকে।

একই সঙ্গে ভিন্ন দেশের পতাকা টানিয়ে আমাদের দেশের সম্মানও নষ্ট করি। ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে সেই পরিপ্রেক্ষিতে দেশের পতাকা সঙ্গে থাকতে হবে। একই সঙ্গে সূর্যোদয়ের পর দুটোই টানাতে হবে এবং সূর্যাস্তের আগে নামাতে হবে। কে শোনে কার কথা। এমনও দেখা যায় বৃহৎ কোনো গাছের মগডালে একবার তা টানিয়ে দেই; বাকিটা সে নিজে বুঝুক। মানে যখন ছিঁড়ে পড়ার পড়ুক। আমাদের ভালোবাসার দায়িত্ব শেষ! এমনকি ভালোবাসাবাসির এ কাজ করতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে।

এবার আসা যাক এতসব করা যে কারণে, সমর্থন প্রসঙ্গে। ফুটবল সৌন্দর্য বুঝে কিংবা নানাবিধ উপায় অবলম্বনে আমরা কোনো একটি দেশকে সমর্থন করি। এ করতেই পারি। কিন্তু বাকি সব দেশের ফুটবল সৌন্দর্য ভুললে হবে কী করে? প্রকৃত ফুটবল বোদ্ধার পরিচয় দেওয়া হয় না তাতে। এ বেলায় আমরা অন্ধ ও মূর্খ সমর্থক হয়ে যাই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে হয় এ দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক। এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। বিশের ফুটবল সৌন্দর্যের অনেকটা এ দেশ দুটি ধারণ করে। এ ছাড়াও শুরুর দিকে কালোমানিক খ্যাত পেলে বা এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তোয় বুঁদ হয়েই অনেকটা জনগোষ্ঠী ব্রাজিলের সমর্থক। এ সহজাত। পরে তার নামের মহিমা ধরে চলমান ব্রাজিলের ফুটবল শৈলী বর্তমান প্রজন্মের ক্ষুধা মেটায়। এভাবেই ব্রাজিলের সমর্থক এ দেশে বাড়ে। অন্যদিকে ১৯৮৬’র বিশ্বকাপের সেই খর্বাকৃতি ওয়ান ম্যান শো যারা দেখেছেন তারা আর্জেন্টিনাকে চিরতরে ভালোবেসেছেন। ভালোবেসেছেন দেশটির ফুটবল কারিকুরি। ভালোবেসেছেন ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা নামের ফুটবল ঈশ্বরকে।

সেই থেকে চলছে। কখনো এ দেশের মানুষের মন হরণ করেছেন রোমারিও, রোনাল্ডো, রিভালদো, রোনালদিনহো এবং সর্বশেষে হাল আমলের নেইমার। কখনো বা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তোতা, ডেনিয়েল ওর্তেগা, হার্নান ক্রেসপো এবং হাল আমলের লিওনেল মেসি। সবই যৌক্তিক ও ভালোবাসার যোগ্য। কথা থাকে দুটি দেশই ফুটবল সৌন্দর্যের অনেক কিছুই ধারণ করে।

এসব রথী-মহারথীরা তো অবশ্যই ভালোবাসার মূল জায়গাটির দাবিদার। তবে কেন বিভক্তি? প্রশ্ন আসতেই পারে। মেসিকে ভালোবাসলে নেইমারকে ঘৃণা করতে হবে এমন কোনো কথা কি আছে? আর্জেন্টিনা স্বপ্নের দেশ হলে ব্রাজিল ঘৃণার হয় কীভাবে? তখন কি প্রিয় সমর্থক আপনাকে কেউ সত্যিকার ফুটবল সমঝদার বলবে? না কি বলা উচিত?

আমরা দেখি দেশের জ্ঞানী নামধারী সমাজও এ ক্ষেত্রে কৃপণ কিংবা মূর্খের পরিচয় দেন। তাদের চোখে মেসি হয়ে যান নায়ক; তখন নেইমার হয়ে যান ভিলেন। যদি নেইমার হন অসম্ভব মেধাবী; তবে মেসি কিছুই পারেন না। এ হতে পারে না। প্রায়শই দেখা যায় আর্জেন্টিনার সমর্থক হলে ব্রাজিলের বিপক্ষে যে কোনো দেশ যেন জিতে যায় সেই আশা করেন।

ব্রাজিলের হলে ঠিক বিপরীত। এমনি বেলায় ব্রাজিলের পতাকা তার মনের সুখ মেটায়। বিপরীতে আর্জেন্টিনার পতাকা হয়ে যায় ডেকোরেশেনের পর্দা। এমনটা হলে সমর্থক আপনাকে ফুটবল বুঝেন বলে ধরে নেওয়া যায় না। আরও কঠিন করে বললে আপনি ফুটবল বুঝেনই না।

কষ্ট পেলে কী করার আছে? আপনি এমন ধারণা পোষণ করেন বলেই ভিনদেশি দলের সমর্থনকে ঘিরে ঝগড়া বাধান। বউকে তালাক দিয়ে দেন। অন্য দলের পতাকা ছিঁড়েন। কখনো সখনো মারামারি করেন। এভাবেই নিজ দলের খেলায় সবকিছু আপনার পক্ষে চান। রেফারি হয়ে যান সাক্ষাৎ যমদূত। তার যে কোনো সিদ্ধান্ত যা আপনার সমর্থন করা দলের বিরুদ্ধে যায় তাই হয়ে যায় অবিবেচিত। তার সঠিক সিদ্ধান্তও আপনার বেঠিক ঠেকে। আপনি অসহিষ্ণু হয়ে যান। কখনো সখনো হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে পরপারে যাওয়ার পরিস্থিতিতে পড়েন। কিন্তু সব করেও ফুটবল সৌন্দর্য বুঝার ক্ষমতা অর্জন করা হয় না আপনার।

এমন ক্ষমতা অর্জন করতে হলে বুঝতে হবে ফুটবলের মূল রস, সৌন্দর্যের উৎস। তাতে যেমন আছে আর্জেন্টিনা, তেমনই আছে ব্রাজিল। আছে এমনতর অনেক দল। সবাই ভিন্ন ভিন্ন সৌন্দর্য নিয়ে পরীক্ষিত হয়ে চর্মগোলকের মহাযজ্ঞে এসেছে। এবং তার কারিকুরির সঠিক প্রয়োগ করেই তা সম্ভব হয়েছে। তাই তো বাছাইপর্ব টপকাতে পারে না বিশ্বকাপজয়ী কোনো দল। প্রথমপর্বেই বিদায় নেয় সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

নিজেদের দিনে যে কেউ ধসিয়ে দেয় অন্যকে। তাই তো ভিনগ্রহের অভিধাধারী চেয়ে চেয়ে দেখে তরুণ কোনো প্রতিভাকে। জার্মানি ৯০ মিনিট পর্যন্ত ভাবে ফলাফল আমাদের হবে এবং তা হয়ও। প্রতিটি আসরে বিশ্বমিডিয়া বলে মাঠ কাঁপাবে কারা। চলে তার সবিস্তার বয়ান। কিন্তু দেখা যায় কাঁপান অন্যরা। হিসাব করে কিছু হয় না। সৌন্দর্য অনেকের মাঝেই থাকে। তাই রূপকথার গল্প হয়ে উঠে আসে একজন এমবাপে।

কেন সবাইকে ছাপিয়ে হয়ে যান শ্রেষ্ঠ। এভাবেই চলে, এভাবেই চলছে। তাই অন্ধ হয়ে দরজা বন্ধ করবেন না। বোদ্ধা সমর্থক হোন। মেসি-নেইমার যেভাবে গলাগলি করে হাঁটে সেভাবে হাঁটুন। বুঝতে শিখুন চর্মগোলকের গতিবিধি। মনের মাধুরী মিশিয়ে উপভোগ করুন প্রতিটি আসর। যেখানে থাকবে সত্যিকার ভালোবাসা। জিঘাংসা, ঘৃণা ও এমনতর কোনো কিছুর যেখানে স্থান থাকবে না। তখন দেখবেন কী সৌন্দর্য ধরা দেবে প্রতিটি পায়ে পায়ে। মনের অভাব দূর করুন। ভালোবাসা সীমাহীন, কমতি থাকবে কেন?

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

raihanullah12@gmail.com