আমি কি মৃত সাংবাদিক(?)

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

আমি কি মৃত সাংবাদিক(?)

মাসুদ কামাল হিন্দোল ৬:৫৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ০২, ২০১৮

আমি কি মৃত সাংবাদিক(?)

সব পেশাতেই লিখিত এবং অলিখিত কিছু নিয়মকানুন রীতিনীতি বা প্রথা থাকে। তেমনি বাংলাদেশের মিডিয়াতেও আছে। মিডিয়াতে বলা হয়, একজন রিপোর্টার বা সংবাদকর্মী যেদিন তার অ্যাসাইনমেন্ট মিস করে অর্থাৎ তাকে যে কাজ দেওয়া হয়েছে সে কাজ করতে ব্যর্থ হয়।

সেদিনই শারীরিক না হলেও মিডিয়াতে তার মৃত্যু ঘটে। তাই যেভাবেই হোক যে কোনো মূল্যে অ্যাসাইনমেন্ট তাকে সফল করতে হবে। খালি হাতে ফিরে আসা যাবে না। ইদানীং করপোরেট কালচারেও বলা হচ্ছে, যেভাবে হোক যে কোনো মূল্যে কাজ করে আসতে হবে। নৈতিক বা অনৈতিকভাবে। তবে অনৈতিকতটা উহ্য থাকে। মিডিয়াতেও করপোরেটের ছোঁয়া লেগেছে। এভাবেই চলছে আমাদের মিডিয়া কর্মীদের দিনকাল।

অনলাইন মিডিয়া বাংলাদেশে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, অনলাইন মিডিয়া বাংলাদেশের মিডিয়াকে নেতৃত্ব দেবে (?) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ভবিষ্যদ্ববাণী  করেছিলেন পত্রিকার দিন ঘনিয়ে আসছে। অনলাইনই রাজত্ব করবে। অনলাইনের দাপটের কাছে পরাজিত হয়ে অনেকে প্রিন্ট মিডিয়া বন্ধ করে দিয়েছে উন্নত বিশ্বে। জনপ্রিয় অনেক পত্রিকার প্রচার সংখ্যাও কমে গেছে। অনেক দেশে পত্রিকার পাঠক সংখ্যা কমলেও এশিয়ার পাঠক সংখ্যা কমেনি। বিভিন্ন জরিপে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কিছু রাজ্যে পত্রিকার পাঠক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেসব রাজ্যে পৌঁছলে হয়তো ১০ বছর পর সেখানেও পাঠক সংখ্যা কমবে। বাংলাদেশের বাংলা-ইংরেজি পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো তাদের অনলাইন সংস্কার চালু করেছে সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যেতে। এর পাশাপাশি ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে কয়েক হাজার অনলাইন পোর্টাল। জোক করে বলা হয়, ‘ওয়ান ল্যাপটপ ওয়ান অনলাইন’ বাংলাদেশে, বা কাওরান বাজারের কোনো বাড়ি থেকে একটা ঢিল ছুড়লে যার গায়ে লাগবে। খোঁজ নিলে দেখা যাবে সেও একজন অনলাইন সাংবাদিক।

বাংলাদেশে অনলাইন মিডিয়া নতুন। অনলাইন মিডিয়াতে কাজ করা খুব চ্যালেঞ্জিং। দ্রুত সংবাদ দিতে হয় পাঠককে। সবার আগে সব খবর। অনেক সময় সংবাদের সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের যথেষ্ট সময় ও সুযোগ থাকে না। আমি সেই চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেছিলাম। প্রিন্ট মিডিয়া ছেড়ে অনলাইনে কাজ শুরু করি। আমার একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এলিট সুশীল বা বুদ্ধিজীবী শ্রেণির ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নেওয়া।

এ জন্য আমি সমাজের ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামের তালিকা তৈরি করি। যেখানে রাজনৈতিক এলিট, মিডিয়া এলিট, ব্যবসায়ী এলিট, ধর্মীয় এলিট, এনজিও এলিটসহ প্রায় সর্বস্তরের এলিটদের নাম ছিল। আমি একের পর এক সাফল্যের সঙ্গে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে যাচ্ছিলাম (যেগুলো এখনো নেটে সার্চ দিলে পাওয়া যাবে)।

এক পর্যায়ে আমার তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুলের নাম আসে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় আমার কাজিনের প্রতিবেশী ছিলেন দীর্ঘদিন। আমার কাজিনের পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। তাই আমি আমার কাজিনকে বলেছিলাম, আমি আসিফ নজরুলের একটা সাক্ষাৎকার নিতে চাই। সে যেন আমার কথা আসিফ ভাইকে বলেন। যে ধরনের যোগাযোগ ঘটলে আসিফ ভাই সাক্ষাৎকার দেবেন সম্ভবত সে ধরনের যোগাযোগ তার আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে ঘটেনি বা প্রকৃতপক্ষে কি ঘটেছিল তা আমি জানি না।

সাক্ষাৎকার নেওয়ার ব্যাপারে আমাকে অফিস থেকে তাড়া দেওয়া হচ্ছিল বারবার। তাই সময়ক্ষেপণ না করে পেশাগত প্রয়োজনেই আমি আমার অনলাইন মিডিয়ার পরিচয় দিয়ে আসিফ নজরুল ভাইকে ফোন করলাম সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। সেটা ছিল ২০১৩ সালের শেষদিকের কথা। আসিফ নজরুল ভাই বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, তিনি খুব ব্যস্ত এবং কোনো অনলাইন মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দেবেন না।

কারণ, একটা অনলাইন মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দিলে আরও দশটা অনলাইন মিডিয়াতে দিতে হবে। এমনকি বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত কোনো অনলাইন মিডিয়াতেও সাক্ষাৎকার দেবেন না। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে জানালেন আমি (মাসুদ কামাল হিন্দোল) যদি ভবিষ্যতে প্রিন্ট মিডিয়াতে জয়েন করি তখন যেন আসিফ ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি অবশ্যই আমাকে সাক্ষাৎকার দেবেন (তখন আমার মনে হলো বাংলাদেশে অনলাইন মিডিয়ার সাফল্য-দিল্লি বহুত দূর হ্যায়)।

পরবর্তীতে তিনি কোনো অনলাইন মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন কি না, বা তার কথা রেখেছন কি না জানি না।

এ ঘটনায় আমার কাজিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দুলাভাই ও তাদের একমাত্র মেয়ে মানে আমার ভাগ্নি কিছুটা বিব্রত। বিশেষ করে আমার ভাগ্নি। আমি কেন তাদের খুব প্রিয় আসিফ আঙ্কেলের সাক্ষাৎকার নিতে পারলাম না। অন্যভাবে বললে বলা যায়, আসিফ ভাই দিলেন না। আমার আম্মা ভাই  বোন বন্ধুরাও আসিফ নজরুলের খুব ভক্ত। তারাও সমভাবে ব্যথিত হলেন।

আমাদের তরুণ ব্যবসায়ী কাম সম্পাদক (মিডিয়া সম্পর্কে যার জ্ঞান ভাসা ভাসা। বাইচান্স এডিটরও বলা যেতে পারে) আসিফ ভাই সাক্ষাৎকার দেবেন না শুনে খুব অবাক হলেন। সম্পাদক জনালেন, টিভি টকশোতে আসার জন্য অনেকেই স্যুট-টাই প্যান্ট পরে বসে থাকেন আমাদের দেশে ইদানীং। কখন কোন চ্যানেলে টকশোর ডাক আসে। কেউ কেউ মানিব্যাগে একাধিক সাইজের ছবি রাখেন কখন কোন মিডিয়াতে দরকার পরে (সম্পাদকের মতো এমন ধারণা অনেকেই পোষণ করেন)। অথচ আমি সাক্ষাৎকার আনতে পারলাম না। মনে হলো, তিনি যেন মনে মনে বললেন ছিঃ সেইম। আমাকে ধিক্কার দিলেন। এ যন্ত্রণা ক্রসফায়ার এনকাউন্টার বন্দুকযুদ্ধের চেয়ে কোন অংশে কম না।

আমি সাক্ষাৎকার নেওয়ার ক্ষেত্রে ৯৯% সফল হয়েছি। ব্যর্থতা ১%। ১% ব্যর্থতার জন্য অফিসে-বাড়িতে আমার পরিচিতদের কাছে ছোট-খাটো ভিলেনে পরিণত হয়েছি। মিডিয়াতে আমার সোর্স পরিচিতি বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমার দক্ষতা যোগ্যতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আমি যাদের হাতে কলমে সাংবাদিকতা শিখিয়েছি বা মিডিয়াতে চাকরি দিয়েছি। এমন জুনিয়র সাংবাদিকরাও আমাকে জোর গলায় বলেছে এক ঘণ্টার নোটিসে আমাকে আসিফ নজরুলের সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করে দেবে। শুধু সময়মতো আওয়াজ দিলেই হবে। সে আওয়াজ আজও দেওয়া হয়নি।

এ দেশের একজন নাগরিকের সাক্ষাৎকার দেওয়া বা না দেওয়ার অধিকার রয়েছে। কোন ব্যক্তি কোন মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দেবেন কি না এটা তার পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপারও আছে। তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য আমাদের দেওয়া উচিত। তারকারা পাবলিক প্রোপার্টি হলেও তাদেরও ব্যক্তি জীবন আছে।

আছে সংসার। আসিফ নজরুল ভাইয়ের এ অবস্থানকে আমি সমর্থন করি। যদিও সেদিন আমিও মৃদু কষ্ট পেয়েছিলাম। ব্যক্তি স্বাধীনতা অবশ্যই থাকা উচিত। আমাদের সংবিধানেও ব্যক্তি স্বাধীনতা সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অনেক সময় আমরা মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা এসব মানতে টানতে চাই না। কোনো সেলিব্রেটি ইন্টারভিউ দেবেন না একথা শুনলে অনেক সাংবাদিকের গায়ে দেশলাই ছাড়াই আগুন ধরে য়ায়। ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে সাংবাদিকেরও সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কখনো কখনো তারাও তো বিব্রত হতে পারে কোনো কোনো কাজে। সে কথাও সংবাদপত্রের সম্পাদকদের মনে রাখা উচিত।

প্রাকৃতিকভাবে মৃত্যুর আগেই আমার মিডিয়াতে মৃত্যু ঘটে গেল। এক জীবনে দুইবার মৃত্যুর সাধ পাওয়ার সুযোগ। মিডিয়াতে আমি ভিলেন হিসেবে নয় নায়ক হিসেবেই মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে চাই শেষ দিন পর্যন্ত। মিডিয়ার অলিখিত নিয়মে মৃত সাংবাদিকের তালিকায় আমার নাম থাকা সত্ত্বেও দুই হাত খুলে লিখে চলেছি। মৃত্যুঞ্জয়ী হব বলে। শুধু একটা সাক্ষাৎকার না নিতে পারায় আমার সব অর্জন সাধনা কমিটমেন্ট ব্যর্থ হতে পারে না।

শুনেছি অনেকে নানা ছলনা করে সাক্ষাৎকার নিয়ে আসে। আমার পক্ষে সেটা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মিডিয়ার অলিখিত রীতি বা অনেকের কাছে আমি একজন মৃত সাংবাদিক কি না জানি না। উন্নত বিশ্বে হলে প্রেস কাউন্সিলের শরণাপন্ন হওয়া যেত। আমার প্রশ্ন আমি কি সত্যিই মৃত সাংবাদিক জনতার আদালতে বা মিডিয়া ট্রায়ালে? সে উত্তর হয়তো একদিন না একদিন আমি পাব। 

মাসুদ কামাল হিন্দোল : সাংবাদিক ও রম্যলেখক
hindol_khan@yahoo.com