পুতিনের অন্যরকম বিশ্বকাপ

ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২ পৌষ ১৪২৫

পুতিনের অন্যরকম বিশ্বকাপ

শুভ কিবরিয়া ৩:৪০ অপরাহ্ণ, জুন ২৮, ২০১৮

পুতিনের অন্যরকম বিশ্বকাপ

স্বাগতিক রাশিয়া অনেক কষ্টেই এবার আয়োজক হয়েছিল এই বিশ্বকাপের। দ্য গ্রেটেষ্ট শো অন আর্থ, বিশ্বকাপ ফুটবল-২০১৮ এখন পর্যন্ত আসর মাতিয়েছে ব্যাপক। আয়োজক হিসাবে রাশিয়া যথেষ্ট সমীহ জাগিয়েছে সবার । ১৪ জুন-১৫ জুলাই মাসব্যাপী এ আসরে রাশিয়ার ১১ শহরে ১২ ভেন্যুতে ৩২ দলের ফুটবল লড়াই চলছে।

সারা পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৃষ্টি কেড়েছে এবারের আসর। যদিও এই আসর আয়োজন করতে যেয়ে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে রাশিয়াকে। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হতে পশ্চিমা দুনিয়ার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি পুতিনের রাশিয়াকে পড়তে হয় বেশ বিপাকেই।

সাবেক কেজিবি স্পাই ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে পুরনো রাশিয়ার গৌরব ফিরে না এলেও শক্তিমান সেভিয়েত ইউনিয়নের গৌরব ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুতিন। দেশের অভ্যন্তরীণ সকল বিরোধীদের কঠোর হাতে দমন করে লৌহমানব হয়ে ওঠা ভ্লাদিমির পুতিন, এখন আমেরিকা ও তার মিত্রদের মোকাবিলা করছেন শক্তহাতেই। পুতিনের শক্ত অবস্থান বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার একচ্ছত্র প্রভাবকে যারপরনাই চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিয়েছে। ফলে, আমেরিকাও রাশিয়াকে ছেড়ে কথা কইছে না। যার প্রমাণ মিলেছে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের স্বাগতিক দেশ হওয়ার লড়াইয়েও।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে ফিফার সভায় চূড়ান্ত হয় ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ হিসাবে রাশিয়ার নাম।

রাশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বি ছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু ফিফার নির্বাহী সভায় ভোটে লজ্জাজনকভাবে হেরে যায় ইংল্যান্ড। অন্যদিকে ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশ হওয়ার লড়াইয়ে কাতারের প্রতিদ্বন্দ্বী হয় আমেরিকা। আমেরিকাও কাতারের কাছে হেরে যায়। আমেরিকা, ইংল্যান্ডের এই পরাজয় তাদের কাছে রাজনীতির ষড়যন্ত্র বলেই মনে হয়। তাই তারা অভিযোগ আনে দুর্নীতির।

আমেরিকা-ইংল্যান্ড জানাতে কসুর করে না যে রাশিয়া, কাতার টাকা খরচ করেই ভোট কিনে বিশ্বকাপ ফুটবলের স্বাগতিক দেশ হওয়ার লড়াইয়ে জিতেছে। এই অভিযোগ সাময়িক ঝড় তুললেও তদন্তের পর তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়।একপর্যায়ে বিশ্বকাপ-২০১৮ বর্জনের ডাক দেয়ার চেষ্টা করে ইংল্যান্ড। আমেরিকাও নানা উপায়ে বাধার সৃষ্টি তৈরি করতে থাকে। নিজের দেশের ক্রীড়ামোদিদের রাশিয়ায় যেতে আমেরিকা অনুৎসাহিত করতে থাকে।

বিশ্ব রাজনীতিতেও রাশিয়া ও আমেরিকা এবং তার মিত্রদেও মধ্যে বইতে থাকে বুনো ঝড়। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ আনে বড় পরিবর্তন। পশ্চিমা দুনিয়ার চক্ষুশূল আসাদ সরকার টিকে থাকে পুতিনের যারপরনাই সমর্থনে।

এছাড়াও পূর্ব ইউক্রেনে রুশ সমর্থনপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের তৎপরতা, ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার অনুপ্রবেশ, গোয়েন্দা ডাবল এজেন্ট সের্গেই স্ক্রিপাল ও তার কন্যার ওপর ইংল্যান্ডে রাশিয়ার রাসায়নিক আক্রমণের অভিযোগ পশ্চিমা দুনিয়ার সাথে রাশিয়ার বিবাদ বাড়াতে থাকে। রাশিয়া-ইংল্যান্ডের কূটনৈতিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকে। দুই দেশ বিপুল সংখ্যায় কূটনীতিকদের বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কার করতে থাকে। রাজনীতির এই দ্বৈরথ আর উত্তেজনা যখন তুঙ্গে তখনই শুরু হয়েছে রাশিয়ায় ফুটবলের এই বিশ^কাপ।

১৯৮০ সালের মস্কো অলিম্পিক, ২০১৪ সালের সোচির শীতকালীন অলিম্পিক সাফল্যজনকভাবে আয়োজনের পর এবার ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের জমজমাট আর ব্যাতিক্রমি আয়োজনের মধ্য দিয়ে পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া প্রমাণ রাখছে ভীন্নতর যোগ্যতার।

উল্লেখ্য, রাশিয়ার এই আসরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বি দেশ আমেরিকার ফুটবল দল মাঠে নাই। বিশ্বকাপ আসরের চূড়ান্ত পর্বেই এবার উঠতে পারে নাই আমেরিকা। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরের চূড়ান্ত পর্বে বাদ পড়েছে আমেরিকা। অন্যদিকে স্বাগতিক আয়োজক দেশ হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বি ছাড়াই চূড়ান্ত পর্বে খেলছে রাশিয়া। এবং সৌদিআরব আর মিশরকে হারিয়ে দ্বিতীয় পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে চলেছে রাশিয়া।

বলা ভালো, ফুটবল দুনিয়ার দুই সেরা দল ইতালি আর হল্যান্ড এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের চুড়ান্ত আসরে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকার মিত্র এই দুই দেশ এবার রাশিয়ার মাটিতে পা রাখতেই সমর্থ হয় নাই।

০২.
পুতিনের রাশিয়ার বিশ্বকাপ শুরুতেই ফেলেছে আলোড়ন। বিশ্বকাপ ফুটবলের দুই মহারথি আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল শুরুতেই খেয়েছে হোঁচট। আইসল্যান্ডের সাথে ১-১ গোলে ড্র কওে মেসির আর্জেন্টিনা এখন বিপদে। পেনাল্টি মিস করে মেসিও আছে ভক্তদের হৃদয়ে বড় ক্ষত হয়ে। অন্যদিকে ব্রাজিলের নেইমারও সুইজারল্যান্ডের সাথে ড্র করে পিছিয়ে পড়েছে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ান হবার লড়াইয়ে। এই দুই অঘটনকে ছাড়িয়ে গেছে গতবারের বিশ^চ্যাম্পিয়ান জার্মানির পরাজয়।

মেক্সিকান ওয়েবের বুনো তালে পা রাখতে ব্যর্থ হয়ে প্রথম ম্যাচেই হারতে হয়েছে জার্মানিকে। মেক্সিকোর কাছে ১-০ গোলে হেরেছে জার্মানি। ফলে তার জন্যও অপেক্ষা করছে বিপর্যয়ের হাতছানি। অন্যদিকে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো অসাধারণ ফুটবল খেলে প্রমাণ করেছে রাশিয়ার মাটিতে তার নৈপুণ্য।

রোনালদোর ব্যক্তিগত পারফরমেন্স তার দল পর্তুগালকে টেনে ধরেছে উপরে। ফলে স্পেনের সাথে ৩-৩ গোলে ড্র করে দ্বিতয়ি পর্বে উঠার লড়াইয়ে এগিয়ে আছে পর্তুগাল। আর অসামান্য ফুটবল খেলে এশিয়ার জাপান ধরাশায়ি করেছে কলম্বিয়াকে। ২-১ গোলে কলম্বিয়াকে হারিয়ে জাপানের ইতিহাস রচনা এবারের আসরের অন্যতম ঘটনা। আফ্রিকান ফুটবলের সেরা দলগুলোর অন্যতম সেনেগালও কম করেনি। পোলান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে এই বিশ^কাপে শুভসুচনা করে সেনেগাল আওয়াজ দিচ্ছে তাদের গন্তব্য অনেক উপরে।

০৩.
এবারের বিশ্বকাপ তাই রাশিয়ার লৌহমানব ভ্লাদিমির পুতিনের মতই আনপ্রেডিক্টেবল। এখন পর্যন্ত ( ২০ জুন ২০১৮) সতেরটি ম্যাচের খেলার ফলাফল প্রমাণ করছে এইবারের বিশ্বকাপ ফুটবল ভবিষ্যত বক্তাদের অনেক পূর্বধারণাকেই অসার প্রমাণ করতে পারে। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল আর জার্মানির প্রথম খেলার ফলাফল তার বড় উদাহরণ।

অন্যদিকে এশিয়ার জায়ান্ট জাপান আর আফ্রিকান অদম্য গতির সেনেগাল এই বিশ্বকাপের সামনে কি পরিবর্তন আনে তা দেখার দাবিদার। ১৭ খেলায় এবার ৪২ গোল হয়েছে। অসাধারণ সব ফ্রি কিকের দেখা মিলেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা বেশ কটি আত্মঘাতি গোলও দেখা দিয়েছে এবারের আসরের শুরুতেই। এবারের বিশ^কাপে বড় ভ’মিকা রাখছে প্রযুক্তির ব্যবহার। হাত দিয়ে গোল করার সুযোগ এবার নাই বললেই চলে। আর প্রযুক্তির চোখ ফাঁকি দেবার উপায় নেই বলেই এবার পেনাল্টিও মিলছে বেশ। তাই এবারের বিশ্বকাপ অনেক অঘটন আর বৈচিত্রের জন্ম দেবার পথ খুলেছে।

রাশিয়ার পুতিন নিজে এক বিষ্ময়। নিজ দেশে তো বটেই গোটা বিশ্বরাজনীতিতে স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদের খেলা খেলে এক নতুনতর বিশ্বকা উপহার দিতে চলেছেন তিনি। তার দেশে আয়োজিত বিশ্বকাপ ফুটবলও তাই অনেক নতুন ঘটনার জন্ম দেবে বলেই মনে হচ্ছে। প্রতিবার বিশ্বকাপ ফুটবল এলে যে প্রশ্নটা বড় হয়ে দেখা দেয় তা হোল কাপ যাবে কার ঘরে?

ল্যাটিন না ইউরোপের ঘরে। সেই প্রশ্নটা এবারও বড় হয়ে উঠছে, উঠবে। এশিয়া আর ইউরোপ জুড়ে থাকা দেশ রাশিয়ার মাটিতে এবারের বিশ্বকাপও সেই প্রশ্ন জাগিয়ে রেখেছে। তবে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার প্রথম খেলার পর ল্যাটিন ফুটবলের হাতে বিশ্বকাপ যাবার ব্যাপারে সংশয় তো কিছুটা তৈরি হয়েছেই। অন্যদিকে জার্মানিও ইউরোপের হয়ে কতটা বিশ্বকাপের ট্রফির ভার সইবে তা বলা মুশকিল। তাহলে কি এবার অন্যকেও এই শিরোপার দাবিদার। বেলজিয়ামের অসাধারণ ফুটবল, পর্তুগালের রোনালদোর দৈবি ফুটবল কি নতুন কোন ইংগিত দিচ্ছে?

এই উত্তরের জন্য অপেক্ষা করতে হবে ১৫ জুলাই পর্যন্ত। তবে, এটা বলা যায় পুতিনের রাশিয়া এবার ভীন্নতর উম্মাদনার, অসাধারণ এক নান্দনিক বিশ্বফুটবলের আয়োজক হয়ে ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। থাকবেই!!!

শুভ কিবরিয়া: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
kibria34@gmail.com