মাশরাফি-সাকিবরা থাকুক অভিন্ন ভালোবাসায়

ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৪ ভাদ্র ১৪২৫

মাশরাফি-সাকিবরা থাকুক অভিন্ন ভালোবাসায়

মঞ্জুরুল আলম পান্না ৫:১৮ অপরাহ্ণ, জুন ১১, ২০১৮

print
মাশরাফি-সাকিবরা থাকুক অভিন্ন ভালোবাসায়

বিভিন্ন দেশের জাতীয় খেলোয়াড়রা একটা সময়ে এসে রাজনীতির মাঠে খেলেছেন। এটা নতুন কিছু নয়। ব্রাজিলের পেলে, জিকো থেকে শুরু করে ভারতের শচীন টেন্ডুলকার, আযহার উদ্দীন, নভোজিৎ সিং সিধু, মনসুর আলী খান পতৌদি, বিনোদ কাম্বলি, কির্তি আযাদ, পাকিস্তানের ইমরান খান, আমীর সোহেল, শ্রীলংকার অর্জুনা রানাতুঙ্গা, সনাথ জয়াসুরিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্যার ফ্রাংক ওরেল, কলোম্বিয়ার কার্লোস ভালদেরামা। এমন নাম উল্লেখ করতে গেলে তালিকা বেশ দীর্ঘই হবে। তাদের কেউ হয়েছেন সংসদ সদস্য কেউ বা মন্ত্রী, কেউ কেউ আবার বিরোধী দলের নেতা হিসেবেই রয়ে গেছেন আজীবন। অধিকাংশই সফল হতে পারেননি রাজনীতির গোলক ধাঁধাঁর মাঠে।

খেলার মাঠের হিসেব আর রাজনীতির মাঠের হিসেবে বিস্তর ফারাক। খেলার মাঠটা ছকে বাঁধা নিয়ম কানুনে ঠাঁসা, রাজনীতির মাঠ অনেক কুটিল-জটিল। ইংলিশ ম্যাগাজিন ওয়ার্ল্ড সসার-এর জরিপে বিশ্বের সেরা একশো খেলোয়াড়ের অন্যতম কলোম্বিয়ার ফুটবল তারকা কার্লোস ভালদেরামা তাই হয়তো রাজনীতির মাঠে নেমে সেটিকে উল্লেখ করেছিলেন ‘জীবনের সেরা খেলা’ হিসেবে। দেশটির ‘ইউ পার্টি’র হয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার সময় গণমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, ‘কলোম্বিয়ার জাতীয় দলের হয়ে আমি অনেক খেলায় অংশ নিয়েছি, কিন্তু এখন আমি জীবনের সবচেয়ে সেরা খেলাটা খেলতে যাচ্ছি।’ সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত না হয়েও ভারতের রাষ্ট্রপতির মনোনয়নের রাজ্যসভার সদস্য হন ক্রিকেট কিংবদন্তী শচীন টেন্ডুলকার। রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথের পর শচীন বললেন, ‘ক্রিকেট আমাকে অনেক দিয়েছে, আমিও আমার শেষ জীবনে ক্রিকেটের জন্য কিছু করতে চাই। আজকের শপথের মধ্য দিয়ে আমি এমন এক অবস্থানে আছি যেখান থেকে কেবল ক্রিকেটের জন্যই নয়, ভারতের পুরো খেলার জগতের জন্যই ভালো কিছু করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।’ তার বক্তব্যে এই কথাই প্রকাশ পায় যে, রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে পারলে দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করা আরও সহজ হয়ে ওঠে।

খেলার মাঠ থেকে রাজনীতির মাঠে নামার তালিকায় রয়েছেন আমাদেরও বেশ কয়েকজন সাবেক খেলোয়াড়। বর্তমান সরকারি দলের হয়ে জাতীয় সংসদে রয়েছেন নাঈমুর রহমান দুর্জয় এবং আরিফ খান জয়। জয় আবার মন্ত্রিসভার সদস্য। তবে তারা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য কতোটা আন্তরিক তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। বাংলাদেশের রাজনীতিও নিশ্চয় অন্য আর দশটা দেশের রাজনীতি থেকে অনেক আলাদা। আমাদের রাজনীতিতে তারকাদের মূল্যায়নের বিষয়টা থাকে একটা ধাপ পর্যন্ত। পরবর্তীতে রাজনীতির কুটিল খেলায় কোণঠাঁসা হয়ে মিটমিট করে জ্বলতে থাকেন সেই তারকারা।

গত বেশ কয়েক দিন ধরে সারাদেশে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে মাশরাফি বিন মূর্তজা এবং সাকিব আল হাসান জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার একটি খবর। যদিও মাশরাফি কিংবা সাকিব এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই বলেননি। গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের এক সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল তাদের দুজন নির্বাচন করতে পারেন বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।

যদিও তিনি পরবর্তীতে বলেছেন, ‘আমি দলের পক্ষ থেকে বা কোনো বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলিনি। তাঁরা নির্বাচন করবে কি না, আমি জানি না। মানুষের মুখে অনেক দিন থেকেই শুনে আসছি মাশরাফি নির্বাচন করবে। সে জন্যই মাশরাফির একজন ভক্ত হিসেবে আমি বলেছি, ও যদি নির্বাচন করে, তাহলে সবাই যেন তাকে ভোট দেন।’ সেই প্রসঙ্গে সেদিনের একনেক সভা শেষে প্রসঙ্গক্রমে সাংবাদিকদের সামনে সাকিবের বিষয়টিও চলে আসে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে যে যেভাবেই বলুন বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার ঝড় এখনও চলছে। বিশেষ করে টি-টুয়েন্টি সিরিজে আফগানিস্তানের কাছে বাংলাদেশের ধবল ওয়াশের পর তাদের নির্বাচন করা না করা নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল সমালোচনা।

রাজনীতি করার অধিকার সবার রয়েছে। আগেই বলেছি খেলোয়াড়দেরও সরাসরি রাজনীতি করার ইতিহাসও কম দিনের নয়। কিন্তু এটা তো সত্য যে আমাদের রাজনীতিতে ভালো মানুষের মূল্যায়ন খুব কম হয়ে থাকে। অথবা রাজনীতিতে এখন এমন এক ভয়ঙ্কর অবস্থা চলছে যেখানে যে কোনো তারকা শিল্পী আরও স্পষ্ট করে বললে একজন অতি সফল মানুষও যদি বিশেষ কোনো দলের রাজনীতিতে সরাসরি যুক্ত হন, তবে তাঁকে নোংরাভাবে বিতর্কিত করতে খুব বেশি সময় নেয় না বিরোধী পক্ষ। অথবা পছন্দের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের স্বপ্নকে কবর দিতে হয় নিজের অজান্তে কিংবা দলের মতলববাজদের দ্বারা কোণঠাঁসা হয়ে। দলীয় আনুগত্য আর দালালি বিদ্যায় পারদর্শীদের কাছে তারা হয়ে ওঠেন অসহায়। অনেক সময় সেই তারকা ভালো মানুষেরাও গা ভাসিয়ে দেন গড্ডালিকা প্রবাহে। বর্তমান রাজনীতিকে সাধারণ মানুষও খুব সোজা চোখে গ্রহণ করেন না। যিনিই রাজনীতিতে নামুন, মানুষের মধ্যে এমন একটা ধারণা জন্ম নেয় যে, বিশেষ কোনো ফন্দি বা ব্যক্তিগত লাভের হিসেব থেকেই তিনি এই খেলায় নেমেছেন। তখন সেই মানুষটির স্বার্থহীন ভালো কথাকেও ভালো শোনায় না অধিকাংশের কাছে।

তাই একজন নগণ্য মানুষ হিসেবে আমার মতে মাশরাফি-সাকিবদের এখন রাজনীতিতে না নামাটাই ভালো। এর চেয়ে বরং রাজনীতির বাইরে থেকে জনকল্যাণমূলক তাদের যে কোনো আহ্বান বা কর্মকাণ্ডের গ্রহণযোগ্যতা ঢের বেশি। সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত না থেকেও দেশ সেবা করা যায় নিবিড়ভাবে। সেই উদাহরণ এরই মধ্যে আমাদের ভালোবাসার মাশরাফি নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছেন। নড়াইলের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে মাশরাফির নেতৃত্বে জন্ম নিয়েছে নড়াইল এক্সপ্রেস ফাউন্ডেশন। প্রাথমিকভাবে ফাউন্ডেশনের নেওয়া কার্যক্রমের মধ্যে নড়াইল শহরের কয়েকটি উন্মুক্ত স্থানে জনসাধারণের জন্য ফ্রি সুপেয় পানি খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বেকার যুবকদের ঘরে বসে উপার্জনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির বিভিন্ন লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে— স্বাস্থ্য সেবার মান বৃদ্ধি করা, উন্নত নাগরিক সুবিধা, বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থা, বিভিন্ন স্কুলে নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষার প্রচলন, বেকারত্ম দূর করার জন্য কর্মস্থান সৃষ্টি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান, চিত্রা নদীকে ঘিরে আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকা করা, আইসিটি শহরে রূপান্তরিত করা এবং পরিবেশকে সম্পৃক্ত রেখে বিনোদন বান্ধব শহর গড়ে তোলা।

এ কথা ঠিক যে, নীতিহীন রাজনীতির প্রতি শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের আকর্ষণ দিন দিন কমতে থাকায় অন্ধকার আরও ঘনীভূত হচ্ছে। তাই ভালো মানুষদেরকেই আবার এখানে ফিরে আসতে হবে বেশি বেশি। তবে তা অন্তত মাশরাফি-সাকিবদের জন্য এখনই নয়। এই মুহূর্তে ক্রিকেটই আমাদের সবার একমাত্র অভিন্ন ভালোবাসার জায়গা। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর পর এদেশকে বিশ্বের বুকে অনন্য করে তুলে ধরেছে আমাদের ক্রিকেটই। সেই ক্রিকেটের পতাকাবাহীরা আপাতত রাজনীতির বাইরে থেকে নির্মল ভালোবাসার ঠিকানা দিয়ে যাক আরও অনেক কিছুতে। রাজনীতি যেন আমাদের সব কিছু কেড়ে না নেয়। 

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক
monjurpanna777@gmail.com  

 
মতান্তরে প্রকাশিত মঞ্জুরুল আলম পান্না এর সব লেখা
 
.


আলোচিত সংবাদ