পথ হোক পথিকের

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৬ আগস্ট ২০১৮ | ১ ভাদ্র ১৪২৫

পথ হোক পথিকের

প্রভাষ আমিন ২:৫৯ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০১৮

print
পথ হোক পথিকের

বেশ কয়েকদিন আগে পূর্বাচলের ৩০০ ফুট এক্সপ্রেসওয়েতে গিয়েছিলাম বেড়াতে। গিয়ে পড়লাম হাতির পাল্লায়। বিশাল সাইজের হাতি পথ আটকে দাড়ালো। সামনের গ্লাসের ওপর শুড় রেখে এমনভাবে দাড়ালো যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কাহিনী জানা গেল, এটা চাঁদাবাজ হাতি। টাকা দিতে হবে। ২০ টাকা দিলাম, নট নড়নচড়ন; ৫০ টাকা পেয়েও মন গললো না। শেষ পর্যন্ত ১০০ টাকা পেয়ে শুড় উচিয়ে সালাম দিয়ে পথ ছাড়লো ঐরাবত মহাশয়। গাড়িতে আমরা পুরো পরিবার ছিলাম। আমরা ভয় পাইনি, তবে বিরক্ত হয়েছি।

কদিন আগে সেই একই চিত্র দেখলাম খোদ কারওয়ানবাজারে। আমি অফিসের আটতলার নিরাপদ রুমে বসে দেখলাম, গাড়িতে গাড়িতে, দোকানে দোকানে হাতির চাঁদাবাজি। হাতির সামনে পড়লে সাধারণ মানুষের কিছু করার থাকে না। পোষা হাতি আসলে নিরীহ প্রাণী। মাহুত যেভাবে ইশারা দেয়, সেভাবেই চলে।

কিন্তু ঢাকার রাজপথে হাতির চেয়েও ভয়ঙ্কর অনেক কান্ড-কারখানা ঘটে। ভিক্ষুক, ফুল বিক্রেতা, বই বিক্রেতা, লেবুওয়ালা,পানিওয়ালারা রাজপথের অংশ হয়ে গেছেন। অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাইকারীও ওত পেতে থাকে মোড়ে মোড়ে। আপনি গাড়িতে বসে মোবাইলে কথা বলছেন, হাওয়া খেতে গ্লাসটা একটু নামিয়েছেন; কখন আপনার মোবাইল হাওয়া হয়ে যাবে; টেরও পাবেন না।

সিএনজিতে বসে আছেন; ভৌতিকভাবে ওপর থেকে ছো মেরে নিয়ে যাবে আপনার ফোন। হাঁটছেন, হঠাৎ এসে আপনার গায়ে ধাক্কা দেবে। তারপর ধাক্কা দিলেন কেন, এ নিয়ে তর্ক জুড়ে দেবে। তার ডাকে চলে আসবে আরো অনেকেই। এক পর্যায়ে সেই চক্র সবার সামনেই আপনাকে হেনস্থা করবে, সর্বসান্ত করে দেবে। ঈদকে সামনে রেখে এখন এই ছিনতাইকারী, প্রতারকচক্র অনেক বেশি সক্রিয়। এদের বিরুদ্ধে তবু আপনি পুলিশের কাছে অভিযোগ করতে পারবেন।

কাউন্টার অ্যাটাক করতে পারলে, ধরতে পারলে দু চার ঘা দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করতে পারবেন। কিন্তু ঢাকার রাস্তায় আরো কিছু ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে। যে ব্যাপারে যেন কারোই কিছু করার নেই। গাড়িতে বসে আছেন বা রিকশায় বা মোটর সাইকেলে। হঠাৎ সারা গায়ে মল মেখে বা হাতে মল নিয়ে আপনার সামনে এসে বলবে, দে। আপনি তখন কী করবেন?

অথবা কেউ হয়তো আপনার সামনে এসে হঠাৎ বাক্স খুলে সাপ বের করে আপনার গায়ে ছুঁড়ে দিয়ে বলবে, দে। কী করবেন আপনি? আতঙ্কে চিৎকার দেবেন, সাহায্য চাইবেন। কোনো লাভ হবে না। সবাই আতঙ্কে দূরে সরে যাবে বা নিরাপদ দূরত্বে দাড়িয়ে হাসবে।

তবে ঢাকার রাজপথে এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। বইয়ের ভাষায় যাদের পরিচিতি বৃহন্নলা। তবে আমরা সবাই চিনি হিজড়া হিসেবে। তাদের জন্মের জন্য তাদের কোনো দায় নেই। কিন্তু জন্মই যেন তাদের অাজন্ম পাপ। জন্মের অভিশাপ তাদের বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন।

তাদের কোনো দায় নেই, বরং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে আমরাই তাদেরকে সমাজের বোঝা বানিয়ে রেখেছি। তাদের কাজের সুযোগ নেই। কিন্তু তাদেরকেও তো খেতে হয়। তাই তারা রাস্তায় নামে। রাস্তায় নেমে হাত পাতলে অত সমস্যা ছিল না। কিন্তু সমস্যাটা হলো, তারা যেটা করে সেটা মাস্তানী; শুধু মাস্তানি নয়, রাজপথে তারা রীতিমত ত্রাস। কোনো সিগন্যালে গাড়ি দাড়ালেই তারা এসে ঘিড়ে ধরে।

গাড়ির লক খোলা থাকলে তারা গাড়িতে উঠে পড়ে। ইচ্ছামত টাকা বা মোবাইল হাতিয়ে নেয়। লক করা থাকলে গাড়ির গ্লাসে আঘাত করে, গালাগাল করে, বনেটের ওপর বসে যায়। তাদের খসানো খুব মুশকিল। রিকশায়, মোটর সাইকেলে বা সিএনজিতে থাকলে তো কথাই নেই। তাদের হেনস্থা তখন সীমা ছাড়ায়। তারা যা করে, সেটা রীতিমত সন্ত্রাস। কিন্তু আসল সমস্যা হলো, এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোথাও প্রতিকার পাওয়ার উপায় নেই।

আশেপাশের লোকজন আপনার বিপদে এগিয়ে তো আসবেই না, বরং উল্টো হাসবে বা পালাবে। পুলিশের কাছে গিয়েও কোনো প্রতিকার পাবেন না। পুলিশ হেসে বিদায় করে দেবে। দেখেশুনে মনে হবে হিজড়ারা সব আইনের উর্ধ্বে।

এমনিতে আমি হিজড়াদের প্রতি পূর্ণ সহানুভূতিশীল। তাদের কাজের সুযোগ সৃষ্টি নিয়ে একাধিক কর্মশালায় অংশ নিয়েছি। আমি চাই তারা কাজের সুযোগ পাক। দাবি জানাচ্ছি, তাদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করার, ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার। কিন্তু রাজপথে তারা যা করে, সেটা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

পথ হোক পথিকের এবং নিরাপদ।

প্রভাষ আমিন: সাংবাদিক, কলাম লেখক।
probhash2000@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত প্রভাষ আমিন এর সব লেখা
 
.


আলোচিত সংবাদ