প্লাস্টিক জীবন, পলিথিন সময়

ঢাকা, শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮ | ৬ শ্রাবণ ১৪২৫

প্লাস্টিক জীবন, পলিথিন সময়

আদিত্য শাহীন ২:৫৫ অপরাহ্ণ, জুন ১০, ২০১৮

print
প্লাস্টিক জীবন, পলিথিন সময়

কথা কাজে মিল হারিয়ে যাচ্ছে। ঘরে বাইরে সবখানে এমনকি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও কথা মানে শুধুই ‘কথার কথা’। গত ৫ জুন উদযাপিত বিশ্ব পরিবেশ দিবসের শ্লোগান ছিল ‘এগিয়ে যাই প্লাস্টিকমুক্ত ভবিষ্যতে’। কৃত্রিমতায় ছেয়ে যাওয়া পৃথিবীতে প্লাস্টিক যখন ‘রাজার রাজা’ তখন আমরা প্লাস্টিককে বিদায় জানানোর মিছামিছি স্বপ্ন রচনা করছি।

প্লাস্টিকহীন কোনো কিছুই খুঁজে পাওয়া আমাদের জন্য নিস্ফল এক আবেদন। বাংলাদেশ নয় শুধু গোটা উন্নয়নশীল আর অনুন্নত বিশ্বে চেয়ার টেবিল থেকে শুরু করে সকল আসবাবপত্র হয়ে গেছে প্লাস্টিকের। ঘরের বাসন কোসন প্লাস্টিকের, পানির জগ প্লাস্টিকের, চামচ, কাপ-প্রিচ সবই প্লাস্টিকের। বাংলাদেশে ২৪টি প্লাস্টিক কারখানার রমরমা বাণিজ্য।

এখন বাণিজ্য মেলায় সবচেয়ে রঙিন দোকানগুলো থাকে প্লাস্টিক বাসন-কোসনের। ‘বেস্ট বাই’ নামের প্লাস্টিক সামগ্রির দোকানে গিয়ে ক্রেতা হিসেবেই যেন লাইন ধরতে হয়। কারণ উপায় নেই, ক্রেতার ভীড় এখানে সবসময়। যা কিছু কাঠের, লোহার, তামার, কাঁচের তা এখন হুবহু তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিকে। পড়লে ভাঙে না, ওজনে হাল্কা এসব চটকদার যুক্তি এখন সবার মাথায়। কাঁচের মতো স্বচ্ছ প্লাস্টিকের জগেই এখন সবখানে পানি খাওয়ার রেওয়াজ। আগে ওষুধের বোতল হতো কাঁচের, এখন দেশি কোনো ওষুধের কাঁচের বোতল নেই বললেই চলে।

বিদেশি ওষুধও আসছে প্লাস্টিক বোতলে। একসময় ডাক্তার ইনজেকশনে ব্যবহার করতেন কাঁচের সিরিঞ্জ, এখন ব্যবহার হয় ‘ওয়ান টাইম’ প্লাস্টিকের সিরিঞ্জ। প্রতিদিন ডাস্টবিনে যায় লাখ লাখ সিরিঞ্জের মতো একবার ব্যবহার উপযোগী প্লাস্টিকের অনেক কিছু। প্লাস্টিককে এক মুহূর্ত বাদ দিলে সভ্যতা যেন উলঙ্গ হয়ে যাবে। ভেবে দেখুন তো, আপনার ঘরের প্লাস্টিকের উপাদােনগুলোকে সরিয়ে দিলে কী টিকবে? আপনার ঘরের ভারী ভারী আসবাবপত্রও প্লাস্টিকের আস্তরণ দিয়ে সৌন্দর্য বাড়ানো।

দুঃখিত এই ভেবে যে, যে কলম দিয়ে লিখি তাও প্লাস্টিকের দেহধারী এক বলপয়েন্ট পেন আর কম্পিউটারের যে বোতাম টিপছি তা প্লাস্টিকেরই। বহু আগে প্লাস্টিক সামগ্রি মানুষের নানারকম এলার্জির কারণ ছিল। প্লাস্টিকের গ্লাসে পানি পান করতে অন্যরকম এক গন্ধ লাগতো নাকে, এখন লাগে না।

এখন প্লাস্টিক বোতলের ‘মিনারেল ওয়াটার’ তকমাধারী পানিই আমাদের কাছে সবচেয়ে স্বচ্ছ, স্বাস্থ্যকর ও গ্রহণযোগ্য। যদি বলি, কীভাবে এই বিশ্বাস? অনায়াসে সবাই বলবেন, এটিই আধুনিক ও উন্নত সময়ের দান। পৃথিবী এগিয়ে গেছে। তাই মানুষ আর দুষিত পানি পান করে না। মানুষ এখন প্লাস্টিক পেয়ে গেছে হাতে, প্লাস্টিক দিয়েই জয় করেছে বিশ্ব।

প্লাস্টিক ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার, অচল। প্লাস্টিকহীন একটি দিন নয়, একটি মিনিটও তো সম্ভব নয়। প্লাস্টিকই আমাদের জীবনের গভীর সত্য। প্লাস্টিক আমাদের প্রকৃতির বিকল্প। আমরা যে আর্টিফিশিয়াল শব্দকে ভালোবাসতে শিখেছি, সেখানে সবচেয়ে বড় প্রতিনিধি প্লাস্টিক। এই প্লাস্টিক একদিনে তার রাজত্ব গড়েনি। পৃথিবীতে মানুষের মগজ আগেও ছিল, এখনও আছে। এমন নয় যে আগে প্লাস্টিকের দোষগুণ মানুষ বুঝতো না, এখন বোঝে। কিন্তু সবাই সবকিছুকে সহজলভ্য করার প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে দিনে দিনে বিস্তৃত করেছে প্লাস্টিকের আসন।

আজ মাথার উপরের আকাশের মতো আমাদের সঙ্গে এক আকাশ যেন যুক্ত হয়ে গেছে প্লাস্টিকের। প্লাস্টিক আজ জীবনের প্রথম সুর। একটি শিশু প্লাস্টিকে খেলনা হাতে নিয়েই কান্না থামিয়ে শুরু করে জীবনের জয়গান। মনে করে দেখুন তো, কতদিন প্লাস্টিকহীন একটি খেলনা দেখেছেন?

মজার তথ্য বলি, ঘরে পোষা সৌখিন পাখি তার শরীরের নীচে প্লাস্টিকের ডিম পেলে তা নিজের ডিম হিসেবেই এখন গ্রহণ করে নেয়। পাখি পালনকারী ডিম দেয়ার আবর্তনকে তার হাতের মুঠোয় আনতে এই চালাকি করে থাকে। প্লাস্টিকের বিভ্রান্তির আর নজরবন্দির এই কারবার থেকে প্রাকৃতির কোনো অনুষঙ্গই রেহাই পাচ্ছে না। আমরা কাঠের নাম দিয়েছি ‘প্লাইউড, মোটা কাপড়ের জায়গা দখল করেছে ‘পিভিসি’।

সারাদেশে অগণিত ব্যানার, ফেস্টুন আর বিলবোর্ডের রঙিন দুনিয়ার প্রধান উপাদান প্লাস্টিক। ঘরের দেয়ালের ‘চুনকাম’ তো বিস্মৃত এক শব্দ। এখন পাকা রঙ মানেই ‘প্লাস্টিক পেইন্ট’। শুধুু তাই নয়, দেহের ভেতরও শিরা উপশিরা থেকে শুরু করে যেসব যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন করা হয় সেখানেও প্লাস্টিক সাম্রাজ্যের থাকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। 

প্লাস্টিকের আপন ভাই পলিথিন। আমাদের সময়ই যেন পলিথিনের হাতে। সবকিছূ ছাপিয়ে জীবনকে অন্যরকম সহজ করে তুলেছে পলিথিন। প্লাস্টিক আর পলিথিনের যেন গভীর প্রতিযো[গিতা। হাজার ধরণের প্লাস্টিক সামগ্রি যতবড় গলায় তার রাজত্ব জানান দেয়, তার চেয়ে ঢের গলা বালিয়ে শোর চিৎকার করে ‘পলিথিন’।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কথা বলার দরকার নেই, আমাদের বাংলাদেশ পৃথিবীতে পলিথিন ব্যবহারে সবচেয়ে গৌরবজনক (?) পর্যায়ে আছে। প্রমাণ নিতে বেশিদূর যেতে হয় না। সবজি বাজারে গিয়ে পাঁচ রকমের সবজি দুই রকমের সালাদ, মরিচ কিনলে সবগুলি উপকরণ দেয়া হবে আলাদা আলাদা পলিথিনে। ফুটপাতের ক্ষুদ্র কলা বিক্রেতাও কেজিখানেক পলিথিন ব্যাগ নিয়ে বসে থাকেন। পলিথিন ছাড়া পণ্য নেয়ার আর কিছু নেই।

পলিথিন ব্যবহার হয় বাসার ফ্রিজে, মাছ, মাংস, সবজির পুটলি তৈরি করতে। বাজার থেকেও চাররকম মাছ চারটি পলিথিনে পৃথকভাবেই দেয়া হয়। পলিথিন যুগ স্থায়ী ও অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার কারণে, দোকানীরাই ক্রেতার ব্যাগের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছেন। এখন বাজার ফেরৎ একেকজন ক্রেতা আট দশটি পলিথিন ব্যাগ একসঙ্গে নিয়ে বাসায় ফেরেন সুপরিচ্ছন্ন একজন বাজারি হিসেবে।

সবারই মনে থাকার কথা। একসময় বাজারে পলিথিন বলতেই ছিল যুৎসইভাবে ধরে নেয়ার মতো ব্যাগ। পরে ক্রেতাকে পলিথিনে নিরুৎসাহিত করে যান্ত্রিক সুবিধা কমিয়ে আনতে পলিথিন ব্যাগের ধরার ব্যবস্থাটি রদ করা হয়। এখন ধরার সুবিধার কোনো প্রয়োজন হয় না। পলিথিনে পণ্য দিয়ে মুখে একটি গেরো লাগিয়ে দিলেই হলো। তার ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে বহন করার সুবিধাটি অাগের সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের কারোরই মনে নেই, পলিথিন ব্যবহার এদেশে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ।

অনেক নিষিদ্ধ যেমন আমাদের অবশ্য ‘সিদ্ধ’ হয়ে আছে, পলিথিনের ব্যবহারটি সেইরকম। ২০০২ সালে তৎকালীন সরকারের পরিবেশ মন্ত্রী শাহজাহার সিরাজ পলিথিনের বিরুদ্ধে এক আকস্মিক জিহাদ ঘোষণা করেন। দেশের মানুষ বেশ ভড়কে যায় ওই সময়। ওই বছরের ১ মার্চ সারাদেশে পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

তখন আবার নতুন করে কাগজের ঠোঙ্গা আর পাটের তৈরি চটের ব্যবজার চালু হতে থাকে। অবশ্য আড়ালে আবডালে কিছু পলিথিন থেকেই যায়। বহু পলিথিন কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তা এখন কেবলই স্মৃতি। এখন দেশে পলিথিনের কারখানা নিশ্চয়ই সেই সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ তিনগুণ হয়েছে। দেড়যুগে মানুষ বেড়েছে। পরিবেশের প্রতি মানুষের উদাসিনতাও বেড়েছে। সময়ের ব্যবধানে ওই নিষেধাজ্ঞা ফিকে হতে হতে এখন দ্বিগুণ উৎসাহের বস্তু পরিণত হয়েছে। এখন পলিথিন ব্যবহার করে আমরা সময়ের অগ্রগতিটাকেই দারুণ এক পুলক নিয়ে উদযাপন করছি।

অথচ পলিথিন নিয়ে আমাদের জানাবোঝাও কম নয়। পলিথিন এমন একটি উপাদানে তৈরি, যা পরিবেশের জন্য মোটেই উপযোগী নয়। এর মধ্য থেকে ‘বিষফেনোল’ নামক বিষ নির্গত হয় এবং খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মিশে যায়। পলিথিন মাটির সঙ্গে মেশে না। ফলে মাটির উর্বরতা শক্তি নষ্ট করে। ডাস্টবিনে ফেলা পলিথিন বৃষ্টির পানির সঙ্গে ড্রেনে ঢুকে পড়ে। ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে। পলিথিন নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলে।

পলিথিন পোড়ালে তাতে বায়ুদূষণ ঘটে। শুধু পণ্য বহনের সুবিধার জন্য আমরা কতগুলো ক্ষতিকে স্বীকার করে নিচ্ছি? সবাই জানি, কিন্তু এদিকে ফিরেও তাকাই না। বিষয়টি ভুলে গেছে আইন শৃংখলা রক্ষাকারীরাও। কারণ, পণ্যের ভোক্তা আর এই সমাজের মানুষ হিসেবে পলিথিনের উপকারীতা (?)

তারাও উপলব্ধি করেন। অথচ ২০০২ সালে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সংশোধনী এনে পলিথিনের উৎপাদন ও বাজারজাত নিষিদ্ধ করা হয়। আইন বলছে, ‘সরকার নির্ধারিত পলিথিন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাতকরণে প্রথম অপরাধের দায়ে অনধিক ২ (দুই) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২ (দুই) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের ক্ষেত্রে অন্যূন ২ (দুই) বছর, অনধিক ১০ (দশ) বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২ (দুই) লাখ টাকা, অনধিক ১০ (দশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা’।

বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের দায়ে অনধিক ১ (এক) বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ (পঞ্চাশ) হাজার টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। ‘পরবর্তী প্রতিটি অপরাধের দায়ে অন্যূন ২ (দুই) বছর, অনধিক ১০ (দশ) বছরের কারাদণ্ড বা অন্যূন ২ (দুই) লাখ টাকা, অনধিক ১০ (দশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ড (জরিমানা) বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন অপরাধীরা’। কিন্তু পলিথিনের সঙ্গে পরিবেশের কোনো বিরোধ আছে বা পলিথিন ব্যবহারের কোনো নেতিবাচক দিক আছে এটিই আমরা বেমালুম ভুলে গেছি। অপরাধ ভাবনা তো দূরের কথা।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা শহরে একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসেবে শুধু ঢাকা শহরে প্রতিদিন দুই কোটির বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়।

এগুলো দ্বারা ড্রেন, নালা-নর্দমা, খাল, ডোবা ইত্যাদি ভরাট হয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রতিদিন ৩৫ লাখের বেশি টিস্যু ব্যাগ উৎপাদন ও বাজারজাত হচ্ছে। এসব ব্যাগ পলিথিনের হলেও কাপড়ের ব্যাগ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্লাস্টিক শুধু আসবাবপত্র বা পলিথিনের ভিতরে সীমাবদ্ধ নেই।

বর্তমানে নামিদামি কসমেটিক কোম্পানির সাবান, ফেসওয়াশ, টুথপেস্ট, বডিওয়াশ, ডিটারজেন্ট ইত্যাদিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিতে মাইক্রোবিড নামক ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি দেখা যায়। যা ব্যবহারের পর নদী-নালা, খাল-বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে পতিত হচ্ছে এবং মাছের মাধ্যমে মানবদেহে প্রবেশ করছে।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেনভিত্তিক সংস্থা ‘দ্য ওয়ার্ল্ড কাউন্টস’ বলছে, এবছর বিশ্বে ৫ ট্রিলিয়ন প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার হবে। যা প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৬০ হাজার। এগুলো একটির পর আরেকটি রাখা হলে তা প্রতি ঘণ্টায় পৃথিবী সাত বার ঘুরবে এবং ফ্রান্সের দ্বিগুণ এলাকা আচ্ছাদন করবে। এর দশ শতাংশেরও কম পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হয়।

এগুলোর বেশির ভাগই পলিইথিলিন যা ক্ষয় হতে কয়েকশ বছর লাগে। প্রতি টন প্লাস্টিক ব্যাগ পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হলে তা ১১ ব্যারেল তেল সমতুল্য শক্তি সংরক্ষণ করে। প্রতি বছর ৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন প্লাস্টিক সমুদ্রে জমা হয়। সমুদ্রে প্লাস্টিক অতি ক্ষুদ্র টুকরায় ভেঙে যায়। এসব টুকরা মাছ খায়; কিন্তু হজম হয় না। মাছের পেটে জমা হতে থাকে এবং খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করে।

বাংলাদেশে বাজার থেকে পলিথিন উৎখাতের বহু বাক্যই শোনা যাচ্ছে গত এক দশক ধরে। ইতোমধ্যে বাজার থেকে রেক্সিন ব্যাগ উৎখাত করে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামুলক ব্যবহার আইন-২০১০ প্রণয়ন করা হয়েছে।

এই আইনে ১৭টি পণ্য- ধান, চাল, গম, ভূট্টা, সার, চিনি, মরিচ, হলুদ, পেয়াঁজ, আদা, রসুন, ডাল, ধনিয়া, আলু, আটা, ময়দা ও তুষ-খুদ-কুড়া পরিবহন ও সংরক্ষণে পাটের ব্যাগের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সেখানে যথেষ্টই সাফল্য এসেছে। যদিও ব্যবসায়ীরা রেক্সিন ব্যাগের পক্ষেই যুক্তি উপস্থাপন করে থাকেন। অন্যদিকে পাটের ব্যাগ ব্যবহার সুবিধা করার জন্য পলিথিন দিয়ে লেমিনেশনও করার রীতিও চালু হয়েছে। কিন্তু বাজার ছয়লাব হয়ে যাওয়া পলিথিনকে বিদায় জানাতে কোনো উদ্যোগই নেয়া হয়নি।

এদিকে গত তিন বছর ধরে পাট মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হচ্ছে, পাটজাত পলিব্যাগের কথা। বলা হচ্ছে, এই ব্যাগ বাজারে প্রচলিত পলিব্যাগের মতোই, তবে পচনশীল। এই পচনশীল পলিথিন ব্যাগ তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্রধান বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টা অধ্যাপক মোবারক আহমদ খান।

এই পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি তাঁকে ২০১৫ সালে স্বর্ণপদক দেয়। আমদানি করা যেসব পচনশীল পলিথিন ব্যাগ বাজারে পাওয়া যায়, তার ৫ ভাগের ১ ভাগ দামেই এটি পাওয়া যাবে। জানা গেছে, রাজধানীর ডেমরার লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে পরীক্ষামূলকভাবে স্বল্প পরিমাণে তৈরি হচ্ছে এ পলিথিন ব্যাগ। আয়োজন চলছে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার।

পাটের সূক্ষ্ম সেলুলোজকে প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা এ পলিব্যাগ কয়েক মাসের মধ্যে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ফলে এটি পরিবেশ দূষণ করে না। এটিকে তাই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিনের একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে ভাবা হচ্ছে। কিন্তু কবে এই ব্যাগ বাজারে আসবে আর কবে থেকে রাজধানী ঢাকবা একেকটি দিন মুক্ত হবে ২ কোটি পলিথিনের অভিশাপ থেকে।

যে পলিথিনগুলোর জঞ্জাল এই ধরিত্রীকে বয়ে বেড়াতে হবে শত শত বছর। অর্থাৎ আজ আপনি আমি যে পলিথিন ব্যাগ নিয়ে ঘরে ফিরছি, সেই ব্যাগটি পৃথিবীতে থেকে যাবে আমরা থাকবো না। তার মানে, একসময় পৃথিবীটা হয়ে যাবে ওই জঞ্জালদের। ওই জঞ্জালই আমাদেরকে পৃথিবীছাড়া করবে। আমরা নিজেদের ইচ্ছেমৃত্যু দেখতে থাকবো।

আদিত্য শাহীন: লেখক ও সাংবাদিক।
ashaheenbd@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত আদিত্য শাহীন এর সব লেখা
 
.



আলোচিত সংবাদ