ভারত সফর ও সংবাদ সম্মেলন

ঢাকা, শুক্রবার, ২০ জুলাই ২০১৮ | ৫ শ্রাবণ ১৪২৫

ভারত সফর ও সংবাদ সম্মেলন

শহীদ ইকবাল ৩:৪৩ অপরাহ্ণ, জুন ০২, ২০১৮

print
ভারত সফর ও সংবাদ সম্মেলন

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে একবার আমার কাছের এক শুভানুধ্যায়ীর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। ভদ্রলোক জাসদের রাজনীতি করতেন। এখন আর নেই। তিনি বলছিলেন, বাংলাদেশের মানুষ ভারত-বিরোধিতাটা ভালো বোঝে। আমি বললাম, কেন? তিনি বললেন, এটা একটা সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প, রক্তের মধ্যে মিশে গেছে, ভারতের বিরুদ্ধে বলতে বা শুনতে খুব ভালোবাসে।

আমাদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ লেখক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ভারত ভাগ ও দাঙ্গা নিয়ে চমৎকার ও বৃহৎ একটি উপন্যাস লিখেছেন। খোয়াবনামা উপন্যাসের প্রধান চরিত্র তমিজ বলে, ‘তুই হেন্দুক ক্যা জমি দিলু। শালারা ভাত খায় এটি আর কুলি ফেলে ওই দ্যাশোত।’

এরকম আরও দেখা যায়- অনেক- পদে পদে। খুব মনে আছে, এক সময় কৈশোরে কোনো এক স্কুলঘরের বাউন্ডারি দেয়ালে মোটা অক্ষরে লেখা থাকত, ‘রুশ-ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার-সাবধান’। তখন বুঝতাম না! তবে আজ বুঝি, সময়টা গেছে, ষাটের দশকের শেষদিকে- তখন আমাদের বেড়ে ওঠার সময়; কেউ আমরা আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ বা বঙ্গবন্ধুর নাম কিংবা তার রাজনীতি সেভাবে কোথাও দেখিনি। দেয়ালে তখন এসব স্লোগান শুধু শোভা পেত। যা হোক, কথায় কথা আসে। প্রধানমন্ত্রীর সম্প্রতি ভারত সফর তথা পশ্চিমবঙ্গ সফর নিয়ে চলছে নানা রকম কথাবার্তা। এটা ছোট্ট সফর তো বটেই! তবে এ সফরে দুদিনে দুটো কাজ তিনি করেছেন- যেটা চোখে পড়ার মতো।

পশ্চিমবঙ্গেই ছিলেন, শান্তিনিকেতনে ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধন আর বর্ধমানের আসানসোলে নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণ। সোজা অর্থে, একে খুব ভালো কিংবা ইতিবাচক অর্থে নেওয়ার সুযোগ আছে। আমি এই পাতাতেই কদিন আগে ‘বাংলাদেশ ভবন’ নিয়ে একপ্রস্থ লিখেছি। সে বিষয়ে আর পুনরাবৃত্তি নয়। কিন্তু লক্ষণীয়, ভারত সফর মানেই বিশেষ কিছু। কী দিল আর কী নিল- তার হিসাব কষা। খুব স্পর্শকাতরভাবেই তাতে আসে, আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গ। বোধ হয়, নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পথ করতেই প্রধানমন্ত্রী ভারত গেছেন! ব্যঙ্গার্থে তুচ্ছ করে কেউ বলে, ওসব শান্তিনিকেতন-টিকেতন কিছু না। তার সঙ্গে জুড়ে দেন, তিস্তার কী হলো! সব তো দিয়ে দিল, পাইল কী- ইত্যাদি উসকানিসূচক কথাবার্তা।

অনেক ‘আদার ব্যাপারী’রও এ নিয়ে কথাবার্তা কম নয়। ‘আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর’ বলে যে প্রবাদটা আছে- সেটা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরে গেলে বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আসলে তা বেশ বোঝা যায়। পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত এর উত্তাপ পৌঁছায়। আর সেটা নিয়ে তথাকথিত রাজনীতিবিদদের রাজনীতি করতেও কোনো অসুবিধা হয় না।

বিষয়টা আমি অন্যভাবে নিতে চাই। স্বাধীনতার পর অনেক সময় আমরা পার করেছি। কূটনীতি অনেকদূর এগিয়েছে। এটা চলমান বিষয়ও বটে।

এখন ‘ভারত-বিরোধিতা’ কথাটি কি চলে? বিষয়টি কি এক জায়গায় আছে? যারা রাজনীতি করছেন তারা এটা নিছকই কি পুঁজি করছেন না! এর কি আদৌ কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে? কেউ কি এটা করে কোনো সুফল পান! আদৌ কি কোনো সুযোগ আছে? রাজনীতিতে ব্যক্তিত্ব বলে একটা কথা আছে। সেটা কি লেশমাত্র কোথাও মেলে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্ট্যালিনের শাসন যখন শেষ হলো তখন রাশিয়ায় নিকিতা ক্রুশ্চেভের শাসন শুরু হয়। বলা হয়, স্নায়ুযুদ্ধের যুগের বেশ শক্তিশালী নেতৃত্ব ছিল ক্রুশ্চেভের। কিন্তু স্ট্যালিন ক্ষমতায় ও ব্যক্তিত্বে ছিলেন অনন্য এক ব্যক্তিত্ব। তার সম্পর্কে ক্রুশ্চেভ তার মেমোয়ার্স-এ লিখছেন : Ô... they began taking photographs of the delegation. Stalin already stood out at that conference… The photoghrapher kept fussing around his camera. His name is Petrov, a major specialist in his field who had worked at the Kremlin for many years. At the party officials who had been at conferences and congresses knew him. At the photographer Petrov began giving instructions to one or another person, which way to return  the head, which way to look. Stalin suddenly made a remark : ÒComrade Patrov loves to give orders, but among us you can’t go issuing orders like that. You can’t order us around!ÕÕ This incident made a good impression on my friends and me.Õ... [Memoirs of Nikita Khrushchev : Commissar 1918-1945, vol 1] এই হলো ব্যক্তিত্ব। এরকম উইনস্টন চার্চিলের স্মৃতিকথাতেও অনেক স্টেটস্ম্যানশিপ ব্যক্তিত্বকে পাওয়া যায়।

এরকম ‘ইন্ডিয়া উইনস ফ্রিডম’ও আকর্ষণীয় পুস্তক। যা হোক, এটা স্বীকার্য যে,আমাদের ভারতবর্ষে গান্ধী, নেহরু, ইন্দিরা, মুজিব অনলবর্ষী নেতা ছিলেন। তাঁদের ক্যারিশমা লক্ষ লক্ষ মানুষকে টেনেছিল। এর জন্য শিক্ষা ও সংস্কৃতিজ্ঞানের চর্চা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে তথা বিশ্বে এখন এ মানের নেতা চোখে পড়ে না। বাংলাদেশে ভারত-বিরোধিতা এখন মনে হয় আরও সংকুচিত একটি রীতিতে পৌঁছেছে। এটি এগোয়নি বরং পিছিয়েছে।

সরকারবিরোধীরা এ নিয়ে হরদম রাজনীতি করছে। অপরাজনীতিই চলছে। এই অপরাজনীতি দেশের কিংবা যারা করছেন তারা দলীয় আদর্শের জন্যও কিছু করছেন বলে মনে হয় না।

উভয় দেশের কিছু বাস্তবতা যদি আমরা র‌্যাশনালি ভাবি তাহলে এমন বিরোধিতার মুখে ছাই পড়ে। চতুর্দিকে (দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর আর মায়ানমার ছাড়া) ভারতের যে সীমানা আছে, সেখানে বাংলাদেশের বাণিজ্য-অর্থনীতি-যোগাযোগ প্রভৃতি বিষয়ে ‘বিগব্রাদার’-এর সঙ্গে বিরোধ বাধিয়ে কতটুকু সফল হওয়া সম্ভব- সেটি বাংলাদেশে যে রকম সরকারই ক্ষমতায় থাক! সুতরাং বিরোধ নয়, সমঝোতাটাই উভয়ের সহযোগিতাকে সামনের দিকে এগিয়ে দিতে পারে। এ সহযোগিতার নীতিতে বাংলাদেশ এখন যে একটা পজেটিভ অবস্থায় আছে তা প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্রেই বোঝা গেছে। ঠিক এখানে অন্য কোনো সরকার থাকলেও এর চেয়ে যে ভালো কিছু করতে পারত না- তা বাজি ধরেই বলা যায়।

একইভাবে নির্বাচন নিয়ে যে কথাবার্তা চলছে, সেটাও চলতি রাজনীতিতে একটা সম্মুখগামী বাস্তবতা। যে কোনো সরকারই চাইবে তার শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে। এখন কূটনীতি কেমন হবে কিংবা কূটকৌশলের সাফল্যে কে এগিয়ে যাবে সেটা হয়তো আপাত পরীক্ষণীয় বিষয় কিন্তু মোদ্দা কথা ক্ষমতার যে অধিষ্ঠান সেটি নিয়ে উভয় সরকারপ্রধানের মধ্যে কী কথা হয়েছে তা জানা যায়নি, তবে কলকাতার সংবাদমাধ্যমে যেটা এসেছে, সেটি বানোয়াট বা বিভ্রান্তিকর, মনগড়া কিছু বলতে আমরা চাই না। এ নিয়ে উভয় নেতার মধ্যে আলোচনা হতেই পারে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের একটা পরোক্ষ ছায়া কোনো না কোনোভাবে থাকে, থাকাটা বোধ করি অস্বাভাবিকও নয়। কারণ, ভারতের একটি বৃহত্তর বাজার হলো বাংলাদেশ। সেখানে তাদের যে ভিশন তা বাস্তবায়নের জন্য সদাসর্বদাই তারা তৎপর থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

আবার বাংলাদেশ ক্ষুদ্ররাষ্ট্র হলেও এর যে জনশক্তি বা অভ্যন্তরীণ যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া সেটি ভারতও খতিয়ে দেখার অভিলাষ উড়িয়ে দেবে না। সেখানে সর্বোচ্চ সমঝোতা ও সহযোগিতার বিষয়টি যদি নিশ্চিত হয় বা অতীতের সঙ্গে মিলিয়ে যদি বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশের বিষয়টি উভয়ের মধ্যে সদর্থক পরিবেশ তৈরি করে- তবে ভারত কেন বিকল্প পথ দেখবে! আবার বর্তমান সরকারও কেন সে বিকল্প পথ তৈরির ব্যবস্থা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে পরোক্ষভাবে এসব কথা কমবেশি আছে। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী প্রধানমন্ত্রীর এ আত্মবিশ্বাস নিশ্চয়ই তার পরিশ্রমের ফল। সেটি দেশের বিশ কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গভাবে হয়তো না মিশতে পারে কিন্তু সত্যপ্রকাশে ও প্রতিষ্ঠায় আমাদের সরকারপ্রধান বেশ সাফল্য দেখিয়েছেন- তা নির্দ্বন্দ্ব বলা যায়। এবং তিনি এটিও প্রমাণ করতে চেয়েছেন, ভারত-বিরোধিতার গৎবাঁধা ইস্যুতে কিছু যায় আসে না। এখন সামনে এগুনোর পথ।

দুই কোরিয়া এক হচ্ছে, ট্রাম্পীয় ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এমনকি খোদ আমেরিকার রাজনীতিতেও বইছে ঝাঁ-চকচক উপর-চালাকির আবহাওয়া। এ হাওয়া বশংবদ করে ফেলছে অনেক কিছু। কিন্তু তার বিপরীতে অনেককেই আবার একটা রোডম্যাপেও যুক্ত করেছে।

বিশেষ করে প্রযুক্তি বিপ্লবের ফলে। এই প্রযুক্তিই সবকিছু এখন পেছনে ঠেলে দিয়ে, আধুনিক ও উন্নত মাত্রার দিকে নিয়ে চলছে। ফলে ব্যক্তি মানুষের ভেতরে উল্লেখনীয় পরিবর্তন আসতে বাধ্য। সে আর পিছিয়ে থাকতে চায় না। পরিবর্তন চায়। প্রতিষ্ঠা চায়। প্রতিরোধ ঠেলে সম্মুখে এগুতে চায়।

একটি রাষ্ট্রের সরকার কী করে? সে তো মানুষের পরিবর্তনের মেনিফেস্টোকে লালন করবে- মানুষের আভ্যন্তরীণ পাল্সকে আমলে নিয়ে। সেভাবেই তার উন্নয়নসূচকও নির্ধারিত হয়। ফলে ডিজিটালি বাংলাদেশের যে স্বপ্ন, তা উঠতি প্রজন্ম বা প্রতিযোগিতায় রপ্ত প্রজন্মকে খুব দ্রুততার সঙ্গে গ্রহণ করেতে হচ্ছে। এই গ্রহণটা অনেকটাই এনোভেটিভ। সেটি করতে তারা বাধ্য।

আর এমন কাজে নেগেটিভ মার্কিংও যে থাকবে না তা নয়। কিন্তু পরিবর্তনটা আছে। যা সরকারের চলার পথকে ক্রমাগত নতুন অভিধা দিচ্ছে। এটি বস্তুত, যে ব্যবস্থার সরকারই থাক সে লিফটটা তারা পেত। ফলে, ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের যে টার্গেট, সম্পর্কের সহযোগিতা সৃজনের পথ কিংবা উভয়ই একসঙ্গে চলে স্বার্থ বজায় রেখে সহযোগিতার নীতিকে চলতি বিশ্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে পারে এটাই সহজ কথা। আর এইটাই আগামী নির্বাচনের ইঙ্গিত। ফলে এ নিয়ে কারও আলাদা কিছু বলার কোনো প্রয়োজন নেই, প্রমাণেরও প্রশ্ন আসে না। ফলে, এমন প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীকে যে ইম্প্রেসিভ মনে হবে তাতে নতুন করে অর্থ করার সুযোগ নেই। বরং সামগ্রিক বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের চলতি হাওয়ায় পন্থী হওয়ার যে তড়িৎ কৌশলগত সিদ্ধি সেটা শুধু ভারত নয়, যে কোনো বড় রাষ্ট্রের সঙ্গেই বাংলাদেশ এক নীতিই অনুসরণ করে চলেছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে বলে মনে হয়।

তবে আমাদের প্রান্তিক মানুষের আয় কমেছে। জীবনযাত্রার মানও কমেছে। কালো টাকা, মধ্যস্বত্ব অর্থ, মাদক সেবন, অবৈধ অর্থ জোগান, কাঁচা টাকা বেড়েছে। এর প্রভাব সর্বস্তরে পড়ছে বিশেষ করে- প্রান্তিক মানুষের মধ্যে তীব্রভাবে পড়েছে। যেটি সার্বিক অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক। অপরাজনীতির কারণেও বেড়েছে। ফলে ক্রসফায়ারে যারা মরা পড়ছে, তাদের সামাজিক অবস্থান দেখেও বোঝা যায়। সকলেই যে ধরা পড়ছে তা নয়। এই কাঁচা টাকার লোভ, মোহ এখন বেশুমার। এ থেকে বেরুতে যে পথ সরকার গ্রহণ করেছে তা বেশ চ্যালেঞ্জিং।

প্রধানমন্ত্রীও যা বলেছেন তা সাহসের কিন্তু বিনা চ্যালেঞ্জে এ থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। সার্বিকভাবে সমাজস্তরের অবস্থা এখন বেশ রিস্কি। এর কারণ, অপরিশুদ্ধ রাজনীতি, তৃণমূলে রাজনীতিহীনতা, বেকারত্ব আর তুমুলভাবে অপসংস্কৃতির চর্চা। এগুলো নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। সে নিয়ে রাজনীতিবিদদের কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না! আমাদের পরিবর্তনটা আসছে কিন্তু তার ফিল্টারিং নেই। ফলে এটি সুপেয় নয়- পাছে পান করলে বদহজম হয়ে যায় কি না!

লেখক: শহীদ ইকবাল, অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
shiqbal70@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত শহীদ ইকবাল এর সব লেখা
 
.



আলোচিত সংবাদ