রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষাটাও জরুরি

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষাটাও জরুরি

চিররঞ্জন সরকার ২:৫৭ অপরাহ্ণ, জুন ০২, ২০১৮

রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষাটাও জরুরি

এক-একটা সময় খুব খারাপ যায়, যেন অমাবস্যার রাত। কোথাও আকাশের কোণে কিঞ্চিৎ আলোর রেখা দেখলেই মনে খুশির বাঁধ ভাঙে। আবরের মতো ভেবে নেয় বুঝি শেষ হল অন্ধকার! তাই আবার হয়? পরক্ষণেই ঝাঁপিয়ে পড়ে সে-অন্ধকার গাঢ়তর হয়ে।

মাঝে মাঝে মনে হয় এই হাজার-হাজার বছরের মানবসভ্যতা কতটুকু সময় আলোকিত ছিল? বেশিরভাগ সময়টাই তো তার কঠিন লড়াই। প্রথমে তাকে লড়াই করতে হয়েছে টিকে থাকবার খাতিরে। অন্যান্য জন্তু-জানোয়ারের মধ্যে যারা সেরা, তাদের দায় ছিল নিজেদের অস্তিত্বকে জাগ্রত করে তোলা। ক্রমে তারা মানবসভ্যতার ভিত পোক্ত করল।

তারপর, এক সময় নিজের প্রয়োজনে, তাদের মধ্যে গোষ্ঠী তৈরি হল। আর অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠল পরস্পরের সঙ্গে লড়াই। কখনও জমি নিয়ে, কখনও সম্পদ নিয়ে, কখনও নারী নিয়ে, কখনও বা গোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে। অর্থাৎ ক্ষমতা। ‘ক্ষমতা’ যে এক বিষম বস্তু তাতে সন্দেহ রইল না।

এভাবে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্ব, বিজেতা এবং পরাজিত-র মধ্যে বিভাজন থেকে বিভেদের দ্বন্দ্ব বিকশিত হতে থাকে। তারপরে ক্রমে ক্রমে আর্য-অনার্য, বর্ণবিভাগ। তারপরে ধর্ম, ধর্মের আচার-বিচার ইত্যাদি প্রভৃতি। কিন্তু যুদ্ধ অন্যতম কলঙ্ক হয়ে লেগে রইল মানবসভ্যতায়।

দিন যায়, সময় ও সমাজের জটিলতা বাড়ে, নানা মতের সৃষ্টি হয়। কূটনীতি, রাজনীতি, ধর্মনীতি সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। আর ক্রমে তা ভয়ংকর আকার ধারণ করে। ওই বিশেষ বিশেষ নীতি যখন নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে, ক্ষমতার আস্ফালনে আকৃষ্ট হয়—তখন কোনও পক্ষেরই বোধহয় সাধারণ মানুষের কল্যাণের চিন্তা থাকে না। তখন সমাজ যুক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় না।

আর যুক্তি অবহেলিত হলে ‘বিজ্ঞান’কে অস্বীকার করা হয়। কী করবে মানুষ সেই জ্ঞান নিয়ে, যদি তার মধ্যে দৈনন্দিন সমাজ পরিচালনার যুক্তিজ্ঞান না থাকে? তাই সুষ্ঠু দিনযাপনের জন্য যুক্তির উপস্থিতি অতিমাত্রায় আবশ্যক। যুক্তিবিহীন ‘অচলায়তন’ গড়ে সমাজকে বেশিদিন শান্তও রাখা যায় না।

স্বাভাবিকও রাখা যায় না। বিজ্ঞান কি কেবল উপগ্রহ প্রেরণে প্রতিযোগিতার বিষয়? নাকি নানা ধরনের অস্ত্র উৎপাদনে কারখানায় ব্যবহৃত হবার বস্তু?

এ সমাজ হল ‘মনুষ্য’ নামক এক জীবের সমাজ। বোধ-বুদ্ধি নিয়ে, মন-মনন নিয়ে তার অস্তিত্ব। সেই মানুষ, যে প্রশ্ন করে, ‘কী?’ এবং ‘কেন?’ এই প্রশ্ন তার চিরন্তন। তা মনুষ্যসমাজ সৃষ্টির ক্ষণটি থেকেই ধানের গায়ে তুষের মতো লেগে রয়েছে। আজ যাকে সে নির্বাচন করে ক্ষমতা হাতে তুলে দিচ্ছে, কাল তারই বিরুদ্ধে তার মনের মধ্যে অজস্র প্রশ্ন জন্মালে সে অস্থির হয়ে ওঠে। অধিকাংশ সময়ে ক্ষমতা যে যুক্তিহীন করে তোলে রাজাকে লোভের লালনে। তাঁর লালসা, তাঁর কামনা যখন তছনছ করতে থাকে সমাজের স্থিরতাকে তখনই মানুষের মনে প্রশ্ন উপজিত হয়। আর দুর্বল হয় রাজ্য। আক্রমণকারী হয় আক্রান্ত।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে মুসোলিনি ও হিটলার দু’জনকেই ‘সুদিন’ আনবার ভরসায় জনসাধারণ ক্ষমতার আসনে বসিয়েছিল। সেই ‘সুদিন’ এল না, এল কাল বিশ্বযুদ্ধ, এল ইহুদি-নিধন। তার আগেও ‘ধর্ম’, অর্থাৎ religion-এর নামে কতবার ক্রুসেডে নিহত হয়েছে মানুষ।

রিলিজিয়ন শব্দটি ব্যবহার করতে হল কারণ আমরা যাকে ‘ধর্ম’ বলি তা ঠিক রিলিজিয়ন নয়। আমরা কথায় বলি ‘সত্যকথন আমার ধর্ম’। সেই সত্যকথনে বিশ্বাস কোনও রিলিজিয়নের অন্তর্গত নয়। সে ধর্ম মানবধর্ম, যদি তাকে ধর্ম বলেই ধরা হয়। যিনি ও-কথা বলবেন তিনি নিজের মনের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েই বলবেন। কোনও দেব-দেবীর কাছে তাঁকে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয় না, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হয় না ঈশ্বরের কাছেও। তাই ‘ধর্ম’ শব্দের গভীরতা বা বিস্তার অনেক বেশি।

আজ আমাদের দেশে এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে রিলিজিয়ন পালনের বাড়াবাড়ি লক্ষ করা যায়। তাঁরা যুক্তি মানেন না। তাঁরা অন্ধ নিয়মের বেড় দিয়ে একচ্ছত্রের আসনকে জীবনের লক্ষ্য বলে ধরে নিয়েছেন। কোনও বুদ্ধিমান মানুষ কখনও নিজ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের নামে আরেকদল মানুষের প্রতি বিদ্বেষ প্রদর্শন করতো না। নিজেদের সমাজকে টুকরো করে ফেলতে চাইত না। পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইলের দেশ আমাদের। সে দেশে কতরকম মানুষের বাস! আর কতরকমের বেশভূষা, কতরকমের আচার-অনুষ্ঠান, কতরকমের খাদ্যাভ্যাস। সমস্ত মানুষকে নির্দিষ্ট ছাঁচে গড়ে নেব—এ ভাবনা উন্মাদের।

সেই উন্মাদ এসেছে আজ ‘কালস্বরূপ’ হয়ে। যার যুক্তি নেই তার সঙ্গে লড়াইতে নামা মানে রক্তমাখা পাঁকের মধ্যে পড়ে যাওয়া বারবার। যাঁদের যুক্তি নেই তাঁদের অস্ত্র ভীতিপ্রদর্শনে। তাঁদের নানা পথের মধ্যে এক হল—মাসল পাওয়ার আর অপরটি হল পরনিন্দা-পরচর্চা, অপবাদ-চর্চা। এই দ্বিতীয়টির ক্ষমতা কিন্তু যা ভাবা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি। রটনা যে কতখানি ক্ষতি করতে পারে, তা তো আমরা দেখতে পাচ্ছি প্রায় প্রত্যহ।

কারো বিরুদ্ধে রটিয়ে দিলেই সে ধর্মের অবমাননা করেছে। অমনি আমরা ঝাঁপিয়ে পরি।

এক্ষেত্রে সত্যাসত্য নির্ধারণের কাহিনি অনুপস্থিত। ভক্তদলকে লেলিয়ে দিলেই তো হল। নিজে হাতে কিছু করতেই হল না। পরবর্তীকালে যখন প্রমাণ হল সত্য তখন তো সেই ‘অমুক’ পরপারে। আর তাকে তো মেরেছে শত মানুষের গুন্ডাগোষ্ঠী। শাস্তি আর কার বিরুদ্ধে? পুলিশের যেমন আছে এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ার, তেমনি রাজনীতিতে আছে মব-ভায়োলেন্স বা জনসহিংসতা। ভিড়ের মধ্যে কে কাকে পিটিয়েছে, কে জানে! প্রচুর মানুষ আছে দেশে। জনসংখ্যা বড় বেশি। নানান ঘটনায় দু-চার জন মানুষের মরণ হলে ভালোই হবে দেশের এবং দশের।

তাই দাঙ্গাও লাগিয়ে দাও না দেশে। ধর্মে ধর্মে, পাহাড়ি-বাঙালিতে। পাহাড়িতে-পাহাড়িতে। কিছু মরবে অজ্ঞাতনামার গুলিতে। কিছু মরবে অজ্ঞাত কারণে। কেবল লাশটা পাওয়া যাবে। কীভাবে মরল, কে মারল-কিছুই জানা যাবে না। খালি হুজুগটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা চাই। ও-টুকুই ক্ষমতার অলিন্দের কাজ। তাতে ‘পুণ্য’ই সঞ্চিত হবে তাঁদের।

‘অ-বিশ্বাসী’রা বলবেন ‘কোনও কিছুই স্থায়ী নয়। কিছুই কি থাকে? সবই বয়ে চলে যায়, নদীর স্রোতে। অতএব যা হচ্ছে হতে দাও। পরোয়া কী?’—কিন্তু তা-ই কি? ‘মনুষ্যসভ্যতা’য় মনুষ্যত্ব বা সভ্যতার প্রতি কোনও আস্থা রাখা যাবে না? আজ পৃথিবীর কোন দেশটার দিকে তাকিয়ে শান্তির নি:শ্বাস গ্রহণ করা যায়? আমেরিকা ভীমের গদার মতো আণবিক বোমা নিয়ে আস্ফালন করছে। দিকে দিকে যুদ্ধের আয়োজন। এ-ওকে-তাকে-শাসাচ্ছে। ছোট ছোট অস্ত্র নিয়ে ধর্মযুদ্ধের জন্য এ-ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে।

বড় দেশগুলো শকুনি মামার মতো প্যাঁচ কষছে। তাই ধর্মবিশ্বাস বেড়েই চলেছে। বেড়ে চলছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত-মৃত্যু। অস্ত্র ব্যবসা। মূর্খরা লড়ছে মরছে, মারছে। মানুষের মানবিক অস্তিত্ব ও পরিচয় আজ ঘুচে যেতে বসেছে।

অথচ আমরা তো বিশ্বাস করতে চাই মানুষের সম্মানবোধে। তাই কোনও দড়ি ছেঁড়া ষাঁড় যদি উঠোনে ঢুকে পড়ে তাহলে আত্মরক্ষার্থে তাকে প্রতিরোধ করতে হবেই। তাই অন্যায় দেখলে আমাদেরও প্রতিবাদ করতেই হবে। আমাদের চতুর্দিকে রাজনীতি ব্যবসায়ীদের রুচিহীন শব্দোচ্চারণ আমাদের স্তম্ভিত করে। —তাঁরা ব্যবসায়ী, তাঁদের শাস্ত্র হয়তো তাঁদের এই বিধানই দেয়। কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের শাস্ত্র বলে ‘রুখে দাঁড়াও’।

কিন্তু এ যে বহু বছর ধরে মজ্জায় মজ্জায় প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে আজকের কারবারিদের পিতৃপিতামহের দল। একদিনে তা দূর হবে কী করে? আর এই মন্তব্যসমূহকে মনোযোগ সহকারে দেখলে আমরা শুনতে পাব হায়নার হাসি, মনশ্চক্ষে দেখতে পাব নেকড়ের দন্ত-নখর। আর তার ইশারায় সে বলছে, ‘যুক্তি-বুদ্ধি প্রয়োগ কোরো না। আমরা যা বলব তা-ই ঠিক, তা-ই সত্য এবং তা-ই মান্য।’

ক্ষমতার আস্ফালন দেখছি আমরা আজ চেয়ে চেয়ে। আমরা চারশো তোমরা কত? ষোলো? না সতেরো? ভেবে চলো, বুঝে চলো। আমরা কিন্তু লেলিয়ে দেব নেকড়ে। আমাদের হাতে এখন সব। তোমার মরণ-বাঁচনও! এর জন্যে যতই অস্থিরতা হোক সমাজের ক্ষমতাবানদের কিছু এসে যায় না।

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট। 
chiroranjan@gmail.com