আর কতো কাল নিশ্চুপ রইবে ভারত

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

আর কতো কাল নিশ্চুপ রইবে ভারত

মঞ্জুরুল আলম পান্না ২:৫৯ অপরাহ্ণ, জুন ০২, ২০১৮

আর কতো কাল নিশ্চুপ রইবে ভারত

তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা যে বাংলাদেশেকে বুঝিয়ে দেয় উচিত তা ভারতের বিশ্লেষকরাও শুরু থেকেই বলে আসছেন। এর প্রমান পাওয়া যায় বাংলাদেশ-ভারতের শীর্ষ পর্যায়ের যে কোন বৈঠককে নিয়ে সে দেশের গণ্যমাধ্যমের সরব আলোচনায়। বিশ্বভারতীতে বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন উপলক্ষে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর একই মঞ্চে উঠার অনেক আগে থেকে এবারও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের পাশাপাশি ভারতের গণমাধ্যমেরও এ বিষয়ে আগ্রহ এবং বিশ্লেষনের কমতি ছিল না।

সেই যে ২০১১ সালে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মমমোহন সিং-এর সফরকে কেন্দ্র করে তিস্তা চুক্তির আশা জেগেছিল নব উদ্যমে, তারপর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর, এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের সফর, পরবর্তীতে গেল বছরে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পর এবার তাঁর পশ্চিমবঙ্গ সফর।

সবকিছুতেই সবকিছু ছাপিয়ে রাজনীতি এবং গণমাধ্যমে আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তিস্তা চুক্তি। কিন্তু দুই দেশের দুই কেন্দ্রীয় সরকারের বর্তমান আয়ুষ্কাল প্রায় শেষের পথে হওয়ায় তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে বলে ধরে নেয়া যায়। চুক্তিটি সম্পাদনের জন্য গত প্রায় এক দশকে শেখ হাসিনা সরকারের সদিচ্ছা এবং চেষ্টার কমতি না থাকলেও কুটনৈতিক তৎপরতা বেশ দূর্বল ছিল, এ কথা নি:সন্দেহে বলতে পারি।

ভারতের সংবাদ মাধ্যম এনডিটিভি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, ‘শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবন উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের দুই দেশের (বাংলাদেশ ও ভারত) মধ্যে বহু সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিছু সমস্যা এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে, তবে আমি সেসব বিষয় তুলে এই সুন্দর অনুষ্ঠানকে ম্লান করতে চাই না।’

শেখ হাসিনার ওই বক্তব্যকে কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেই বার্তা দেওয়ার একটি দারুণ উদাহরণ হিসেবে মন্তব্য করেছে এনডিটিভি। সংবাদ মাধ্যমটি বলছে, ‘তিস্তা শব্দটি উচ্চারণ না করেও তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুটি তুলেছেন শেখ হাসিনা’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই বক্তব্য রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার দূরদর্শীতাকেই তুলে ধরে। বিবিসি বলছে, ‘বৈঠক শেষে মমতা ব্যানার্জি গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার তিস্তা পানি-বণ্টন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে আলোচনার বিষয়বস্তু তিনি এখনই প্রকাশ করবেন না বলে জানান।

ভারত আর বাংলাদেশের কয়েকটি সূত্র থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে তিস্তার পানি-বণ্টন নিয়ে মমতা ব্যানার্জি আগে যে অনড় অবস্থানে ছিলেন, এখন সেই বরফ আস্তে আস্তে গলতে শুরু করেছে’। বিবিসি তার নিজস্ব বিশ্লেষনে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও তার নির্ভরযোগ্য ভিত্তি এখনও মেলেনি। তবে তিস্তা চুক্তি বিষয়ে শেখ হাসিনাঅনেকখানি দৃঢ় কুটনৈতিক ভাষা ব্যবহার করলেও রোহিঙ্গা ইস্যুতের ভারতের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা চেয়েছেন সরাসরি। বলেছেন, ‘আমাদের দুই দেশকে অবশ্যই মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বলতে হবে।’

তবে বঙ্গবন্ধু কন্যার একটি মন্তব্য আমাদেরকে তিস্তার পানি চুক্তি, দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতিসহ অমিমাংসিত অনেক বিষয়ে আমাদের খানিকটা কষ্ট দেয় বৈকি। আনন্দবাজার পত্রিকা বলেছে, ‘দিয়েছেন অনেক, প্রতিদানে এবার ভারতের সহযোগিতা চান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধনের পর সেখানেই মোদির সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তাঁর সরকার উত্তর-পূর্বের জঙ্গিদের দেশছাড়া করেছে, ট্রানজিট দিয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বরাবর দিল্লির পাশে থেকেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের বছরে এবার তাই ভারতের সহযোগিতা চায়’।

যে কথাটি এতোদিন এদেশের মানুষের মুখে মুখে ছিল, আজ তা আমাদের সরকার প্রধানের মুখে উঠে এল “ভারতকে বাংলাদেশ দিয়েছে অনেক”। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দপ্তরের এক সূত্রের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, ‘হাসিনার বার্তা- মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে সরাতে, বাংলাদেশকে ফের পাকিস্তান বানানোর চক্রান্ত চলছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে পশ্চিমে আর পুবে দুই দিকেই পাকিস্তান নিয়ে ঘর করতে হবে ভারতকে। তাই ভারতের উচিত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারই যাতে ক্ষমতায় ফেরে, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা’।

এদেশকে নিয়ে পাকিস্তানী প্রেতাত্মাদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই একথা সত্য। তবে ভারতকে অনেক কিছু দেয়ার প্রতিদানে শুধু নির্বাচনে সহযোগিতা চাওয়াটা আমাদের জন্য অনেকটা অস্বস্তির বলে মনে করি। জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবাদ রুখতে ভারতের সহযোগিতার প্রত্যাশার পাশাপাশি ভারতের কাছ থেকে আমাদের অন্যান্য হিস্যার জোড়ালো দাবিটাই বরং প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। প্রতিদান চাওয়ার ভাষাটা এমন হলে তা হত আরও বেশী সন্মানের, এদেশের সব মহলের কাছে আরও বেশী গ্রহণযোগ্য।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হওয়ার দাবি করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। কলকাতায় বঙ্গবন্ধু ভবন হবে’। বাংলাদেশ ভবন হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর নামেও সেখানে ভবন হোক আর তার মাধ্যমে গবেষণামূলক অনেক কাজ এগিয়ে যাক সেটা আমরা সবাই চাই। তবে শুধু ভবন হলেই চলবে না। সেই ভবনে আলো বাতাস চলাচলের জায়গা রাখতে হবে। অন্যথায় সেই ভবনে টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। এক দেশের ওপর আর এক দেশের গভীর আস্থা এবং বিশ্বাসই হল সেই আলো আর বাতাস। তার জন্য দরকার দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোর সমাধানের বাস্তবমুখী উদ্যোগ, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের গভীর দৃষ্টান্ত স্থাপন।

তবেই এক সাথে থাকা যাবে হাতে হাত ধরে। কিন্তু শান্তি নিকেতনে মোদির নিরবতা ভারতের প্রতি বাংলাদেশের আস্থাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বৈকি। ‘২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্য শেখ হাসিনার। এই লক্ষ্য অর্জনে তাঁকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা করবে ভারত।’ এমন কথা মোদি বাবু মুখে যতই বলুন তা কেবল তার সৌজন্যমূলক বক্তব্য বলেই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়।

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
monjurpanna777@gmail.com