এপ্রিলের লড়াই : ইতিহাসের অন্য আলো

ঢাকা, সোমবার, ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৭ শ্রাবণ ১৪২৫

এপ্রিলের লড়াই : ইতিহাসের অন্য আলো

শুভ কিবরিয়া ১:৩৪ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৬, ২০১৮

print
এপ্রিলের লড়াই : ইতিহাসের অন্য আলো

আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বয়ান যখন আমরা পড়ি তখন মার্চ –এর ইতিহাসের ওপরেই উজ্জ্বলতম আলো ফেলতে পছন্দ করেন আমাদের রাজনীতিকরা। সেটার একটা বড় কারণ হয়তো রাষ্ট্রক্ষমতা। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা আসীন আছেন বা থেকেছের তারা পছন্দ করেন এই সময়ের গৌরবকেই। এক অজানা কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী ইতিহাস কোন এক সোঁদা গন্ধে দায়সারাভাবেই উল্লিখিত হয়।

সেটা শাসকসম্প্রদায়ের দুর্বলতা। কেননা , ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরে যা ঘটেছে তা এ জাতির কথিত হাজার বছরের ইতিহাসে ঘটেনি। রাজনীতি, রণনীতি, কূটনীতিসহ সমরনীতিতে এক অসামান্য ভূমিকা রাখেন তখনকার রাজনৈতিক নেতৃত্ব।

বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁরই নামে পরিচালিত সরকার যে রাজনৈতিক জনযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন, তা সমকালিন ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। একটা নির্বাচিত রাজনৈতিক দলকে স্বাভাবিক ক্ষমতায় আসীন হতে না দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়ে পাকিস্তানি সামরিক চক্র যে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সাফল্য ছিনিয়ে আনার সময়টা বাঙালির জাতির এক অনন্যসাধারণ বিজয়ের কাহিনী।

সেই বিজয়ের পথ খুব সরল ছিল না। আঞ্চলিক রাজনীতির চাপ , আন্তর্জাতিক রাজনীতির ষড়যন্ত্র , অভ্যন্তরীণ বিবাদ-বিভেদ-মতানৈক্য, ক্ষমতার দ্বন্দ সবই ছিল এই বিজয়ের পথে বাধা। তবুও বিজয় এসেছে দুই ফ্রন্টে অভাবনীয়ভাবে। এক. বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে। দুই. পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত অবস্থায় স্বাধীন দেশে ফিরে এসেছেন।

এই অভাবনীয় সাফল্যের রাজনৈতিক ভিত্তি প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের এপ্রিলে সরকার গঠনের মাধ্যমে। ১০ এপ্রিল ঘোষিত হয় ‘ স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র’ বা ‘ স্বাধীনতার আদেশ ঘোষণা’। যাকে আমরা ‘ প্রক্লেমেশন অফ ইন্ডপেন্ডেস’ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য পোষণ করি।

০২.
‘স্বাধীন বাংলাদেশের বীর ভাই- বোনেরা

বাংলাদেশের সাড়ে সাত-কোটি মুক্তিপাগল গণ-মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সরকারের পক্ষ থেকে আমি আপনাদেরকে আমার সংগ্রামী অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি তাদের যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে গিয়ে তাদের মূল্যবান জীবন আহুতি দিয়েছেন। যতদিন বাংলার আকাশে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা রইবে, যতদিন বাংলার মাটিতে মানুষ থাকবে , ততদিন মাতৃভূমির স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামের বীর শহীদদের অমর স্মৃতি বাঙ্গালির মানসপটে চির অম্লান থাকবে।’[১]

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউন এবং পাকিস্তানি হানাদারবাহিনীর গণহত্যার বিভীষিকার পর ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে এই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বেতার ভাষণ। বঙ্বন্ধু তখন পাকিস্তানের কারগারে বন্দী। ভারতে আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামীলীগের হাইকমান্ড। শুরু হয়ে গেছে বাংলাদেশে মানুষের সশস্ত্র প্রতিরোধ। কিন্তু সাংগঠনিকভাবে , রাজনৈতিকভাবে নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এই ছিল তাজউদ্দীন আহমদের বরাতে প্রথম বেতার ভাষণ। ভাষণটি সুদীর্ঘ এবং প্রতিরোধের কাহিনী বিবৃত হয়েছে এই ভাষণে।

‘অবশেষে আওয়ামীলীগের নেতৃগোষ্ঠীর মধ্য থেকে প্রথম কারও কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায় ১১ এপ্রিল, পাকিস্তানের হত্যা-অভিযান শুরু হওয়ার দীর্ঘ ১৭ দিন পর। ওই দিন সন্ধ্যায় তাজউদ্দীন আহমদের বক্তৃতাটি শোনা যায় ভারতের আকাশবাণী বেতার কেন্দ্র থেকে। জানা হয় যে, আগের দিনই এক গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে বক্তৃতাটি প্রচারিত হয়েছে। তখনকার ভীতিকর পরিবেশে নিচু স্বরে রেডিও বাজানোও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

সেই পরিবেশে বেতার ভাষণ একটু দীর্ঘ হলেও কোনো রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর বা ফাঁকা প্রতিশ্রুতি তাতে ছিল না। যোগাযোগবিহীন এই অবরুদ্ধ নগরের বাইরে সারা দেশে এই আড়াই সপ্তাহে ঘটনা যেভাবে এগিয়ে গেছে –যা আমরা দেখিনি –ভাষণটিতে ছিল তারই চমকপ্রদ বিবরণ। দেশবাসীকে তিনি জানালেন, পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞ শুরু হওয়ার পর বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর মানুষেরা দেশের সর্বত্র স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার লক্ষ্য অর্জিত হতে চলেছে বিগত দুই সপ্তাহে জেগে ওঠা সেই প্রতিরোধকে সংগঠিত করার মধ্য দিয়েই।[২]

০৩.
সরকার গঠনের এই চেহারা প্রকাশ্য হয়ে ওঠে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের মাটিতে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে ‘বাংলাদেশের প্রথম সরকার’-এর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এই দুরুহ যাত্রাপথের এক সংক্ষিপ্ত বয়ান আছে তাজউদ্দীন আহমদের নিজের জবানিতে।

’১০ এপ্রিল ১৯৭১। সরকার গঠনের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত সম্বলিত আমার বিবৃতি রাতে বেতারযোগে প্রচারিত হয়।

১১ এপ্রিল ১৯৭১। আকাশবাণী কর্তৃপক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত আকাশবাণী থেকে পুনঃপ্রচার করে।

এদিকে ময়মনসিংহের তুরা এলাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলামের খোঁজ পেলাম। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে সেদিনই রাত ৮টায় আগরতলায় গেলাম। আগরতলায় খন্দকার মোশতাক আহমদ, কর্ণেল এম এ জি ওসমানীসহ অন্যান্য আরও কয়েকজন আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দকে পেলাম।

আগরতলায় এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হোল চুয়াডাঙ্গায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রীপরিষদের সদস্যরা ১৪ এপ্রিল প্রকাশ্যে শপথগ্রহণ করবেন। সেখানেই (চুয়াডাঙ্গাতেই) রাজধানী স্থাপন করে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাজকর্ম পরিচালনা করা হবে। আমি ঠিক করলাম এ রাজধানীর নাম হবে মুজিবনগর।

কিন্তু আমাদের এক সহকর্মীর অসাবধানতার জন্য সেই সিদ্ধান্ত গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে যায়। ফলে পাকিস্তান বাহিনী চুয়াডাঙ্গার সেই নির্দিষ্ট স্থানে প্রবল বোমাবর্ষণ করে। পরে আবার খুব গোপনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় চুয়াডাঙ্গার পার্শ্ববর্তী মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে।

এই বৈদ্যনাথতলার আম্রকুঞ্জে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ শত শত দেশি-বিদেশি সাংবাদিক এবং হাজার জনতার সামনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীসভার সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বক্তৃতা দেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তারপর আমি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বক্তৃতা করি। দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেই।’ [৩]

০৪.
১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে আরেকটি সুদীর্ঘ বক্তৃতা রাখেন। এটিকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ‘সরকারি ভাষ্য’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি নিজেই। তিনি বলেন, ‘ বাংলাদেশ এখন যুদ্ধে লিপ্ত। পাকিস্তানের ঔপনিবেশবাদি নিপীড়নের বিরুদ্ধে জাতীয় স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন ছাড়া আমাদের হাতে আর কোন বিকল্প নেই।’

তিনি তাঁর কথা শেষ করেন এই বলে যে, ‘ বিশ্ববাসির কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম। বিশ্বের আর কোন জাতি আমদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোন জাতি আমাদের চেয়ে কঠোরতম সংগ্রাম করেনি, অধিকতর ত্যাগ স্বীকার করেনি। জয়বাংলা।’

০৫.
১১ এপ্রিল ও ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ তাজউদ্দীন আহমদের এই দুটি বক্তৃতা ছিল আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক সূচনাকালের এক অসাধারণ দলিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে পরিচালিত অনেক কূট বিতর্কের অবসান আছে এই দুই বক্তৃতায়। বিশেষ করে ১১ এপ্রিলের বেতার ভাষণটি ছিল অনন্য।

এই ভাষণটি সম্পর্কে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সুখ্যাত মঈদুল হাসান তাঁর ‘উপধারা একাত্তর মার্চ-এপ্রিল’ বইয়ে লিখেছেন,‘ তাজউদ্দীনের বেতার ভাষণের পরদিন থেকে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীর মুখে মুখে প্রচার পেতে শুরু করে, সত্যিই ঢাকার বাইরে অধিকাংশ জায়গায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিদ্রোহী বাঙালি সেনাবাহিনী, রাইফেলস, পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনী সে যুদ্ধের পুরোভাগে রয়েছে।’

ইতিহাসের এসব আলোকিত ঘটনার বয়ান আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক শক্তির পরিচয় বহন করে। দুর্যোগে-দুর্ভোগে, দুর্বিপাকেও কিভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায় এসব তার সফলতম নিদর্শন। এই সফলতার ইতিহাস বেশি করে আলোচিত হলে ইতিহাসে প্রকৃত শক্তিমান মানুষদের সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞানতা সুজ্ঞানে পরিণত হবে। সেটা দেশের রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রনৈতিক স্বাস্থ্যকেও পরিপুষ্ট করবে।

তথ্যসূত্র:

[১] বাংলাদেশবাসীর উদ্দেশ্যে: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ ,স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এপ্রিল ১১, ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত, তথ্যসূত্র-তাজউদ্দীন আহমদ-ইতিহাসের পাতা থেকে।]

[২]উপধারা একাত্তর মার্চ- এপ্রিল, মঈদুল হাসান,প্রথমা প্রকাশন, ডিসেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা ৪৪-৪৫]

[৩] তাজউদ্দীন আহমদের বয়ানে একাত্তরের ২৫ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল। বই- তাজউদ্দীন আহমদের চিঠি। প্রতিভাস, জুলাই ২০১৮, পৃষ্ঠা ২৫১-২৫২।]

শুভ কিবরিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
kibria34@gmail.com

 

 
মতান্তরে প্রকাশিত শুভ কিবরিয়া এর সব লেখা
 
.



আলোচিত সংবাদ