বৈশাখ নয়, ভয় মানুষের উপস্থিতি

ঢাকা, শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫

বৈশাখ নয়, ভয় মানুষের উপস্থিতি

সেলিম খান ২:২৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০১৮

বৈশাখ নয়, ভয় মানুষের উপস্থিতি

নতুনের আবাহনে পুরনোর চলে যাওয়া। তবে পুরনোর এই চলে যাওয়া শুধুই চলে যাওয়া নয়, বরং নতুনকে সে নিজের হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে করে যায় ঋদ্ধ। তাইতো আমরা বলছি, গেল বছরের যা কিছু মন্দ তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আর যা কিছু ভালো তাকে ভিত্তি ধরে আগামীটাকে আরও ভালো করবার প্রত্যয়ে শুরু হোক নতুন বছর।

পহেলা বৈশাখ বরণের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাঙালির যাপিতজীবনে যোগ হলো আরেকটি নতুন বছর। নতুন আগামী। নতুন সম্ভাবনা। সেইসঙ্গে নতুন সমস্যা নতুন সংকটও বটে। এমন ‘হ্যাঁ’ আর ‘না’-এর মিশেলে এবারের নতুন বছরটি দেশের মানুষের কাছে ভোটের বছরও বটে। আর্থ-রাজনৈতিক বিবেচনায় যেখানে শঙ্কার মাত্রাটাও অনেক বেশি। যদিও এমন সহিংসশঙ্কা বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন কিছু নয়। শাসকশ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা সংহতকরণে সৃষ্ট এমন অনেক সহিংসশঙ্কার বাস্তবায়ন বাঙালি অনেকবারই দেখেছে।

এসবকে ধারণ করেই এদেশের মানুষ পেছনে ফেলেছে যা কিছু জীর্ণ, যা কিছু মন্দ, যা কিছু বিরুদ্ধতা। এগিয়ে নিয়ে গেছে নিজেকে। প্রত্যয়ী হয়েছে অগ্নিস্নানে নিজের সমাজ সভ্যতাকে শুদ্ধ করতে। অঙ্গীকার করেছে জীবন ও রাষ্ট্রের যত নেতিবাচকতাকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন সম্ভাবনার আলো জ্বালাতে। বৈরিতা আর বিরুদ্ধতাকে প্রত্যাখ্যান করে সকল সম্ভাবনা বাস্তবায়নের প্রত্যয় ও অঙ্গীকার নিয়ে বাঙালি আবারও বরণ করল আরও একটি নতুন বাংলা বছর।

তবে কখন কীভাবে বৈশাখ মাসেই এই নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়েছিল তা জানা না গেলেও এই বাংলায় প্রথম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই বাংলা নববর্ষের উৎসবকে ভিন্ন তাৎপর্য ও নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপন করেন। তাঁর এই স্বতন্ত্র উপস্থাপনায় মানবমৈত্রীর গভীরতর দ্যোতনায় বৈশাখের এ অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে সর্বসম্প্রদায়ের সম্প্রীতি ও ঐক্যচেতনার প্রতীক।

ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে বাঙালি জাতির এক সর্বজনীন মহান উৎসব। সকল বাঙালির মিলনমেলা। কৌম, গোত্র বা সম্প্রদায়ের আঞ্চলিক ক্রিয়াকরণধর্মী (Ritualistic) আঞ্চলিক নববর্ষ উৎসব-আচারের জায়গায় গড়ে উঠতে থাকে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালির ঐতিহ্যভিত্তিক নতুন এক জাতীয় দিবস : বাংলা নববর্ষ, বাঙালির নববর্ষ।

এরইমধ্যে বাঙালি বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানরা স্বাগত জানায় পাকিস্তান নামের অদ্ভুত এক রাষ্ট্রকাঠামো। তবে এই রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজের যাবতীয় স্বার্থসংঘাত বুঝতে খুব বেশি সময় নেয়নি এদেশের মানুষ। তাইতো আমরা দেখি নবউদ্ভূত শিক্ষিত নগরবাসী ধর্মভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যেও তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নানা গোষ্ঠীর আচার-অনুষ্ঠান, ক্রিয়াকরণকে (Rituals) আঁধারে জাতীয়  বিন্যস্ত করে নতুন এক সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক জাতিগঠনমূলক কর্মকাণ্ডে প্রয়াসী হয়।

কিন্তু শুরু থেকেই নানাভাবে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণকারী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক এবং পূর্ববাংলায় তার অনুসারীরা বাঙালির সমন্বিত সংস্কৃতির উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করেছে। একে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে নানা কৌশলে। কারণ এর মধ্যে তারা দ্বিজাতিতত্ত্বের মৃত্যুবীজের অঙ্কুরোদগম লক্ষ করেছে। তাই এর বিরুদ্ধে শুরু করেছে বাঙালিকে জাতিগত নিপীড়ন তার আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কোচ্ছেদ করে দেওয়ার কূটকৌশল। এই ধারাতেই বাধা এসেছে বাঙালির নববর্ষ উদযাপনেও।

এমনি বাদ-প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালের পূর্ববাংলার সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগ উৎখাত হয়ে যাওয়ার পরই বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করেন যুক্তফ্রন্ট সরকার ও তার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক। বলা হয়ে থাকে এ কে ফজলুল হকের এই ঘোষণা বাঙালির জাতিগঠন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশনা হিসেবে কাজ করেছিল। আর সে বছরই বিপুল উৎসাহে বাঙালি তার নববর্ষ উদযাপন করে।

এভাবেই বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নবজাগৃতির উৎসমুখ খুলে যাওয়ায় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ৯২-ক ধারা জারি করে স্বৈরশাসন চালু করে। বিপুলহারে গ্রেপ্তার করা হয় রাজনৈতিক কর্মী, এমনকি সংস্কৃতিক্ষেত্রের প্রগতিশীল সব কর্মীদের। ফলে সংস্কৃতির মুক্তধারার যে উৎসমুখটি খুলে গিয়েছিল তা আবারও রুদ্ধ হয়ে পড়ে। ১৯৫৮-এ আইয়ুবের সামরিক শাসন জারি হওয়ায় মুক্তবুদ্ধির চর্চা, গণমুখী সংস্কৃতির অনুশীলন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এরইমধ্যে ১৯৬১ সালে ছাত্রলীগ ‘স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান’ শিরোনামে একটি গোপন লিফলেট প্রচার করে। ১৯৬২ সালে চার ছাত্রনেতার নেতৃত্বে স্বাধীনতার নিউক্লিয়াস গঠন, এই বছরেই ‘দেশ ও কৃষ্টি’ বইয়ে বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ও ছাত্রদের শিক্ষা আন্দোলন সামরিক স্বৈরতন্ত্রের ওপর তীব্র আঘাত হানতে থাকে এবং বাঙালির এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন তার রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী ও স্বাধিকার আন্দোলনে রূপ নেয়। এই সময়ের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’ এক নতুন ও নবদিকনির্দেশক স্লোগান হিসেবে আবির্ভূত হয়। বাঙালিত্বের চেতনার তীব্র চাপে সে বছর (১৯৬৪) প্রাদেশিক সরকার বাংলা নববর্ষে ছুটি ঘোষণা করে। সেদিন ঢাকার বিভিন্ন নববর্ষ অনুষ্ঠানে অভূতপূর্ব জনসমাগম হয়।

এরপর বাংলা নববর্ষকে জাতীয় উৎসবে রূপ দিয়ে ১৯৬৭ সালে রমনার অশ্বত্থমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে শুরু হয় বর্ষবরণের জাতীয় আয়োজন। সেই থেকে এই আয়োজন হয়ে ওঠে বাঙালির আনন্দ উদযাপন, আত্মপরিচয় সন্ধান আর মানবতা প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়।

স্বাধীনতার পর পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন জাতীয় উৎসবের স্বীকৃতি পায় ১৯৭২ সালেই। বলা হয়ে থাকে, বাঙালির একক থেকে সামষ্টিক হয়ে উঠবার মতো যেসব আয়োজন রয়েছে তার মধ্যে বাংলা নববর্ষ উদযাপন অন্যতম। যার রয়েছে সর্বজনীনতা, রয়েছে আসাম্প্রদায়িক চরিত্র, রয়েছে অন্যায়-অন্যায্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়ার কার্যকর সব উপাদান।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, তবে স্বাধীনতার অব্যবহিত পর থেকেই উল্টোপথে হাঁটতে থাকা বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্রটিতে সুকৌশলে জায়গা করে নিতে থাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরুদ্ধ সব বিষয়-আশয়। আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আদর্শিক এমন পরিবর্তন প্রভাবিত করে দেশের আবহমান সংস্কৃতি ও যাপিতজীবনের আচার-আয়োজনকেও। যার ফল হিসেবে আমরা দেখি ২০০১ সালে রমনা অশ্বত্থতলে আয়োজিত ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, যশোরে উদীচীর আয়োজনে বোমা হামলা ও ময়মনসিংহে সিনেমা হলে বোমা হামলার মতো ঘটনা।

এসবের পেছনে যে শুধু বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিরুদ্ধতাই ছিল তা নয়। প্রকৃত অর্থে এর পেছনে যে বিষয়টি কাজ করেছে তা হলো, দেশের মানুষের সামষ্টিক উপস্থিতিতে শাসকশ্রেণির ভীতি। যদিও শাসকশ্রেণির একটি অংশ যারা কিনা বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির ধারক দাবিদার তারা এইসব হামলার জন্য সাম্প্রদায়িক উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকেই দায়ী করে আসছে। যাদের পরিচিত করানো হচ্ছে জঙ্গি হিসেবে। তবে তাদের এমন দাবির যথার্থতাও রয়েছে বৈকি। কারণ মানুষের সামষ্টিক উপস্থিতিতে ভীত শাসকরা তাদের শোষণ-শাসন জারি রাখার স্বার্থেই বিশ্বজুড়েই উগ্র ধর্মান্ধ গোষ্ঠীকে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও যার বাইরে নয়।

মানুষের সামষ্টিক বা যূথবদ্ধ উপস্থিতি ঠেকাতে এমন হামলা, প্রাণক্ষয় ও ভীতি সঞ্চারের মতো কার্যক্রম যদি প্রত্যক্ষ পথপদ্ধতি হয় তাহলে এর একটি পরোক্ষ উপায়ও রয়েছে বৈকি। যে পরোক্ষ পথপদ্ধতির উপস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি বর্তমান ক্ষমতাসীন শাসকদের মধ্যে।

গেল কয়েক বছর ধরেই, দেশের মানুষের সামষ্টিক বা যূথবদ্ধ উপস্থিতি ঘটে এমন যে কোনো আয়োজনেই ঘটছে নানান অপ্রীতিকর ঘটনা। কখনো লাঞ্ছিত হচ্ছেন নারী। কখনো বা ভিড়ের চাপে ঘটছে হতাহতের ঘটনা। আবার কখনো ধর্মীয় সংস্কৃতির ধুয়া তুলে বাঙালির নানান উৎসব-পার্বণকে নাকচ করবার প্রয়াসও চলছে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে টার্গেট করা হচ্ছে এই ভূখণ্ডের আবহমান ও ঐতিহ্যিক প্রামাণ্যগুলোকেই। চেষ্টা চলছে ইসলামের নামে বাংলা নববর্ষ উদযাপন, মঙ্গল শোভাযাত্রা, বাঙালির হাজার বছরের বিভিন্ন আচার আয়োজনসমূহকে হিন্দুয়ানি আখ্যা দিয়ে সেগুলোকে নাকচ করবার।

একথা অস্বীকার করবার জো নেই যে, গেল চার দশক ধরে রাষ্ট্রিক পৃষ্ঠপোষকতায় জায়গা করে নেওয়া বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনাবিরুদ্ধ এই শক্তির অবস্থান এখন অনেকটাই সংহত। আগের থেকে অনেক বেশি চৌকস, অনেক বেশি সংহত এই শক্তি এখন মানুষের সামষ্টিক বা যূথবদ্ধ শক্তির উপস্থিতি রুখতে বেছে নিয়েছে পরোক্ষ সব পথপদ্ধতি।

যার অংশ হিসেবে বর্তমান শাসকশ্রেণির প্রতিনিধিত্বকারী সরকারসংশ্লিষ্টরা নিরাপত্তার অজুহাতে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে মানুষের যূথবদ্ধ হওয়ার যে কোনো প্রয়াসকে। তা সে উৎসব-পার্বণই হোক আর আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আয়োজনই হোক। সবখানেই নিয়ন্ত্রণ আর দমনে বেছে নেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কাকে।

এরই অংশ হিসেবে বরাবরের মতো এবারেও জনগণকে পহেলা বৈশাখে বিকাল পাঁচটার মধ্যে বাড়ি ফিরতে বলেছেন জননিরাপত্তা (?) ও জনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করবার দায়িত্বে নিয়োজিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাড়িতে গিয়ে কী করতে হবে তাও তিনি বলে দিয়েছেন। কিন্তু সংবিধানমতো জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক ও যাপিতজীবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার দায়িত্ব খোদ রাষ্ট্রের। যেজন্য জনগণের টাকায় রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী। 

তাছাড়া উৎসব-পার্বণ তো বটেই, যে কোনো মতপ্রকাশের জন্য সভা-সমাবেশ করবার সাংবিধানিক অধিকার এদেশের মানুষ অর্জন করেছে ত্রিশ লাখ স্বজনের প্রাণ আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। যা আজ হরণ করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শাসকশ্রেণির পক্ষে রাষ্ট্রক্ষমতা সংহত রাখতে নিরাপত্তার নামে মানুষকে উৎসব-পার্বণ এমনকি যে কোনো সভা-সমাবেশে একসঙ্গে মিলতে না দেওয়া সরকারের স্বেচ্ছাচারকেই প্রমাণ করে। যা কিনা এ দেশের মানুষ ও তার হাজার বছরের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বর্তমান শাসকশ্রেণির ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতি বাস্তবায়নের সুদূরপ্রসারী এক পরিকল্পনা!

কৃতজ্ঞতা : শামসুজ্জামান খান, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি।             

সেলিম খান : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।
khoborjibi@gmail.com