শিক্ষামন্ত্রির সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকার রহস্য কী?

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

শিক্ষামন্ত্রির সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকার রহস্য কী?

এখলাসুর রহমান ৩:৩১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১০, ২০১৮

শিক্ষামন্ত্রির সবকিছুর ঊর্ধ্বে থাকার রহস্য কী?

প্রশ্নপত্র যে ফাঁস হয়েছে তা গাঁও গেরামের মানুষও জানে। কেবল জানে না শিক্ষামন্ত্রনালয়। তাই তারা প্রশ্ন ফাঁসের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। বিদেশে প্রশ্ন ফাঁস হলে মন্ত্রী দায়ী হয়। দায় স্বীকার করে মন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও ঘটে।কিন্তু বাংলাদেশ ব্যতিক্রম। এখানে অলিগলি,পথঘাট প্রশ্নপত্রে সয়লাব হয়ে গেলেও মন্ত্রীর কোন দায় নেই।সংসদে ও রাজপথে মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবী উঠলেও মন্ত্রীত্ব রক্ষায় কোন সমস্যা নেই। খাদ্যমন্ত্রী এড.কামরুল ইসলাম বলেছেন,প্রশ্ন ফাঁস হলেও যারা ভাল ছাত্র তাদের কোন ক্ষতি হবেনা।

যারা লেখাপড়া করবে তারাই কেবল ভাল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবে। তাই কোমলমতি ছেলেমেয়েরা, তোমরা মনোযোগ সহকারে লেখাপড়া করবে,জাতি তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে'। মন্ত্রী মহোদয়ের কথার সাথে সুর মিলিয়ে এখন যদি কেউ বলে যারা ভাল ভালই থাকবে ইয়াবা,হিরোইন,মদ,গাঁজা ও জুয়া কিছুই করতে পারবেনা। সুতরাং এগুলোও চলুক।এদের সাথে থেকেই ভাল থাকার চেষ্টা করতে হবে।এমন যদি কেউ বলে তাদের বলাটা কি অযৌক্তিক হবে তখন?

শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের দুর্নীতি,অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা দুর্নীতির অভিযোগে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন। তার সাথের লোকটা এত এত দুর্নীতি করে চলছে তা মন্ত্রী ধরতে পারেন নি। সারাদেশের কর্মকর্তা,কর্মচারীদের দুর্নীতির খবর কিভাবে রাখবেন তিনি? এমন ব্যর্থতার দায়েও বুঝি তিনি দায়ী হন না! এখন বলা হচ্ছে মন্ত্রী,সচিব প্রশ্ন ফাঁস করেনা।সুতরাং তাদের পদত্যাগের প্রশ্ন কেন?

তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্ণর আতিউর রহমান কে কেন পদত্যাগ করতে হল?

তিনি কি রিজার্ভ চুরি করেছিলেন?১৯৫৬ সালে ভারতের রেল মন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পদত্যাগ করলেন। কারন তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন মাহবুব নগরের এক রেল দূর্ঘটনায় ১১২ জন মানুষ মারা গেল।তিনি এর দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করলেন।কিন্তু কেন? এই রেলগাড়িটা কি তিনি চালিয়েছিলেন?

২০১৪ সালে দক্ষিন কোরিয়ার শিক্ষামন্ত্রী হুয়া-ইয়া-উয়ে প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন। কিন্তু কেন?এই প্রশ্নপত্র কি তিনি ছাপিয়েছিলেন? টেলিভিশনে দেশবাসীর  উদ্দেশে তিনি বলেন, আমি ক্ষমা চাইছি।আমি মানছি, প্রশ্নপত্র তৈরীর প্রক্রিয়াকে আরও মজবুত করতে হবে।কোস্টারিকায় যাত্রী বোঝাই বাসের চালক গতি হারালে দূর্ঘটনা ঘটে। এতে ৫ জনের প্রাণহানি ঘটে।এই দূর্ঘটনার দায় নিয়ে পদত্যাগ করেন দেশটির পরিবহন মন্ত্রী কার্লা গঞ্জালেস। কিন্তু কেন? এই গাড়িটির ড্রাইভার কি তিনি ছিলেন?

দূর্ঘটনা অসাবধানতা বশত হয়। এটা কারও ইচ্ছাতে হয়না।দূর্ঘটনার চেয়ে প্রশ্ন ফাঁস গুরুতর অপরাধ। এটা যারা করে জেনেশুনেই করে। যে দূর্ঘটনা ঘটায় এতে সে কোন আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্ত হয় না। বরং তার জীবনেরও ঝুঁকি ঘটে। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের সাথে যারা জড়িত তারা এর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা পায়। মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব এসব অনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করা। বিনিময়ে জনগণ তাঁকে দিচ্ছে বাড়ি,গাড়ি ও মাসিক বেতন ভাতা।

সংশ্লিষ্ঠ মন্ত্রনালয়ের অনিয়ম-দুর্নীতি যদি দুদক ও পুলিশকেই দেখতে হয়। তাহলে মন্ত্রীর আর কী ভূমিকা থাকে?

প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের জামাতা ইমরান এইচ সরকার তার ফেসবুকে লেখেন, মাননীয় প্রধান মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে জানতে চাইলেন মাত্র ১/২ ঘন্টা আগে প্রশ্নফাঁস হলে এমন মেধাবী কে আছে যে উত্তর খুঁজে বের করে পড়ে, উত্তর লিখে আসবে? এত কঠিন প্রশ্নের উত্তর কি রুম ভর্তি আমাদের শ্রদ্ধেয় সাংবাদিকদের পক্ষে দেয়া সম্ভব?

অবশ্য কেন সম্ভব নয় সেই বাস্তবতাটাও আমাদের অজানা নয়। কেউই প্রধান মন্ত্রীকে বলতে পারলেন না, উত্তর খুঁজে বের করার মত এই কষ্ট টুকু এখন আর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের করতে হয় না। কেননা যারা প্রশ্ন ফাঁস করেন তারা উত্তর পত্র সহই বিলি করেন।ফলে কাউকে আর কষ্ট করে উত্তর খুঁজে মেধাবী হবার চেষ্টা করতে হয় না।'

ইমরান এইচ সরকার প্রধান মন্ত্রীর সমালোচনা করলেন কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের ব্যাপারে কিছুই বললেন না। এই প্রশ্ন ফাঁস ও প্রশ্নের উত্তর ফাঁসে শিক্ষামন্ত্রীর দায় আছে কি নেই তা স্পষ্ঠ করে বললে জাতি উপকৃত হতো। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ কেন সকল দায়ের উর্ব্ধে?নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নাও শিক্ষামন্ত্রীর সমালোচকদের কটাক্ষ করলেন।

তিনি বললেন, মৎস্য কন্যার মত অর্ধেক মাছের মত অর্ধেক মানুষের মত এইরকম একটি বিরোধী দলের নেতা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবী করেছেন।

আমি শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদকে ভাল করে চিনি। তিনি একজন ভাল মানুষ।এখনও পর্যন্ত তার নামে বড় কোন, ঘুষ দুর্নীতির কথা আমি শুনি নি। 'সারাদেশের মানুষ জানে শিক্ষাবিভাগের ঘুষ দুর্নীতির খবর। মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা গ্রেফতার হয়ে সকল সংবাদ মাধ্যমের শিরোণাম হয়েছেন। কিন্তু মাহমুদুর রহমান মান্না তা  শুনেন নি! শিক্ষামন্ত্রী নাহিদকে সব দায়ের উর্ব্ধে রাখার রহস্য কী?

ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ওমর ফারুক তালুকদার দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হলে রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মন্ত্রীত্ব চলে যায়। তার ইচ্ছে থাকা স্বত্ত্বেও মন্ত্রীত্বে বহাল থাকতে পারলেন না তিনি।রেল মন্ত্রীর দায়িত্ব কেড়ে নিয়ে তাকে করা হল দপ্তরবিহীন মন্ত্রী। তখন কিন্তু সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের পদত্যাগের দাবীতে সংসদ কিংবা রাজপথে দাবী ওঠেনি।সারাদেশের মানুষ তখন সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের অসহায়ত্ব দেখেছে।

কিন্তু বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এতকিছুর পরেও দাপটের সাথেই মন্ত্রীসভায় আছেন। তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন মন্ত্রীসভার সকল সদস্যদের।ঘুষের পক্ষে এই প্রথম সাফাই গাইলেন তিনি। এখন যদি কেউ বলে, সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের মরণোত্তর অপসারনের ঘোষনা প্রত্যাহার করে নেয়া হোক, তা কি বাহুল্য হয়?আরও প্রশ্ন জাগে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের সবকিছুর উর্ব্ধে থাকার রহস্য কী?

এখলাসুর রহমান : লেখক ও কলামিস্ট।