একটি বাঘ এলো বাঘ এলো গল্প...

ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫

একটি বাঘ এলো বাঘ এলো গল্প...

রেজানুর রহমান ৫:০২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮

print
একটি বাঘ এলো বাঘ এলো গল্প...

সমস্যা থাকলে তা সমাধানের পথও আছে। সংকট সৃষ্টি হলে সংকট থেকে উত্তরণেরও প্রক্রিয়া আছে। পথ আর প্রক্রিয়া এক সূত্রে গাথা। যাহা বাহান্ন তাহাই তিপ্পান্ন। ভাববেন না আমি বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত বিতর্ক ৫৭ আর ৩২ ধারার কথা বলছি। কথা বলছি এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে। এই দেশে পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়।

কাজেই বিষয়টি নিয়ে অবাক হওয়ার কোনো যক্তি নেই। তবে হ্যাঁ, প্রশ্ন ফাঁসের ধরণ ও পরীক্ষার স্তর নিয়ে কথা বলা জরুরি হয়ে পড়েছে। অতীতকালে বড় ভাই-বোনের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হতো। অর্থাৎ এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হতো। এই দুটি পরীক্ষায় নকলের মহোৎসব হতো। এখন ছোটদের পরীক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁস হয়। এটাকে হয়তো গণতান্ত্রিক অধিকারের সাথেও তুলনা করতে চাইবেন কেউ কেউ। বড়দের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হলে ছোটদের পরীক্ষা কি দোষ করলো?

ছোটদের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস হলে বরং তারা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবে। প্রস্তুতিটা কি রকম? কষ্ট করে পড়তে হবে না। পরীক্ষার আগে অর্থ খরচ করলেই প্রশ্নপত্র পাওয়া যাবে। কাজেই নো-চিন্তা ডু ফূতি!

কিন্তু বাস্তবতা হলো মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাকে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না।

শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ ঘোষনা দিয়েছেন, প্রশ্নফাঁস হলেই পরীক্ষা বাতিল হবে। শিক্ষা মন্ত্রীর এই ঘোষনায় পরীক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ভয় আর আতংক কাজ করছে। ১লা ফেব্রুয়ারি এসএসসি পলীক্ষার প্রথম দিনে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিশেষ রিপোর্ট প্রচার করা হয়। একটি টেলিভিশনের রিপোর্টে একজন পরীক্ষার্থীর অসহায় আর্তি শুনে যারপর নাই অস্থির হয়ে উঠলাম।

তার দু’চোখ ছল ছল। কষ্ট লুকাতে গিয়ে ব্যর্থ হচ্ছে। ক্যামেরার লেন্সে চোখ রেখে বলল আমি একজন পরীক্ষার্থী। আমার জন্য আপনাদের কি করা উচিৎ?

পরীক্ষার আগে আমি তো সুন্দর পরিবেশ চাইতেই পারি। অথচ আপনারা আমাকে, আমাদেরকে পরীক্ষার হলে আধাঘণ্টার আগে আসতে বললেন। না হলে নাকি হলে ঢুকতে দিবেন না। ঢাকা শহরে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার জন্য কি পরিমান যানজটের যন্ত্রনা পোহাতে হয় তা সকলেই জানেন। হাঁফাতে হাঁফাতে পরীক্ষার হলে ঢুকলাম। তখনই চারদিকে ফিসফাস শুরু। পরীক্ষার প্রশ্ন নাকি ফাঁস হয়েছে!

সাথে সাথে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষনা মনে পড়ে গেল। তিনি বলেছেন, পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হলেই পরীক্ষা বাতিল হবে। আপনারাই বলুন এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষার হলে স্থির হয়ে বসে থাকা সম্ভব? মনের ভিতরে শুধুই সংশয় পরীক্ষা কি তাহলে বাতিল হবে? আবার পরীক্ষা দিতে আসতে হবে?

কোমলমতি এই ছাত্রের বক্তব্য শুনে মনে হলো সে কিছু কঠিন কথা খুবই সহজ ভাবে বলেছে। শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষনার মানে কি? প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই পরীক্ষা বাতিল হবে! কেন এই সিদ্ধান্ত? প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় কি পরীক্ষার্থীরা জড়িত থাকেন? নিশ্চয়ই না। তাহলে প্রশ্নফাঁসের দায় পরীক্ষার্থীদেরকে নিতে হবে কেন?

সবিনয়ে কিছু প্রশ্ন রাখতে চাই। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ এক নাগারে প্রায় ৯বছর ধরে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বে আছেন। এতদিনেও কি তিনি বুঝে উঠতে পারলেন না বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের কারণ কি? কারা প্রশ্ন ফাঁস করে? কিভাবে এই সংকট থেকে উত্তোরণ সম্ভব?

ধরা যাক, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ধরা পড়লো। পরীক্ষা বাতিল হলো। নতুন করে পরীক্ষা গ্রহণের তারিখও নির্ধারণ করা হলো। এবারও যে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কি? কোমল মতি ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আবারও পরীক্ষার হলে বসাব? আবারও কি তারা অস্থিরতা নিয়েই পরীক্ষার হলে বসবে?

দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, দেশে বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে অব্যাহত গতিতে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটলেও কোন ঘটনারই অপরাধী ধরা পড়ে নাই অথবা অপরাধীদের সনাক্ত করা যায় নাই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অপরাধী সনাক্ত হলেও তার বা তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত মূলক কোনো শাস্তির ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়নি। এটাতো সহজ ব্যাকরণের মতোই যে কোনো অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর দৃষ্টান্ত মূলক সাজা না হলে অপরাধ ও অপরাধী বেপরোয়া হয়ে ওঠে।

দেশের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ও বিভিন্ন দূর্নীতির ঘটনায় দৃষ্টান্ত মূলক সাজা না হওয়ার কারণে অপরাধী চক্র দিনে দিনে সাহসী হয়ে উঠছে। কাজেই সর্বাগ্রে প্রয়োজন প্রশ্নফাসের ঘটনায় অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রদান করা। যাতে অন্য কেউ যেন আর এই ঘৃন্য কাজ করতে সাহস না পায়।
লেখাটি যখন লিখছিলাম তখন অনেক প্রশ্নই মনের ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিলো।

দেশের একটি শ্রেষ্ঠ দৈনিকে ভয়ংকর একটি খবর বেরিয়েছে। ‘নিজের দেশে ভবিষ্যৎ নেই’ শিরোনামে পত্রিকাটির মূল খবরে উল্লেখ করা হয়েছে দেশের শতকরা ৮১.৯ ভাগ তরুণ-তরুণী দেশে থাকতে চায় না। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানী ও অস্ট্রোলিয়ায় যাওয়ার ব্যাপারে তারা অতিমাত্রায় আগ্রহী। ভাবুন তো একবার, প্রশ্নফাঁস উপসর্গে শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান যে অবস্থা তাতে কি আমরা জোর দিয়ে বলার সাহস রাখি তরুণরাই জাতির ভবিষ্যৎ?

আর যদি ধরেই নেই তরুণরাই জাতির ভবিষ্যৎ কিন্তু তারা তো দেশে থাকতে ইচ্ছুক নয়। দেশের ভবিষ্যৎটা কাকে নিয়ে গড়বো আমরা?

অনেকেই হয়তো বর্তমান সংকটকে মোটেই গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ভাবছেন বিদেশে যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায়? তাদের জন্য সেই ‘বাঘ এলো’ গল্পটা আবার স্মরণ করে দিতে চাই। অনেক পুরনো গল্প। তবুও নতুন করে বলছি। এক রাখাল মাঠে গরু চড়ায়। প্রায়ই সে অন্যকে বোকা বানানোর জন্য ‘বাঘ এলো বাঘ এলো’ বলে চিৎকার দেয়।

গ্রামবাসী তাকে বাঁচানোর জন্য ছুটে আসে। এসে দেখে রাখাল তাদের সাথে মজা করছে। রাখাল এভাবে প্রায়শই গ্রামবাসীকে নিয়ে রসিকতা করে। একদিন সত্যি সত্যি বাঘ আসে। রাখাল নিজেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণ পনে চিৎকার করতে থাকে। কিন্তু সেদিন গ্রামবাসীরা আর তাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসে না। বাঘের কামড়ে প্রাণ হারায় রাখাল।

গল্পটার মাজেজা নিশ্চয়ই ধরতে পেরেছেন। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে এই দেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তরুণদের ভূমিকাই অগ্রগণ্য। কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সহ নানা ঘটনায় তারা অব্যাহত ভাবে নিগৃহীত হচ্ছে। আশাহত হচ্ছে কেউ কেউ। এর পরিণাম কিন্তু দেশের জন্য মোটেই ভালো হবে না...।

রেজানুর রহমান : কথাসাহিত্যিক, পরিচালক, সাংবাদিক।
rezanur.alo@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত রেজানুর রহমান এর সব লেখা
 
.


আলোচিত সংবাদ