শিল্পের অক্লান্ত এক কারিগর

ঢাকা, বুধবার, ১৫ আগস্ট ২০১৮ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫

শ্রদ্ধাঞ্জলি

শিল্পের অক্লান্ত এক কারিগর

চিররঞ্জন সরকার ৮:১৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৫, ২০১৮

print
শিল্পের অক্লান্ত এক কারিগর

না ফেরার দেশে চলে গেলেন ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-খ্যাত কথাসাহিত্যিক শওকত আলী। বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। বাংলা কথাসাহিত্যে এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব শওকত আলী। কথাসাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই রয়েছে তার পদচারণা তবে গল্প আর উপন্যাসে তিনি এঁকেছেন জীবনের ঘনিষ্ঠ চিত্র। তুলে ধরেছেন শোষিত, বঞ্চিত দরিদ্র-খেটে-খাওয়া মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা আর বেঁচে থাকার নিরন্তর সংগ্রামের চিত্র। বাংলার প্রায় লুপ্ত ও বিস্মৃত ইতিসাসে তাঁর সৃজনশীল নিরীক্ষাধর্মী অনুসন্ধান আমাদের সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ আর কথাসাহিত্যে সংযোজন করেছে নতুন মাত্রা।

শওকত আলী পেশায় সাংবাদিকতা এবং শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সারাজীবন। তিনি বাংলাদেশের ষাটের দশকের গল্প-উপন্যাস বা কথাসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তার জন্ম পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে। কলেজ জীবন শেষ করার আগেই ১৯৫২ শওকত আলীর পরিবার বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা শহর দিনাজপুরে চলে আসে। কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত থাকার অভিযোগে ১৯৫৪ সালে তিনি গ্রেফতার হন এবং জেল থেকে ছাড়া পেয়ে ১৯৫৫ সালে বিএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে এমএ পাশ করেন।

ছাত্র থাকাকালে শওকত আলীর পেশাগত জীবনের শুরু হয় দৈনিক মিল্লাতের নিউজ ডেস্ক থেকে। ১৯৫৮ সালে এমএ পাসের পর শওকত আলী দিনাজপুরের একটি স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৫৯ সালের শেষের দিকে ঠাকুরগাঁও কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে অধ্যাপনা পেশায় যুক্ত হন; এরপর তিনি ১৯৬২ সালে জগন্নাথ কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনা করেন।

১৯৬৪ সালে প্রকাশিত ‘পিঙ্গল আকাশ’ উপন্যাসের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যজগতে তাঁর আবির্ভাব ঘটে। তিনি গল্প, কবিতা, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও শেষ পর্যন্ত উপন্যাসকেই স্বীয় চিন্তা-চেতনা প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। জীবনকে নিবিড়ভাবে দেখা, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিচিত্র জীবনপ্রবাহকে বাংলা সাহিত্যে শিল্প-রূপ দিয়েছেন তিনি।

শওকত আলী ৩২টি উপন্যাস লিখেছেন। প্রতিটি উপন্যাসেই তিনি গভীর জীবন-দর্শনের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তবু বারবার আলোচনায় এসেছে ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর কথা। বিজ্ঞজনেরা মনে করেন, এই একটি উপন্যাস লিখলেও শওকত আলী সাহিত্যের নক্ষত্ররূপে বিবেচিত হতেন। পাঁচটি গল্পগ্রন্থ, চারটি শিশুতোষ রচনা ও একটি প্রবন্ধগ্রন্থ রয়েছে তাঁর।

ছোটগল্পে মৌলিক অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। ১৯৯০ সালে রাষ্ট্রীয় একুশে পদকে ভূষিত হন। ১৯৮০ সালে শ্রেষ্ঠ উপন্যাস হিসেবে দক্ষিণায়নের দিন-এর জন্য ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস যাত্রার জন্য ১৯৭৭ সালে বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার পান।

বাংলাদেশে নিজের স্থান করে নিতে গিয়ে শওকত আলীকে নানাবিধ সংকট-সংঘাতের মুখোমুখী হতে হয়েছে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে পশ্চিম পাকিস্তানের নব্য ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ-নির্যাতনের তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ ঐক্য গড়ে তুলে সশস্ত্র একটি সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালে বিশ্বমানচিত্রে নিজের স্থান করে নিলেও অভ্যন্তরে ছিল নানাবিধ সমস্যা-সংকট।

স্বাধীনতা-উত্তরকালে ঢাকাকেন্দ্রিক নাগরিক জীবন ও নগরায়ণের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়েছেন শওকত আলী। বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি সেই সময়কেই যেন মূর্ত করে তুলেছেন।

একাত্তর-পরবর্তী বাঙালির জীবনকে দেখতে গিয়ে শওকত আলী বাঙালি জাতি-গোষ্ঠীর পেছনের ইতিহাসকেও তুলে ধরেছেন ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে। এ উপন্যাসে তিনি বাংলায় মুসলিম আগমন, সেন রাজাদের অত্যাচার-নির্যাতনে অতিষ্ঠ সমাজের দরিদ্র শ্রেণির অবস্থা পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন। বিশেষ করে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ওপর সেনদের নির্যাতনের প্রায়ান্ধকার ইতিহাসকে আলোয় নিয়ে এসেছেন।

একই সঙ্গে দেখিয়েছেন, সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জেগে ওঠা এবং শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানোর চিত্রও। শওকত আলী ইতিহাসাশ্রয়ী এ উপন্যাসে স্পষ্টভাবেই দেখিয়েছেন যে, বাঙালি জাতিকে প্রাচীনকালে তো বটেই মধ্যযুগে এবং আধুনিক যুগেও তার ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম করতে হয়েছে।

শওকত আলী এই উপন্যাস সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘ইতিহাসের পালাবদল, শাসকের পালাবদলের ধারায় সাধারণ মানুষের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, সাধারণ মানুষের জীবন প্রেম ও অনুভব এবং ৮০০ বছর আগের ইতিহাস ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে তুলে ধরা হয়েছে। উপন্যাসের নামকরণটাও সে চিন্তা থেকেই এসেছে। প্রদোষকাল মানে দিন এবং রাত্রির মাঝামাঝি সময়। হিন্দু শাসন চলে যাচ্ছে মুসলমান শাসকেরা আসছে এই মাঝামাঝি সময়ে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা তারা কী ভাবছেন?

আমার চিন্তাটা এ কারণেই এসেছিল যে, এখানকার সাধারণ মানুষ ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজ্যশাসনের যে প্রক্রিয়াটা ছিল, তা তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছেন। দক্ষিণ এশিয়ার এই প্রান্তে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা এতবেশি হওয়ার কারণ কী? এটা আমার একটা প্রশ্ন ছিল। আমি অনেককে প্রশ্ন করেছি কিন্তু কোন সঠিক উত্তর পাইনি।...

যবনরা আসছে শুনে অতবড় রাজা লক্ষণ সেন রান্না করা খাবার না খেয়েই নৌকা নিয়ে পালিয়ে গেলেন। এ ঘটনাগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছিল এ উপাদানগুলো নিয়ে একটা উপন্যাস লিখলে কেমন হয়। আমি ইসলাম প্রচার করতে যাচ্ছি না। কী হয়েছিল না হয়েছিল সেসবের কোনো সিদ্ধান্তও আমি দিইনি। এর মধ্যে প্রেমের ব্যাপারটা আছে। প্রেমিক-প্রেমিকারা যে সমাজ পরিবর্তনের জন্য উত্থান-পতন, গৃহযুদ্ধ সবকিছুতেই অংশ নিয়েছে। প্রেমিকাকে ফেলে প্রেমিক যুদ্ধে যাচ্ছে, সে কোন যুদ্ধে যাচ্ছে? কার জন্য যাচ্ছে? তার ধর্ম কী? একটি ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ পরিবর্তনের কথাই আমি বলতে চেয়েছি’’ (সাক্ষাৎকার, শিলালিপি)।

তাঁর এ উপন্যাসে আছে মানব মনের এক চিরন্তন প্রশ্ন-‘‘এই জীবন জীবনের জন্য যুদ্ধ এই শাসক শ্রেণি এই যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লড়াই আবার ক্ষমতা হারিয়ে কাপুরুষের মতো পলায়ন এই যে বারবার ভাঙ্গা-গড়া এর শেষ কোথায়? এই কি মানুষের জীবন? সুখ নেই, স্বস্তি নেই, গৃহ নেই, কেবল প্রাণ নিয়ে পলায়ন করতে হচ্ছে-এর শেষ কোথায়? এ জীবন কি যাপন করা যায়? বলো, কতদিন এভাবে চলবে?’’

উপন্যাসের এক চরিত্রের এই প্রশ্ন মানুষের অস্তিত্ব আর জীবনের সর্বজনীন এক প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

শওকত আলীর উপন্যাসের জগৎ নির্মিত হয়েছে মূলত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ঘিরে; তাঁদের জীবনের টানাপড়েন, জীবনবোধ, সংগ্রাম প্রভৃতি তার উপন্যাসের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হিসেবে উঠে এসেছে। নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত সমাজই মূলত তার উপন্যাসে ঘুরেফিরে এসেছে। একই সময় তার রচনায় সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ও স্থান করে নিয়েছে।

শওকত আলীর প্রথম উপন্যাস ‘পিঙ্গল আকাশ’-এ নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির নগ্ন, নীতিহীনতা, রুচির বিকৃতি, কামনার করাল গ্রাসে পরিণামে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী-চরিত্র মঞ্জুর দীর্ঘশ্বাস, রক্তরক্ষণ ও আত্মহনন শিল্পিত হয়ে উঠেছে। এই মধ্যবিত্ত জীবনেরই নানামুখী দিকের প্রতিফলন ঘটেছে ‘অপেক্ষা’, ‘গন্তব্যে অতঃপর’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’, ‘যেতে চাই’, ‘পতন’, ‘বাসর ও মধুচন্দ্রিমা’, ‘জননী ও জাতিকা’, ‘জোড়-বিজোড়’, ‘শেষ বিকেলের রোদ’ প্রভৃতি উপন্যাসে।

এই অর্থে শওকত আলী নাগরিক মধ্যবিত্তের কথাকার হিসেবে অনন্য। ‘উত্তরের খেপ’, ‘হিসাব-নিকাশ’, ‘ওয়ারিশ’, ‘দলিল’, ‘স্ববাসে প্রবাসে’ এবং ট্রিলজিতে (দক্ষিণায়নের দিন, কুলায় কালস্রোত, পূর্বরাত্রি পূর্বদিন) সাতচল্লিশের আগের রাজনৈতিক অবস্থা এবং দেশভাগের পর পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ, বঞ্চনা এবং বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্রও তুলে ধরেছেন অসামান্য দক্ষতায়।

এই ত্রয়ী উপন্যাস সর্ম্পকে শওকত আলী এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘‘ষাটের দশকের মানুষের মধ্যে চিন্তাভাবনার যে পরিবর্তন আসছে, সেটাই 'দক্ষিণায়নের দিন' যার মানে হচ্ছে শীতকাল আসছে। 'কুলায় কাল স্রোত' হচ্ছে পরিবর্তন যেখানে আঘাত করছে। আর 'পূর্বরাত্রি পূর্বদিন' হচ্ছে নতুন সময়টি আসার একেবারে আগের সময়টি। মূলত ষাটের দশকে আমাদের মধ্যবিত্ত এবং সমগ্র সমাজব্যবস্থায় একটা পরিবর্তন আসে। নতুন একটা চিন্তা-চেতনা দ্বারা আলোড়িত হয় পুরো সমাজ। ধ্যান-ধারণা চাল-চলন জীবনব্যবস্থায় একটা পরিবর্তনের সুর বেজে ওঠে। সেসবই উপন্যাসে আনতে চেয়েছি’’ ('মৃত্তিকালগ্ন মানুষ আজীবন আমাকে টেনেছে', ইত্তেফাক)।

ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়ে শওকত আলী সাহিত্য রচনা করেছেন। তাঁর প্রতিটি রচনায় রয়েছে এই ব্যক্তি অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। তাঁর জবানিতে: ‘‘জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার সময়ই শুনতে পাই, সারা দুনিয়াতে যুদ্ধ হচ্ছে আর দেখি রাতের বেলা ভূতের কান্নার মতো সাইরেন বাজছে আর সব বাতি নিভিয়ে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার করে ফেলা হচ্ছে সারা শহরটাকে। একদিন সত্যি সত্যি বোমা পড়ল কলকাতার কাছে আর তখন শুরু হলো পালাও পালাও রব। গাঁটরি-বোঁচকা নিয়ে মানুষ ছুটছে রেলস্টেশনের দিকে উদ্দেশ্য, গ্রামগঞ্জে, নয়তো মফস্বল শহরে ঠাঁই নেবে। ওই যুদ্ধ চলার সময়ই আবার লেগে গেল দুর্ভিক্ষ। রাস্তায় রাস্তায় কঙ্কালসার মানুষকে বসে নয়তো দাঁড়িয়ে ভিক্ষে চাইতে দেখা যেত। কাউকে কাউকে ডাস্টবিন থেকে পচা আর উচ্ছিষ্ট জিনিস তুলে নিয়ে খেতেও দেখা গেছে। বাইরে বেরোলেই মরা মানুষের লাশ চোখে পড়ত’’ (আমার লেখালেখি, প্রথম আলো)।

পাকিস্তান আমলে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতির ধারক যে অল্প কয়েকজন মানুষ ছিলেন, লেখক ছিলেন তাদের মধ্যে শওকত আলী অগ্রগণ্য। নিপীড়িত মানুষ বলতে আমরা যাদের বোঝাই, নিপীড়িত মানুষজনদের নিয়ে তো অনেকেই কল্পকাহিনি তৈরি করেন, কিন্তু জীবনের সঙ্গে যে ঘনিষ্ঠতা, জীবনকে চেনা, তাদের জীবনের স্বপ্ন, তাদের বেঁচে থাকার যে তাৎপর্য, সে ব্যপারে শওকত আলীর রচনা অনন্য।

শওকত আলী জীবনকে দেখেছেন নির্মোহভাবে। সে জীবনছবি আমাদের ইতিহাস, গরিব মানুষ, তাদের সংগ্রাম আর জীবন আকাঙ্ক্ষার। তাঁর লেখা কোনো বিচ্ছিন্নতা বোধে আক্রান্ত নয়, জীবনের বাইরে, জীবনের গল্পের বাইরে অথবা আখ্যানহীন কোনো কিছু তিনি আঁকতে চাননি। তিনি জীবন থেকে গল্প তুলে এনেছেন।

তাই তার গল্পে, তার সৃষ্টিতে যেমন আছে মানবিকতার পরাজয় ও বিভিন্ন প্রান্তিক মানুষ, তাদের জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণা-হাহাকার, নৈরাশ্য অন্ধকার-যেমন আছে, তেমনি আছে বিদ্রোহী-প্রতিবাদী মানুষ বিপ্লব, স্বপ্ন, জাগরণ আর মানুষের বিজয়ের গল্প। তিনি জীবনকে দেখেছেন এক অসাধারণ আলোয়। যে আলোর মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে দেশ, মাটি, মানুষ, মানুষের স্বপ্ন-বাস্তবতা।

তিনি বিশ্বাস করতেন জীবনে; আর তাই জীবনকেই শিল্প ভেবেছেন। জীবন আর শিল্পের এক অক্লান্ত কারিগর তিনি। তাঁর লেখা সম্পর্কে অনেক আলোচনা হওয়া দরকার। আলোচনার মধ্যদিয়ে তার চিন্তা-চেতনা উপলব্ধি করা দরকার। আমাদের সাহিত্য তার চিন্তার ধারা ভবিষ্যতে নতুন দিগন্তের দিকে যেতে পারে।
আমাদের সমাজে যাদের সম্মান পাওয়া উচিত নয়, তাদেরকে সম্মানিত করা হয়। প্রকৃতপক্ষে যাদের সম্মানিত করা উচিত, যারা অনুপ্রাণিত হলে জাতি উপকৃত হবে সেই মানুষদের সম্মানিত করা হয় না। শওকত আলীর প্রতি, তার লেখা ও চিন্তা নিয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল। সেটা কি আমরা করতে পেরেছি?

পরিশেষে এই ‘জীবনশিল্পী’ মানুষটির প্রতি রইল অনিঃশেষ শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্র:
গল্পকথা, শওকত আলী সংখ্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬
আমার লেখালেখি, শওকত আলী, প্রথম আলো, ২৯ মে ২০১৫
'মৃত্তিকালগ্ন মানুষ আজীবন আমাকে টেনেছে', ইত্তেফাক, ১ মার্চ, ২০১৩
শওকত আলীর সাক্ষাৎকার, শিলালিপি, ১৯ মে, ২০১৩

 
.

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ



আলোচিত সংবাদ