লিঙ্গবৈষম্য জোরদার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নারীকণ্ঠ: জাতিসংঘ

ঢাকা, ২৬ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

লিঙ্গবৈষম্য জোরদার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নারীকণ্ঠ: জাতিসংঘ

পরিবর্তন ডেস্ক ৪:৩০ অপরাহ্ণ, মে ২২, ২০১৯

লিঙ্গবৈষম্য জোরদার করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নারীকণ্ঠ: জাতিসংঘ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন বিভিন্ন ভয়েজ অ্যাসিসটেন্টগুলোয় নারী কণ্ঠস্বরের ব্যবহার ক্ষতিকর লিঙ্গ বৈষম্যকে স্থায়ী করে তুলছে বলে জানা গেছে জাতিসংঘের এক গবেষণায়।

এই নারী সাহায্যকারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যেন তারা গ্রাহকদের নির্দেশ শুনতে বাধ্য এবং তাদের পরিতৃপ্ত করতে অধীর থাকে।

এর মাধ্যমে মূলত নারীকে আজ্ঞাবহ বা অধীনস্থ ভাবার যে প্রচলিত ধারণা রয়েছে সেটাকেই আরও বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

একে বেশ উদ্বেগজনক হিসেবে মন্তব্য করেছেন গবেষকরা।

গ্রাহকদের তাচ্ছিল্য ও অসম্মানজনক কথার প্রতিক্রিয়ায় এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন নারী কণ্ঠ যেভাবে নিষ্প্রভ, কৈফিয়তমূলক, ক্ষমা প্রার্থনামূলক বা কথাটি এড়িয়ে যাওয়ার মতো করে জবাব দেয়, তাতেই এই বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়।

এ কারণে প্রযুক্তি নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের যন্ত্রের ডিফল্ট কণ্ঠ সহায়ক হিসেবে - এই নারী কণ্ঠ তৈরি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে গবেষণা প্রতিবেদনটি।

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠন ইউনেস্কোর গবেষণায় শিরোনাম করা হয়েছে যে, ‘যদি আমি পারতাম, আমি লজ্জায় লাল হতাম।’

এই লাইনটি ধার করা হয়েছে অ্যাপলের জনপ্রিয় কণ্ঠ সহায়ক সিরির কাছ থেকে।

গ্রাহকের যৌন উত্তেজক কথার প্রতিক্রিয়ায় সিরি এই জবাবটি দিয়েছিল।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘অ্যাপল ও আমাজনের মতো কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে পুরুষ প্রকৌশলী দল দ্বারা চলছে।’

সেখানে কর্মরত প্রকৌশলীরা তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন এআই সিস্টেমগুলোকে এমনভাবে তৈরি করেছে, যেন তাদের নারী কণ্ঠের ডিজিটাল সহায়কগুলো মৌখিক গালিগালাজকেও স্বাগত জানায়।

এসব কথার জবাবে তারা অনেক সময় প্রেমের ভান করে (ফ্লার্টেশন), যেমন, পারলে আমাকে ধর (ক্যাচ মি ইফ ইউ ক্যান)।

‘বেশিরভাগ ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট নারী কণ্ঠের হওয়ায় এটি ইঙ্গিত করে যে, নারীরা সাহায্য করতে বাধ্য/অনুগত, একটি বোতামের স্পর্শেই বা ‘হেই’ বা ‘ওকে’র মতো মৌখিক আদেশেই তাদের যেকোনো সময় পাওয়া যায়।

গ্রাহকের চাহিদামত আদেশ পালনের বাইরে এই নারী সহকারীর কোনো ক্ষমতা নেই।

এই নারীকণ্ঠ গ্রাহকের প্রতিটি নির্দেশকে সম্মান জানায় ও যেকোনো প্রশ্নের উত্তর দেয় সব ধরণের বৈরিতা উপেক্ষা করেই। - বলছে গবেষণা।

গবেষণায় বলা হয়েছে যে, এই বিষয়টি অনেক সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান লিঙ্গ বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।

কেননা এসব ভয়েজ অ্যাসিসটেন্টদের এমন ভাবা হয় যে সেই নারীরা তাদের আজ্ঞাবহ এবং যেকোনো খারাপ ব্যবহারের ব্যাপারে তারা সহনশীল।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যানালিস ধারণা করছে, ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ১০ কোটি স্মার্ট স্পিকার বিক্রি হয়েছিল - স্মার্ট স্পিকারে এমন হার্ডওয়্যার ব্যবহার করা হয় যেন গ্রাহকরা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে কথা বলতে পারেন।

গবেষণা সংস্থা গার্টনারের মতে, ২০২০ সালের মধ্যে কিছু মানুষ তাদের সঙ্গীদের চাইতে ভয়েস সহায়কগুলোর সাথে বেশি কথাবার্তা বলবে।

প্রতিবেদনটির মতে, ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টরা এখন প্রতি মাসে আনুমানিক একশ কোটি কাজ পরিচালনা করে এবং এসব সহায়কের একটি বড় অংশই নারী কণ্ঠের। যার মধ্যে চীনের প্রযুক্তিবিদদের দ্বারা ডিজাইন করা ডিভাইসও রয়েছে।

মাইক্রোসফটের ভিডিও গেম হালোতে সিনথেটিক বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন নারী সহায়ক ছিল, যার নাম ছিল কোর্টানা। এই কোর্টানা নিজেকে একজন বস্ত্রহীন ও ইন্দ্রিয় উদ্দীপক নারী হিসেবে উপস্থাপন করতো।

যদিও অ্যাপলের সিরি বলতে বোঝানো হয়েছে একজন ‘সুন্দরী নারী যিনি আপনাকে বিজয়ের পথে নেতৃত্ব দেবেন’। এদিকে গুগল সহকারীর নাম অনেকটা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ। তবে এর ডিফল্ট ভয়েস হিসেবে নারীকণ্ঠই দেয়া রয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে প্রযুক্তি ডেভেলপারদের আহ্বান জানানো হয়েছে যেন তারা ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে একটি নিরপেক্ষ লিঙ্গের যন্ত্র তৈরি করেন।

এবং এই কণ্ঠ সহায়কগুলোকে এমনভাবে প্রোগ্রামিং করেন যেন লিঙ্গভিত্তিক অপমানকে নিরুৎসাহিত করা যায়।

সেইসঙ্গে ব্যবহারকারীদের সাথে মিথস্ক্রিয়া শুরুর আগে এই প্রযুক্তিকে অ-মানব হিসাবে ঘোষণা করার জন্য ডেভেলপারদের আহ্বান জানানো হয়েছে।

ভাষাবিদ, প্রযুক্তিবিদ এবং শব্দ ডিজাইনারদের একটি দল, আসল কণ্ঠস্বর থেকে তৈরি একটি লিঙ্গহীন ডিজিটাল ভয়েজের ওপর পরীক্ষা নিরীক্ষা করছে। যেটার নাম রাখা হয়েছে ‘কিউ’।

ডিজিটাল দক্ষতায় যে বিশ্বব্যাপী বড় ধরণের জেন্ডার গ্যাপ বা নারী-পুরুষ বৈষম্য রয়ে গেছে সেই বিষয়টিও গবেষণা প্রতিবেদনে গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়।

বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নারী ও মেয়েদের মধ্যে ইন্টারনেটের ব্যবহার তুলনামূলক কম দেখা যায়।

এছাড়া ইউরোপের মেয়েদের আইসিটির ওপর পড়াশোনা করার হারও কমে এসেছে।

রিপোর্ট অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির গবেষণার সঙ্গে নারীদের সংশ্লিষ্টতা ছিল মাত্র ১২%।

এমআর/এএসটি

 

উত্তর আমেরিকা: আরও পড়ুন

আরও