মহাসড়কে বন্ধ পরিবহন, সীমাহীন ভোগান্তি (ভিডিও)

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

মহাসড়কে বন্ধ পরিবহন, সীমাহীন ভোগান্তি (ভিডিও)

পরিবর্তন প্রতিবেদক: ১২:৪২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০১৯

সড়ক পরিবহন আইন বাস্তবায়নের প্রতিবাদ জানিয়ে তা সংশোধনের দাবিতে রাস্তায় নেমে এসেছেন পরিবহন শ্রমিকরা। খুলনা বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় দুইদিন ধরে চলছে এই অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা।

মঙ্গলবার সকাল থেকে খুলনা, নড়াইল, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও পরিবহন মালিক কিংবা শ্রমিক নেতাদের কেউ ধর্মঘট ডাকার বিষয়টি স্বীকার করেননি।

বহুল আলোচিত এ আইন ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ২২ অক্টোবর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ:

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে ঢাকা- ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে রেখেছে। এতে মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

শ্রমিকদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছেন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

মাওনা হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ দেলোয়ার হোসেন জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। আমরা পরিবহন শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা করছি।

সাতক্ষীরা থেকে ছাড়েনি কোন বাস:

সাতক্ষীরা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে মঙ্গলবার সকাল থেকে কোন বাস ছেড়ে যায়নি। বন্ধ রয়েছে অভ্যন্তরীণ রুটের সকল বাস চলাচলও।

যাত্রীবাহী বাস বন্ধ থাকলেও দুই একটি বিআরটিসি বাস চলাচল করতে দেখা গেছে। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন দূর-দূরান্তের যাত্রীরা। ইজিবাইক, মাহেন্দ্র, ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে যাতায়াত করছেন যাত্রীরা।

বাসচালক মিলন সরদার বলেন, নতুন আইন সংশোধন না হলে আমরা বাস চালাবো না। আইনে চালকদের এক তরফাভাবে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। যে জরিমানার বিধান করা হয়েছে সেগুলো চালকরা কখনো পুরণ করতে পারবে না। কেননা চালকরা গরীব মানুষ।

সাতক্ষীরা বাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান বলেন, নতুন আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত কোন শ্রমিক বাস চালাতে চায় না। কেন্দ্রীয় শ্রমিক ফেডারেশন থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে ধর্মঘটের কথা উল্লেখ নেই। তবে মৌখিক নির্দেশনায় শ্রমিকরা বাস চালানো বন্ধ রেখেছেন। ২১ ও ২২ নভেম্বর শ্রমিকদের নিয়ে কেন্দ্রীয় শ্রমিক ফেডারেশন মতবিনিময় করে সরকারের কাছে দাবি পেশ করবে।

শ্রমিক নেতা জাহিদুর রহমান আরও বলেন, সাতক্ষীরার অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে বাস চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি। তবে শ্রমিকরা বাস চালাবে না জানিয়ে দিচ্ছে। কতদিন বাস চলাচল বন্ধ থাকবে তার কোন সঠিক দিনক্ষণ জানাতে পারেননি তিনি।

সাতক্ষীরা বাস মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি সাইফুল করিম সাবু বলেন, শ্রমিকরা স্বপ্রণোদিত হয়ে ধর্মঘটে লিপ্ত হয়েছে। তারা নতুন আইনের আতঙ্কে বাস চালাতে চায় না। দুর্ঘটনা ঘটলে এক তরফাভাবে বাস চালক ও শ্রমিকদের কঠোর ব্যবস্থার বিধান করা হয়েছে নতুন আইনে। দুর্ঘটনা কারো একার দোষে হয়না, তবুও সব শাস্তি বাস চালক শ্রমিকদের। এটা শ্রমিকরা মানছে না।

তিনি বলেন, নতুন আইনের কিছু বিধান জামিন অযোগ্য ও ৫ লাখ টাকা জরিমানা সেগুলোর সংশোধন করা প্রয়োজন। এছাড়া ট্যাক্স-টোকেনের বিষয়ে শ্রমিকদের কোন অপত্তি নেই। সরকারের কাছ থেকে আইন সংশোধনের আশ্বাস পেলে শ্রমিকরা সড়কে ফিরে যাবে।

নড়াইলে ট্রাক চালকরাও ধর্মঘটে:

নতুন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংশোধনের দাবিতে নড়াইল-ঢাকা, নড়াইল-খুলনা, নড়াইল-যশোরসহ জেলার সকল রুটে দ্বিতীয় দিনের মত বাস ধর্মঘট চলছে। একই সাথে মঙ্গলবার থেকে ট্রাক চালকরাও ধর্মঘট শুরু করেছে।

বাস চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিকল্প যানবাহনে চলাচল করলেও যাত্রীদের দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া গুণতে হচ্ছে।

জানা গেছে, নতুন সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংশোধনের দাবিতে বাস শ্রমিকরা গত রোববার সন্ধ্যা থেকে কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই নড়াইল-যশোর, নড়াইল-খুলনাসহ কয়েকটি রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। পরেরদিন গত সোমবার থেকে অভ্যন্তরীণ সকল রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়ায় যাত্রীরা পড়েন চরম বিপাকে। জরুরী প্রয়োজনেও গন্তব্যে যেতে পারছেন না যাত্রীরা।

লোহাগড়া সরকারপাড়ার বাসিন্দা লাভলী বেগম বলেন, ‘আমি লোহাগড়া জনতা ব্যাংকে চাকরি করি। বাস ধর্মঘটের কথা জানতাম না। জরুরি কাজে খুলনা যাওয়ার জন্য একদিনের ছুটি নিয়েছি। কিন্তু এখন কিভাবে খুলনায় যাবো তা বুঝতে পারছি না।’

নড়াইল সরকারী ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্র আশিষ বিশ্বাস বলেন, ‘আমি জরুরি কাজে ঝিনাইদহ যাবো। কিন্তু বাস চলাচল না করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছি। এখন দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে ঝুকিপূর্ণভাবে ইজিবাইকে যশোর যেতে হবে। তারপর বিকল্প পদ্ধতিতে গন্তব্যে যেতে হবে।’

নড়াইল শহরের মহিষখোলার বাসিন্দা রমজান মোল্যা বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে ঢাকায় যাবো। কিন্তু বাস চলাচল বন্ধ হওয়ার কারনে যেতে পারলাম না। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে ভীষণ সমস্যায় পড়তে হবে।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের খুলনা বিভাগীয় কার্যকরী কমিটির সভাপতি ও নড়াইল জেলা বাস- মিনিবাস-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক মো. সাদেক আহম্মেদ খান বলেন, ‘২য় দিনের মত শ্রমিকরা গাড়ি চালানো বন্ধ রেখেছে। নতুন আইনের কিছু ধারা শিথিল করা না হলে শ্রমিকরা গাড়ি চালাবে না। আশা করি সরকার সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’

বেহাল অবস্থা অন্যান্য জেলায়ও:

ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহ থেকে যশোর, কুষ্টিয়া, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গা রুটসহ অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন চালকরা। বাস না পেয়ে যাত্রীরা ইজিবাইক ও মহাসড়কে চলাচল নিষিদ্ধ বিভিন্ন তিন চাকার যানবাহনে যাতায়াত করছেন। তবে স্থানীয় সব রুট বন্ধ থাকলেও ঢাকাসহ দূরপাল্লার পথে বাস ও ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহন চলাচল করতে দেখা গেছে।

রাজশাহী: জেলা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর রুটে বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। দু-একটি বাস ছাড়ার চেষ্টা করলেও শ্রমিকরা যাত্রীদের নামিয়ে দেয়। তবে ঢাকাগামী বাস রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাচ্ছে।

চুয়াডাঙ্গা: পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট কর্মসূচি পালন করছেন বাস শ্রমিকরা। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ ও দূরপাল্লার যাত্রীরা। অনেকে টার্মিনাল, বাসস্ট্যান্ড ও কাউন্টারগুলোতে এসে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে ফিরে যাচ্ছেন।

জেলা বাস-ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি এম. জেনারেল ইসলাম বলেন, নতুন সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে শ্রমিকদের আপত্তির বিষয়টি সমাধানে সরকার কোনো উদ্যোগ না নেয়ায় তারা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন। ধর্মঘট চলতে পারে অনির্দিষ্টকালের জন্য।

তবে জেলায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, ইজিবাইক ও নসিমন-করিমনসহ ছোট যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।

পিএসএস

 

জাতীয়: আরও পড়ুন

আরও