যৌন হয়রানির অভিযোগ আর্কাইভসের গবেষণা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

যৌন হয়রানির অভিযোগ আর্কাইভসের গবেষণা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

শাহাদাৎ স্বপন ৬:১৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৩১, ২০১৯

যৌন হয়রানির অভিযোগ আর্কাইভসের গবেষণা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে

আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়ার বিরুদ্ধে নিজ দফতরের অধস্তন পদে কর্মরত দুই নারী কর্মকর্তাকে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। ইতোমধ্যে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) কাছে তার বিরুদ্ধে ওই দুই নারী কর্মকর্তা লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন। এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটিও ঘটনার সত্যতা পেয়েছে বলে জানা গেছে।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরে নিয়োজিত দুই জুনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ইলিয়াস মিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে উপযুক্ত শাস্তির চেয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি লিখিত দরখাস্ত দেন।

দুই নারী কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগপত্রে বলা হয়, দীর্ঘদিন হতে আর্কাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তরে গবেষণা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া তাদের যৌন হয়রানি, অশ্লীল আচরণ এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করে উত্ত্যক্ত করে আসছেন। এক নারীর স্বামী থাকা-না থাকা নিয়ে গবেষণা কর্মকর্তা মো. ইলিয়াছ মিয়া বিভিন্ন কুরুচিপূর্ণ কথাবার্তা বলেন।

এছাড়া দাপ্তরিক কাজের কথা বলে তার রুমে ডেকে নিয়ে একজনের বিয়ে পরবর্তী সময়ে স্বামীকে নিয়ে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অশ্লীল কথাবার্তা বলেন বলেও অভিযোগ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগপত্র পাওয়ার পর তৎকালীন মহাপরিচালক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই কমিটির প্রধান ছিলেন অধিদপ্ততরের উপপরিচালক তাহমিনা আক্তার এবং সদস্য ছিলেন মাইক্রোফিল্ম অফিসার মো. মিজানুর রহমান। তারা বিষয়টি তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। 

এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে আর্কাইভস অধিদপ্তরের বর্তমান মহাপরিচালক ফরিদ আহমেদ ভূঁইয়া পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘হ্যাঁ, এই ধরনের একটা ঘটনা আছে। তৎকালীন ডিজির কাছে এক নারী কর্মকর্তার পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ করা হলে সেটা তদন্ত করে মন্ত্রণালয়কে ফরওয়ার্ড করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। পরে আর কোন নির্দেশনা আমরা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাইনি। পেলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যৌন হয়রানির শিকার সেই নারী কর্মকর্তা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘দেখুন মহিলা মানুষের বুক ফাটে, কিন্তু মুখ ফাটে না। আমি এই অভিযোগ প্রকাশ্যে তুলেছি অনেক পরে। যখন দেখলাম তার নোংরামী সীমা অতিক্রম করছে, তখন বাধ্য হয়েই এই লিখিত অভিযোগ করি।

তিনি বলেন, ‘আমি প্রথমে চিন্তা করি, সে (ইলিয়াস) আমার অফিসার, তার বিরুদ্ধে এমন লিখিত অভিযোগ করবো না। কিন্তু দিন দিন সহ্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল, এমনকি তার খারাপ আচরণের ধরণও পাল্টাচ্ছিল। ভাবলাম লজ্জা করে থাকলে হবে না। তখন আমি লিখিত অভিযোগ করতে বাধ্য হয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘লিখিত অভিযোগ করার আগে আমার সঙ্গে করা খারাপ আচরণের ব্যাখ্যা করেছি আমাদের অধিদপ্ততরের উপপরিচালক তহমিনা আক্তার ম্যাডামের সঙ্গে। সেতো মেয়ে মানুষ, ফলে প্রথমে তাকে বিষয়গুলো খুলে বলতে সুবিধা হয়েছে, এটা কমফোর্ট ফিল করেছি।’

‘আমি চাইছি, আমি এমন যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আর কোন মেয়ে কলিগ যাতে এমন নোংরামী আচরণের শিকার না হয়, সেজন্য আমি লিখিত অভিযোগ করি।’ যোগ করেন তিনি।

অভিযুক্তের গ্র্রামের বাড়ি শরিয়তপুর জেলায়। তার স্বামী মারা গেছে বছর তিনেক হলো। দুই সন্তান আর বাবা- মাকে নিয়ে ঢাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকেন তিনি।

অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘তাকে যৌন নির্যাতনকারী গবেষণা কর্মকর্তা ইলিয়াস সাহেব এখন তার পক্ষে কিছু লোককে কনভিন্স করে তার বিরুদ্ধে যাতে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় সেজন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মোহাম্মদ ইলিয়াছ মিয়া বলেন, ‘দেখুন এ বিষয়ে আমার আসলে কিছু বলার নেই। এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। আমি আমার অধস্তনদের কাজের বিষয়ে কোন ছাড় দিতাম না। তাই আক্রশের শিকার হয়েই তারা আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছে।’

একসঙ্গে আপনার অধস্তন দুই নারী কর্মকর্তা আপনার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করে কীভাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ থাকেন।

তিনি বলেন, আগের ডিজি স্যার আমাকে বলেছিলেন এটা এখানেই নিস্পত্তি হবে। এরপর তিনি আমাকে বললেন, তুমিতো ক্লাস ওয়ান অফিসার এজন্য এর সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে। তখন সেটা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত গড়ায়। এটা ভূল বোঝাবুঝি হয়েছে।

এ বিষয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-২ এর দায়িত্বে থাকা যুগ্মসচিব হাসনা জাহান খানম বলেন, এ ধরনের ঘটনা প্রমাণিত হলে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। ঐ কর্মকর্তার নিয়োগ বিধিতে যে শাস্তির কথা উল্লেখ আছে তাকে সেটাই ভোগ করতে হবে।

প্রশাসনে নারী সহকর্মীদের প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের এমন যৌন হয়রানির বিষয়ে বিভাগীয় শাস্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলাও তদন্ত অনুবিভাগের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মনির উদ্দিন পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, দেখুন এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তদন্ত করে যে সিদ্ধান্ত নেন সেটা বাস্তবায়ণের দায়িত্ব আমাদের। এ ধরণের অপরাধে চাকুরির বিধান অনুযায়ী চাকরি থেকে অব্যাহতিসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি হতে পারে।

এসএস

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও