ভোটার হালনাগাদ যুগোপযোগী, একমত নন নির্বাচন কমিশনাররা

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

ভোটার হালনাগাদ যুগোপযোগী, একমত নন নির্বাচন কমিশনাররা

মো. হুমায়ূন কবীর ৯:২৭ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

ভোটার হালনাগাদ যুগোপযোগী, একমত নন নির্বাচন কমিশনাররা

ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আর এ জন্য নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে নিবন্ধন ফরমে কী ধরনের পরিবর্তন, আইন-বিধিমালায় কী ধরনের সংশোধন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন প্রয়োজন সে বিষয়ে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের কাছে সুপারিশ চাওয়া হয়।

তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী কর্মশালায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহের চলমান প্রক্রিয়ায় একমত নন খোদ নির্বাচন কমিশনাররা।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সাল থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সেই তথ্য ডাটাবেজে সংরক্ষণ এবং সেই তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় পরিচয়পত্র দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমানে নাগরিকদের ১০ আঙুলের ছাপ ও চোখের আইরিশের প্রতিচ্ছবিও সংরক্ষণ করে রাখছে কমিশন।

সম্প্রতি ‘ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম যুগোপযোগীকরণ এবং ভোটার নিবন্ধন সংক্রান্ত ফরমসমূহ পুনর্বিন্যাসকরণ’ কর্মশালায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ না করে একস্থানে তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধন কাজ সম্পন্ন করার পক্ষে মত দেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী।

তিনি বলেন, নানা সময় তথ্য সংগ্রকারীরা হালনাগাদ কার্যক্রমের সময় বাড়ি বাড়ি যান না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তাছাড়া শিক্ষকরা সম্মানিত ব্যক্তি, তারা বাড়ি বাড়ি যেতেও চান না।

এছাড়া  প্রবাসী বাংলাদেশিদের যেভাবে অনলাইনের মাধ্যমে ভোটার করার প্রক্রিয়া চলছে, সেভাবে দেশে অবস্থান করা নাগরিকদেরকেও অনলাইনে ভোটার করার পক্ষে মত দেন তিনি।

ওই কর্মশালায় ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ না করার পক্ষে মত দেন নির্বাচন কমিশনার বেগম কবিতা খানমও।  তিনি নির্ভুল ভোটার তালিকার জন্য নতুন ভোটার করার ক্ষেত্রে অন্তত প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার (পিএসসি) সনদ কাজে লাগানো যায় কি না বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে বলে উল্লেখ করেন। এছাড়া তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম আরো সংক্ষিপ্ত করার পক্ষে মত দেন এই নির্বাচন কমিশনার।

তবে এ বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেন নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা মানে নতুন ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা, মৃত ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া এবং একজন ভোটারকে স্থানান্তরের সুযোগ দেয়া। বাড়ি বাড়ি না গিয়ে একস্থানে হালনাগাদ কার্যক্রম পরিচালনা করলে সাধারণভাবে নতুন ভোটাররা অন্তর্ভুক্ত হবেন ঠিকই কিন্তু তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তিদের নাম কর্তন কিভাবে করা হবে? তারা তো আর সেখানে এসে বলবে না যে আমি মারা গেছি তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেন। এছাড়া যে ব্যক্তি এক স্থানে ভোটার হওয়ার পর অন্যত্র চলে গেছেন, তিনি সেখানে এসে তথ্য দেবেন? তাই এ বিষয়ে সার্বিক সুবিধা ও অসুবিধার দিকগুলো বিবেচনায় নিয়ে ভোটার হালনাগাদকরণ কাজকে যুগপোযোগী করার বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হবে কিনা বা অনলাইনে ভোটার হওয়ার সুযোগ দেয়া হবে কিনা এ বিষয়ে কিছুই বলেননি  নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তিনি বলেন, মৃত ব্যক্তিদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে সর্বদা সচেষ্ট থাকা দরকার। নবাগতদের ভোটার তালিকায় যুক্ত করার জন্য প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

ভোটার তালিকার বর্তমান ব্যবস্থায় তথ্যসংগ্রহ ও বায়োমেট্রিক গ্রহণ কার্যক্রম এবং ভোটার তালিকা আইন ২০০৯ ও ভোটার তালিকা বিধিমালা ২০১২-এর অসঙ্গতি দূরীকরণ একসঙ্গে সম্পন্ন করার প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য নানাবিধ সংশোধন, সংযোজন ও পরিবর্তন অপরিহার্য। তাছাড়া ভোটার তালিকা হালনাগাদের পদ্ধতি যুগোপযোগী করার জন্য বিদ্যমান ফরমগুলো সহজতর করা আবশ্যক বলেও জানান তিনি।

কর্মশালায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা বলেন, মৃত ভোটার একটা সমস্যা। বৃটিশ আমলে একটা নিয়ম ছিল। কেউ মারা গেলে থানায় ভারবাল স্ট্যাটমেন্ট দিতে হতো। কোনো বাড়িতে কোনো বাচ্চা জন্ম নিলে বা মারা গেলে থানায় মৌখিক তথ্য দিতো। চকিদার গিয়ে বলত যে, ওই বাড়িতে অমুকের একটা সন্তান জন্ম নিয়েছে। কিংবা ওই গ্রামের ওই বাড়ি অমুক মৃত্যুবররণ করেছে। থানায় এখন সেটা বলা সম্ভব কিনা, তবে চকিদার থানা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে এ তথ্য দিতে পারে কি না ভাবা দরকার।

তিনি বলেন, ৪২ বছর বয়সের লোক ২৪, ২৪ বছর বয়সের লোক ৪২ হতে চায়। অনেকে বিয়ে পাস করার পর বলে পাসই করি নাই। নানা কারণে এটা করে থাকেন। এতে দেখা যায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের বয়সের পার্থক্য ৪-৫ বছর হয়ে যায়। প্রাইমারি পরীক্ষার সনদ দিলেও বয়স ঠিক করা সম্ভব।

একেবারে সঠিক বয়স দিয়ে, পিতা-মাতার নাম দিয়ে, ঠিকানা দিয়ে ভোটার তালিকা করার এখনো সময় বোধহয় আসেনি। আপনারা তবু চেষ্টা করছেন। বয়স ঠিক মত নেয়া একটি জটিল সমস্যা। এই সমস্যা আপনাদের মোকাবেল করতে পথ বের করতে হবে। সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। প্রস্তাবনা দেন, সব প্রস্তাবনাই যে বাস্তবায়ন করা যাবে এমনটাও না।

দুই দিনব্যাপী ওই কর্মশালায় ভোটার তালিকা হালনাগাদে  নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহে ভবিষ্যতে ‘ডিজিটাইজড’ কর্মপন্থা বের করার সুপারিশ করেছেন কর্মকর্তারা। সেক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ ও নিবন্ধন কাজ চলমান রেখে  এলাকাভিত্তিক ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালুর প্রস্তাবসহ একগুচ্ছ প্রস্তাব এসেছে বলে জানান জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) কর্মকর্তা স্কোয়াড্রন লিডার কাজী আশিকুজ্জামান।

২০০৭-২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরুর হয়। এরপর থেকে নতুন ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ, মৃতদের বাদ দেয়াসহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে হালনাগাদ কাজ চলে। ২০০৯, ২০১২, ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৭ সালে হালনাগাদ করা হয়।

বর্তমানে ১০ কোটি ৪২ লাখেরও বেশি ভোটার রয়েছে। একই সঙ্গে এবারের হালনাগাদে (১৫-১৮ বছর বয়সী) চার বছরের তথ্য সংগ্রহ চলছে।

এইচকে/এইচআর

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও