যে কারণে টার্গেটে পড়লেন সম্রাট!

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

যে কারণে টার্গেটে পড়লেন সম্রাট!

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ৪:৫৮ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৬, ২০১৯

যে কারণে টার্গেটে পড়লেন সম্রাট!

সম্রাট। বাংলাদেশের সবচে আলোচিত নাম। এক সময়ের ছাত্রনেতা থেকে যুবলীগের ‘শ্রেষ্ঠ সংগঠক’। কী না ছিল তার? টাকা, বাড়ি, গাড়ি, নারী ও হাজার হাজার নেতাকর্মী। এক রাজকীয় জীবন! আজ একা সেই সম্রাট। পতন হয়েছে তার সাম্রাজ্যের। ইতোমধ্যে তিনি র্যাবের জালে বন্দী।

বলছি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের কথা। ফেনী জেলার পরশুরামে মির্জানগর ইউনিয়নের পূর্ব সাহেবনগর গ্রামে তার জন্ম। গ্রাম ইউনিয়নের নামের সঙ্গে যেমন একটা রাজকীয় ভাব, তার সম্রাট নামেও তাই।

জীবনটাও গড়েছেন সেভাবে। কিন্তু নামের বড়াইয়ের মতো জীবনের এই সম্রাজ্যের এমন পতন হবে কে জানতো? বাবা ফয়েজ আহমেদ রাজউকের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ছিলেন। সে সুবাদে ঢাকায় বড় হয়েছেন সম্রাট।

সম্রাটের পরিবার

তিন ভাইয়ের মধ্যে মেঝো ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট। বড় ভাই বাদল চৌধুরী ঢাকায় সম্রাটের ক্যাসিনো ব্যবসা দেখাশোনা করেন। ছোটো ভাই রাশেদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন, মা বড় ভাইয়ের ঢাকার বাসায় থাকেন।

ব্যক্তিগত জীবনে সম্রাট দুই বিবাহ করেছেন। প্রথম স্ত্রী বাড্ডায় থাকেন। সে সংসারে তার এক মেয়ে। মেয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। দ্বিতীয় স্ত্রী শারমিন চৌধুরী মহাখালী ডিওএইচএসে থাকেন। সেখানেই থাকতেন সম্রাট। গত দুই বছর সেখানেও যান না। থাকেন কাকরাইলের ভূঁইয়া ম্যানশনের অফিসেই। দ্বিতীয় সংসারে সম্রাটের এক ছেলে সন্তান। তিনি মালয়েশিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুই স্ত্রীর একজনেরও বাসায় না গেলেও উভয় সংসারের যাবতীয় খরচ চালাতেন সম্রাট।

জানা গেছে, দেশে ক্যাসিনো সম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এশিয়ার সেরা জুয়াড়ী সম্রাট জুয়া খেলতেন সিঙ্গাপুরে। সেখানকার ক্যাসিনোতে বেশ জনপ্রিয় সম্রাট। সবার সঙ্গে সহজে মিশতে পারা ও টাকা ওড়ানোতে তার খ্যাতি আছে। দেশ-বিদেশে তিনি টাকা দিয়ে মানুষের সঙ্গে সখ্যতা রাখতেন।

রাজনীতিতে উত্থান

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ’৯০-এর দশকে রাজনীতিতে সম্রাটের পদচারণা। সেসময় ঢাকায় ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দৃশ্যপটে আসেন এই ইসমাইল চৌধুরী। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা- বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, পল্টন, কাকরাইলসহ রমনা জোনের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয় করতেন তিনি। বেশ সাহসী ইসমাইল সেসময় কারাবরণসহ নানা নির্যাতনের সম্মুখীন হন। তখনই ‘সম্রাট’ খ্যাতি পান এই ছাত্রনেতা।

এরপর থেকে রাজনীতিতে তার সাহসী পদচারণা। ’৯১ থেকে ’৯৬ বিএনপির সরকারে রাজধানী পিছঢালা পথে আন্দোলনের বারুদ জালিয়েছেন। বিনিময়ে অনেক মামলাও হয় তার বিরুদ্ধে। ’৯৬-এর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নানা সময়ে নিজের সাংগঠনকি দক্ষতা ও সাহসিকতায় বনে যান রাজধানীর প্রভাবশালী যুবলীগ নেতা। যুবলীগেও দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করে প্রথমে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক, পরে সভাপতি হন।

এরপরের ইতিহাস সবারই জানা। ঢাকার ‘সম্রাট’ ইসমাইল চৌধুরী। বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে সরকারের রাজপথে শক্ত অবস্থানের পেছনে তার অবদান স্বীকার করেন আওয়ামী লীগ ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের নেতারা।
যুবলীগের শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবেও সম্রাটকে স্বীকৃতি দিয়েছেন সংগঠনটির চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখাকে শ্রেষ্ঠ ইউনিটেরও স্বীকৃতি দিয়েছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজধানী ঢাকাতে সরকার দলীয় বড় বড় যেকোনো মিছিল ও সমাবেশে সম্রাটের সহস্রাধিক লোকের সমাগম থাকতো। সর্বশেষ আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশে লক্ষাধিক লোকের সমাগম করেন এই সম্রাট। সংগঠক হিসেবে দক্ষ এই সম্রাট তার কাকরাইলের অফিসে প্রতিদিন শতাধিক মানুষকে খাবার দিতেন। ১০ হাজারেরও বেশি যুবলীগ কর্মীর খরচের যোগান আসতো তার কাছ থেকে। তার টাকার উৎস বা আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত এক দশকে কোনো সাড়াশব্দ ছিল না।

যে কারণে টার্গেট সম্রাট

ঢাকার দক্ষ সংগঠক ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটের ওপর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ক্ষুব্ধ হন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অভিযোগ ছিল, সে সময় আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামের কাকরাইলে বহুতল ভবন নির্মাণের সময় চাঁদা দাবি করেছেন সম্রাট ও তার সহযোগী খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর গণভবনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে ঢাকা দক্ষিণের কমিটি ভেঙে দেয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

যুবলীগ সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। সেখানে বেওয়ারিশ লাশ দাফন হয়। ওটায় আমি ও রেহানা সাহায্য করি। এখানেও চাঁদা দাবি? এটা তো আমি বরদাশত করবো না।’

সেদিন তাদের র্যাব দিয়ে ধরিয়ে দেয়ারও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী।

জানা গেছে, সংগঠনের গুডবুকে থাকা সম্রাট এরপর থেকেই গোয়েন্দাদের টার্গেটে পড়েন। নানা সংস্থার রিপোর্টে তার, সহযোগীদের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণের তথ্য বেরিয়ে আসে। এর সবই নেত্রীর কাছে তুলে ধরা হয়। এরমধ্যে রাজধানী ঢাকায় তাদের অস্ত্র উঁচিয়ে চলাফেরারও দৃশ্য উঠে আসে।

সর্বশেষ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় এ ‘অস্ত্র উঁচিয়ে চলায়’ বিরক্তি প্রকাশ করেনপ্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তো এদেশে কেউ অস্ত্র নিয়ে বের হয়নি। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, অস্ত্র উঁচিয়ে চলাফেরা করে।’

যেভাবে নামলো অমানিশা

গোয়েন্দা রিপোর্ট পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। সামজিক অসঙ্গতি দূর করা ও দুর্নীতিরোধ করে নিজের সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে করণীয় নিয়ে কথা হয় সেখানে। গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ার প্রাক্কালে সিক্যুরিটি কাউন্সিলের প্রধান, পুলিশ ও র্যাবের প্রধানসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শুদ্ধি অভিযানের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ক্যাসিনোগুলো অভিযান চালানো হয়। এরপর একে একে অভিযান চালিয়ে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, জি কে শামীম, কৃষকলীগ নেতা শফিকসহ অনেককে গ্রেফতার করা হয়। গুঞ্জন ওঠে এসবের নিয়ন্ত্রক সম্রাটের গ্রেফতার নিয়ে।

সব জল্পনা কল্পনার অবসান করে নানা নাটকীয়তার মধ্যেও মধ্যরাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে সম্রাটকে গ্রেফতার করে র্যাব। আজ তাকে নিয়ে তার ভূঁইয়া ম্যানশনে অভিযানও চালিয়েছে। এরই মধ্যে সম্রাটসহ গ্রেফতারকৃতদের বহিষ্কার করেছে যুবলীগ।

তবে এ অভিযানে শুরুতে যুবলীগের চেয়ারম্যান এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘যুবলীগের শ্রেষ্ঠ সংগঠক ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। ’

ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযানের সময় তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ঢাকায় ৬০টি ক্যাসিনো আছে, ওইসব এলাকার পুলিশকে আগে গ্রেফতার করা দরকার। তারা কী করেছে? আপনারা কী আঙুল চুষছিলেন?’

এরপর অবশ্য তিনি সূর পাল্টে বলেছেন, ‘যুবলীগ একটি শৃঙ্খল সংগঠন। এখানে মাস্তানি আর ক্যাসিনো চালানোর সুযোগ নেই। এসব অভিযোগে যেই গ্রেফতার হবে, তাকেই বহিষ্কার করা হবে।’

তবে এরপর আর সম্রাট বা যুবলীগ নেতাদের গ্রেফতার নিয়ে কথা বলছেন না যুবলীগ চেয়ারম্যান। তাকে বার বার মুঠোফোনে চেষ্টা করেও পাওয়া যাচ্ছে না। কল বা এসএমসেও সাড়া দিচ্ছেন না।

এসইউজে/এইচআর

আরও পড়ুন...
হকার থেকে চলচ্চিত্র প্রযোজক আরমান!
যুবলীগ নেতা সম্রাট গ্রেফতার
কাকরাইলে সম্রাটের কার্যালয় ঘিরে র‌্যাবের অবস্থান
সম্রাট ও আরমান যুবলীগ থেকে বহিষ্কার
যেভাবে গ্রেফতার হলেন সম্রাট
ক্যাসিনো ব্যবসার গুরু কে এই আরমান?
সম্রাটের কার্যালয়ে র‌্যাবের অভিযান
সম্রাটের অফিস-বাসায় র‌্যাবের অভিযান

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও