প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে চোখ ভেজানো ১৫ আগস্ট

ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ | 2 0 1

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে চোখ ভেজানো ১৫ আগস্ট

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ১০:০৪ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৩, ২০১৯

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে চোখ ভেজানো ১৫ আগস্ট

বাংলাদেশের ইতিহাসের কলঙ্ক হয়ে থাকা ১৫ ও ২১ আগস্টের ভয়াবহতার কথা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের জানাল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাযজ্ঞ নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা শুনে উপস্থিত সবাই আপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের অনেককেই চোখ মুছতে দেখা যায়।

সেই সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা চলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি এবং রায় কার্যকর নিয়ে।

শুক্রবার বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটি ‘বাংলাদেশের ওপর ১৫ আগস্টের প্রভাব’ শীর্ষক সেমিনারে এমন শোকাবহের অবতারণা হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের উপস্থিতিতে সেমিনারে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা শেষে তারা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিস্মারকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

শেখ মুজিব নয়, বাংলাদেশকে হত্যা

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে শুধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়নি। সেই সঙ্গে বাংলাদেশকেও হত্যা করে আরেকটি পাকিস্তান বানানোর চেষ্টা করা হয় বলে সেমিনারে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।

তিনি বলেন, ‘পঁচাত্তর সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি ঘাতকেরা। তারা পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের প্রথম সারির নেতাদের একে এক হত্যা করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলে আরেকটি পাকিস্তান রাষ্ট্র তৈরি।’

ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘কিন্তু, তারা সফল হয়নি। যেই বাংলাদেশকে তারা হতে দিতে চায়নি বলে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করেছিল, সেই বাংলাদেশ আজ গড়ে উঠছে তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে। ২০১৭ সালে মাথাপিছু আয়ে আমরা ছাড়িয়ে গেছি পাকিস্তানকে। এ সবই সম্ভব হয়েছে জাতির পিতার দেখানো পথে চলে।’

সেমিনারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে চলতে না দেয়ায় আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। যদি তার দেখানো পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারত, তাহলে আজ আমরা উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেতাম।’

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারানো বাংলাদেশে কতটা প্রভাব ফেলেছে তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের জানা উচিত বাংলাদেশের জন্য উনি কী পরিকল্পনা করে গেছেন? কৃষিনির্ভর এই দেশের কৃষকদের স্বার্থে কাজ করেছেন। ১৯৭২ সালে দেশে ফেরার পর থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষি ও শিক্ষাখাতে। বাংলাদেশে যুদ্ধ-পরবর্তী সময় কৃষিজমির খাজনা হ্রাস এবং ১৬ হাজারের বেশি যুদ্ধবিধ্বস্ত স্কুল পুনর্নির্মাণ ও সরকারের অধিভুক্ত করেন বঙ্গবন্ধু।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধান বিশ্বের জন্য বিস্ময়। কেন না যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন হবার পর তার সংবিধান তৈরি করতে সময় লেগেছে প্রায় ১১ বছর। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সংবিধান তৈরি করতে লেগেছে প্রায় ৩ বছর। পাকিস্তানেরও প্রথম সংবিধান তৈরি করতে সময় লেগেছিল ৯ বছর। সেখানে মাত্র ৯ মাসে আমরা আমাদের সংবিধান তৈরি করতে পেরেছি শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারণে।’

ফিরিয়ে আনা হবে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের

সেমিনার শেষে প্রশ্ন-উত্তর পর্বে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সঙ্গে কথা বলছে সরকার। যুক্তরাষ্ট্র এর আগে বঙ্গবন্ধুর একজন খুনিকে হস্তান্তর করেছে। আশা করছি, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীর আগেই দেশটি আত্মস্বীকৃত এই খুনিকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে।’

এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘কানাডায় বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের একজন রয়েছেন। কানাডা সরকারের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তাকে সেখানে আশ্রয় প্রদান করা হয়নি। কিন্তু, কানাডা মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করে না। এ কারণে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামিদের তারা কোনো দেশের কাছে হস্তান্তর করে না।’

এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম কানাডার ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, ‘সম্প্রতি টেক্সাসের মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত এক আসামিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যে পাঠিয়েছে কানাডা। কেন না ওয়াশিংটন মৃত্যুদণ্ডকে সমর্থন করে না। কিন্তু, ওয়াশিংটনে প্রেরণের পর যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাকে টেক্সাসে প্রেরণ করে, যেখানে ওই আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে থাকা বঙ্গবন্ধুর অপর খুনিকে বাংলাদেশে ফেরত আনতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে চিঠি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আইন ও শাসনের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে নীতি রয়েছে, তাতে আমরা আশাবাদী এই খুনিকে ফেরত পাঠাবে দেশটি।’

প্রত্যক্ষদর্শী রমার বয়ানে ১৫ আগস্ট

সেমিনারে ১৫ আগস্টে হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহতা তুলে ধরে ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আব্দুর রহমান শেখ (রমা) বলেন, ‘আবদুর রব সেরনিয়াবাতের হত্যাকাণ্ডের খবর পাবার পর বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আমাকে রাস্তায় পাঠান দেখে আসার জন্য। আমি দোতলা থেকে নেমে দরজা খুলে বাহিরে গিয়ে দেখি আর্মি অফিসাররা গুলি করতে করতে এগিয়ে আসছে। আমি আবারো দৌড়ে ঘরের ভেতর গিয়ে খবরটি বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবকে দিলে তিনি তার বড় ছেলে ও মেঝো ছেলেকে ডেকে আনতে বলেন। আমি তিন তলায় গিয়ে কামাল ভাই ও দোতলা থেকে জামাল ভাইকে ডাকি। এ সময় দোতলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছিলেন।’

তিনি ওই ভোররাতের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘যখন ওরা গুলি করতে করতে ঘরে প্রবেশ করে, তখন শেখ রাসেল ও আমাদের নিয়ে বেগম ফজিলাতুন্নেসা একটি ঘরে দরজা বন্ধ করে ছিলেন। তিনি আমাদের তার পেছনে থাকতে বলেন। যখন দরজা খোলার জন্য বলা হয়, তিনি দরজা খুলেন। তাকে ওপরের ঘরে যেতে বলে সৈন্যরা। কিন্তু, সিঁড়ির কাছে স্বামীর লাশ দেখতে পেয়ে তিনি বলেন- ‘আমাকে মেরে ফেলতে চাইলে এখানেই মেরে ফেল’। ওখানে থাকা সৈন্যরা তখন ফায়ার করে।’

‘এরপর ওই সৈন্যরা বাড়ির সামনে আম গাছের কাছে নিয়ে বসায় আমাদের ও শেখ রাসেলকে। তখনও দোতলার ঘরগুলোতে গুলির আওয়াজ এবং মেয়েদের আর্তচিৎকার-আর্তনাদ শোনা যাচ্ছিল। খুব সম্ভবত শেখ কামাল ও শেখ জামাল ভাইয়ের বউকে তারা ওই সময় হত্যা করে। এরপর গুলির আওয়াজ থেমে যায়’, বলতে গিয়ে চোখ মুছতে থাকেন আব্দুর রহমান শেখ (রমা)।

সেনা সদস্যদের নির্মম আচরণের সঙ্গে তখনো পরিচিত ছিলেন না রমা। সে কারণেই আম গাছের নিচে বসিয়ে রাখা শেখ রাসেল যখন কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞাসা করছিল, ‘ওরা কি আমাকেও মেরে ফেলবে?’ তখন ১২ বছরের রমা এবং বসে থাকা অন্যরা বলেছিল, ‘না, তোমাকে মারবে না।’

হয়ত তাদের বিশ্বাস ছিল, ছোট্ট রাসেলকে মারার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। কিন্তু, একটু পরে আর্মির বড় অফিসার ট্যাঙ্ক নিয়ে প্রবেশ করলে ওখানে থাকা এক সৈন্য তাকে গিয়ে বলে, ‘শেখ রাসেল তার মার সঙ্গে দেখা করতে চাচ্ছে।’

উত্তরে সেই আর্মি অফিসার বলেন, ‘আমরা সেই ব্যবস্থা করতে পারি।’ এরপর মায়ের সঙ্গে দেখা করানোর কথা বলে শেখ রাসেলকে উপরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বেশ কিছু সময় শেখ রাসেলের কান্নার আওয়াজ পাই আমরা। এরপর চার-পাঁচটা গুলির শব্দ শুনি। ব্যস, একেবারে নিঃশব্দ। কোনো কান্নার আওয়াজ নেই’— এভাবে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ভোররাতের ভয়াবহতার বর্ণনা যখন আব্দুর রহমান শেখের (রমা) মুখ থেকে বের হচ্ছিল, উপস্থিত সবাই চোখ মুখছিলেন।

এই সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. শাম্মী আহমদ, উপ-কমিটির অন্যান্য সদস্যবৃন্দ এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, স্পেন, সুইজারল্যান্ড ও জাপানসহ ৩০ দেশের কূটনীতিক।

এসইউজে/আইএম

 

জাতীয়: আরও পড়ুন

আরও