ডেঙ্গু রোগীর সেবাদানকারী চিকিৎসকদের ঝুঁকি বেশি

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

ডেঙ্গু রোগীর সেবাদানকারী চিকিৎসকদের ঝুঁকি বেশি

প্রীতম সাহা সুদীপ ৬:০১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৬, ২০১৯

ডেঙ্গু রোগীর সেবাদানকারী চিকিৎসকদের ঝুঁকি বেশি

রাজধানীসহ সারা দেশে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে ডেঙ্গু জ্বর। শুধুমাত্র রোববার (৪ আগস্ট) থেকে সোমবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দেশের সব হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে দুই হাজার ৬৫ জন, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে।

মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে প্রতিনিয়তই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর খবর শোনা যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ভয়াবহ হারে বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে তাদের সেবাদানকারী চিকিৎসকদেরও।

ডেঙ্গুতে প্রাণ হারালেন যেসব চিকিৎসক

সবশেষ গত শনিবার বিকেলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কুষ্টিয়ার চৌধুরী নুরুল নাহার হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. রাশেদুজ্জামান রিন্টুর মারা যান। তিনি এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নিজের চিকিৎসা নিজেই করছিলেন, কিন্তু জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে পারেননি এই চিকিৎসক।

এর আগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার (২৬ জুলাই) সন্ধ্যায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বীর মুক্তিযোদ্ধা কোম্পানি কমান্ডার ডা. উইলিয়াম ম্রং। ১৯৭১ সালে তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পরে তিনি ১১নং সেক্টরের অধীনে ঢালু সাব-সেক্টরের কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে অংশ নেন।

যুদ্ধের পরে ডা. উইলিয়াম ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে মেডিকেল অফিসার হিসেবে ওই হাসপাতালেই যোগদান করেন।

এছাড়া ২৫ জুলাই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ধানমন্ডির আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ডা. তানিয়া সুলতানা। তিনি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ৪৭তম ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে এফসিপিএস পার্ট-২ এর শিক্ষার্থী ছিলেন। থাকতেন রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায়।

মশাবাহিত এই রোগ প্রাণ কেড়ে নিয়েছে হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. শাহাদত হোসেন হাজরারও। গত ২১ জুলাই রাত ১১টার দিকে হবিগঞ্জ থেকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসকরা শাহদতকে মৃত ঘোষণা করেন।

ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ দেয়া চিকিৎসকদের তালিকায় নাম রয়েছে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী সরকারি হাসপাতালে রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. নিগার নাহিদ দিপুরও। গত ৩ জুলাই রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। নিগার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের ৩২ ব্যাচের ছাত্রী ছিলেন।

ডেঙ্গুর রোগীর সেবাদানকারী চিকিৎসকরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধুমাত্র রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেই গত একমাসে ১০ জন চিকিৎসক ও ২৭ জন নার্স ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন।

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. খায়রুল আলম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, জুলাই মাসের বিভিন্ন সময় আমাদের এই চিকিৎসক এবং নার্সরা ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

চিকিৎসক এবং নার্সদের মধ্যে কীভাবে ডেঙ্গু সংক্রামণ ঘটলো এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যারা ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দিচ্ছিলেন তাদের অনেকেই আক্রান্ত হয়েছেন। এটা খুবই স্বাভাবিক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীকে যদি মশা কামড় দেয়, সেই মশার মাধ্যমে চিকিৎসকদেরও ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’

শুধু মুগদা হাসপাতাল নয়, ঢামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সেখানেও এখন পর্যন্ত ছয়জন চিকিৎসক ও দুজন নার্স ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালেও এখন পর্যন্ত তিনজন চিকিৎসক ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

চিকিৎসকদের মধ্যে ডেঙ্গুর সংক্রমণ রোধে করণীয়

চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের শয্যাপাশে থেকে দীর্ঘসময় নিবিড়ভাবে চিকিৎসা প্রদান করতে হয় বলে চিকিৎসকদেরও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীকে যদি মশা কামড় দেয়, সেই মশার মাধ্যমে চিকিৎসকদেরও ডেঙ্গু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক আরো বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীদের মশারির ভেতরে থাকার জন্য চিকিৎসকরা নির্দেশনা দিলেও গরম লাগার অজুহাতে রোগীদের অনেকেই মশারি টানিয়ে থাকছেন না। এর ফলে চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাই প্রতিটি রোগীকে মশারি টানিয়ে থাকতে হবে এবং সেবাদানকারী চিকিৎসকদের সাবধানতাস্বরূপ ফুলহাতা শার্ট পরা উচিত।

পিএসএস/এইচআর

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও