ট্রাম্পকে বলা বক্তব্যে অনড় প্রিয়া সাহা

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

ট্রাম্পকে বলা বক্তব্যে অনড় প্রিয়া সাহা

পরিবর্তন ডেস্ক ৯:৩৭ অপরাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৯

ট্রাম্পকে বলা বক্তব্যে অনড় প্রিয়া সাহা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিয়ে দেয়া বক্তব্যে আলোচনা-সমালোচনার বিষয়ে নিজের বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রিয়া সাহা।

রোববার একটি ভিডিও’র মাধ্যমে দেয়া ব্যাখ্যাতেও তিনি নিজের অবস্থানে অনড় থাকার কথা বলেছেন।

প্রিয়া সাহার দাবি, ‘৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানের গায়েব (ডিজঅ্যাপিয়ার্ড) হওয়ার যে তথ্য তিনি ট্রাম্পকে দিয়েছেন, তা সরকারি পরিসংখ্যান থেকেই নেয়া।’

তিনি আরও দাবি করেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত ওই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ২০১১ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, যা সে সময় গণমাধ্যমেও আসে।’

এদিন প্রিয়া সাহার এনজিও ‘সারি বাংলাদেশ’র ইউটিউব চ্যানেলে দেয়া প্রায় ৩৫ মিনিটের ভিডিওতে তিনি ওভাল হাউসের ওই ঘটনার বিষয়ে কথা বলেন।

সেখানে দু’জনের কথোপকথনে প্রিয়া সাহা অনেক প্রশ্নের জবাব দেন। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে অভিন্ন অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র সরকার যাতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে— সেজন্যই তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহযোগিতা চেয়েছেন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা তার উদ্দেশ্য ছিল না।’

গত ১৭ জুলাই ওভাল হাউসে এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জানান, বাংলাদেশের মৌলবাদী মুসলিমরা তার জমি কেড়ে নিয়েছে, বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিস্টান সম্পদায়ের মানুষ গায়েব রয়েছেন। আরও ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছেন, যারা দেশটিতে থাকতে চান।’

এ সময় প্রিয়া সাহা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে সাহায্যও চান।

প্রিয়া সাহার বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙ্গা ইউনিয়নের চরবানিরী গ্রামে। তার স্বামী মলয় সাহা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সহকারী পরিচালক।

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক প্রিয়া সাহা জাতীয় মহিলা ঐক্য পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ‘সারি বাংলাদেশ’ নামের এনজিও চালান তিনি।

প্রিয়া সাহাকে ঐক্য পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোর কথা সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত অস্বীকার করেছেন। তবে আয়োজক সংগঠন ফ্রিডম হাউজের ওয়েবসাইটে প্রিয়া সাহার পরিচয় রয়েছে। সেখানে ধর্মীয় কারণে নিপীড়নের শিকার ২৭ জনের মধ্যে যে ২৪ ব্যক্তির তালিকা, তাতে প্রিয়া সাহা ১৮ নম্বরে। তার নামের সঙ্গে পরিচয় হিসেবে লেখা, ‘বাংলাদেশ থেকে আসা একজন হিন্দু, যিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক।’

এসব বিষয় খণ্ডাতে দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রিয়া সাহা ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিএনপি-জামায়াত সরকার থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী  লীগ আমলের নির্যাতনের চিত্রও তুলে ধরেন।

যত কিছুই হোক, তিনি দেশে ফেরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে বিশ্বাস করেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তার এই লড়াইয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সরকার তার পাশে থাকবেন।

প্রিয়া সাহা বক্তব্যের শেষদিকে দেশবাসীকে পরিসংখ্যান থেকে সত্য জানার আহ্বান জানান। তাহলে এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে বলেও উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘দেশের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলার ইচ্ছা আমার কখনো ছিল না। কোনো দিন হবেও না। দেশটা আমার, আমার পরিবার যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। পূর্বপুরুষ থেকেই আমরা এদেশে বাস করি। এদেশের কোনো অমঙ্গল, অকল্যাণ হোক, কোনো অবস্থাতেই সেটি করতে পারি না। যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি থাকে, এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তার অবসান হবে।’

নিজের বক্তব্যে অনড় থাকার কথা জানিয়ে প্রিয়া সাহা সরকারি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন, ‘আদমশুমারি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী দেশভাগের সময় বাংলাদেশের জনসংখ্যার ২৯.৭ শতাংশ ছিল ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। ওই হার এখন নেমে এসেছে ৯.৭ শতাংশে। এখন দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৮০ মিলিয়ন। সংখ্যালঘু জনসংখ্যা যদি একই হারে বৃদ্ধি পেতো, তাহলে অবশ্যই যে জনসংখ্যা আছে এবং যে জনসংখ্যার কথা আমি বলেছি, ক্রমাগত হারিয়ে গেছে, সেই তথ্যটা মিলে যায়।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের ওই পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করেই অধ্যাপক আবুল বারাকাত ২০১১ সালে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে বলা হয়েছিল, প্রতিদিন ৬৩২ জন হিন্দু দেশ ছাড়ছেন। ২০১১ সালে আমি স্যারের সঙ্গে সরাসরি ওই প্রকল্পে কাজ করেছিলাম, যে কারণে আমি বিষয়টা সম্পর্কে অবহিত।’

‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড’ শব্দের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলি। ফলে ইংরেজি অনেক শব্দের প্রতিটি বিষয়ে আমরা অবগত এমন নয়। আমি যেটি বোঝাতে চেয়েছি, তাহলো— স্বাভাবিকহারে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি যেভাবে থাকার কথা ছিল, সেভাবে থাকলে ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিয়ে আমি যা বলেছি সেটিই হতো। আমার বলা জনসংখ্যা কোথায়? তারাতো নাই। নাই কেন? ক্রমাগতভাবে কমে গেছে। আমি ডিসঅ্যঅপিয়ার্ড দিয়ে নাই কেন, সেটিই বোঝাতে চেয়েছি। এতসংখ্যক মানুষ কোথায় গেল, কিভাবে, কি হলো আপনারা সবাই এ বিষয়ে সচেতন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ডিসঅ্যাপিয়ার্ড বলে আমি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করতে চাইনি। আমার গ্রামের বাড়ি পিরোজুপরে ২০০৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে ৪০টি পরিবারের মধ্যে মাত্র ১৩টি হিন্দু পরিবার আছে। আমার গ্রামের এই মানুষগুলো কোথায় গেল, তা রাষ্ট্রের দেখার কথা। আমার গ্রামে গেলে সবাই তা দেখতে পাবেন। তাদের ভিটে পড়ে আছে, মানুষ নেই। সত্যি বলতে, কোন গ্রামের সংখ্যালঘু উচ্ছেদ হচ্ছে, কার অত্যাচারে তারা চলে যাচ্ছে, সবাই তা জানেন।’

তাহলে কী বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই— এমনটি বোঝাতে চেয়েছেন আপনি— এমন প্রশ্নের জবাবে প্রিয়া সাহা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। জাতির জনককে স্বপরিবারে হত্যার পর থেকে অগণতান্ত্রিক ও সামরিক সরকার এসে দেশে অসাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিকে খারাপ পর্যায়ে নিয়ে গেছে। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় এসে সেটি ফিরিয়ে আনতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। তারপরও কিন্তু এমন ঘটনা থেমে নেই। রামু, অভয়নগর, রংপুর, নাসিরনগরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন এবং প্রতিটা নির্বাচনের আগে-পরের ঘটনায় তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অবশ্য এখন নির্বাচনোত্তর সহিংসতা অনেক কমিয়ে এনেছে।’

তিনি বলেন, ‘চলতি বছরের মার্চে আমার গ্রামের বাড়ি যখন পুড়িয়ে দেয়, প্রথম ফোন কিন্তু পাই গ্রামের দেলোয়ারের কাছ থেকে। সে প্রায় ৩০ মিনিট আমার কাছে কান্নাকাটি করে বলেছে, দিদি আমরা কিছুই করতে পারলাম না। তোমারই এই হলো, আমরা তাহলে কিভাবে থাকব এখানে?’

প্রিয়া সাহা বলেন, ‘এদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা মোকাবেলায় মুসলিমরাই এগিয়ে আসেন। অনেক হামলায় তারা আহতও হন। এদেশে হিন্দু-মুসলিম শত্রু নয়। ৯৯ শতাংশ মুসলিমই অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে এবং এক সঙ্গে থাকেন। কিন্তু, দুষ্ট লোক আছে, যারা এসব ঘটনা ঘটান। এমনই একটি অংশ আমাদের গ্রামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তির দখল নিতেই হামলা করেছিল। এরা সরকারি দলের লোক। এরা সব সময়ই সরকারি দলের থাকে। যখন যে সরকার আসেন, তাদের হয়ে যান। এক সময়ে সাবেক এমপি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নেতৃত্ব করা হয়েছিল। পরে তার লোকেরা যে সরকার এসেছে, রং বদলেছে।’

তিনি বলেন, ‘সরকার ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। আমিও মার্কিন প্রেসিডেন্টর কাছে সেটিই উল্লেখ করেছি। কিন্তু, কিছু সংখ্যক মানুষ কথাটিকে ঘুরিয়ে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে। মূলত মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সরকারের যুদ্ধকে আমি শক্তিশালী করার জন্য কথাগুলো বলেছি। আমি মনে করি, আমার সরকার আমার ও পরিবারকে নিরাপত্তা দেবে।’

প্রিয়া সাহা বলেন, ‘আমার বক্তব্যের মাধ্যমে যখন সরকার প্রকৃত সত্য জানতে পারবে, আমার বক্তব্য শুনে সত্য বুঝতে পারবে; তখন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ নয় বরং আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।’

তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘গ্রিন কার্ডের জন্য কী ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করা লাগে? বহুবার এদেশে এসেছি। আমি কেন বাংলাদেশ ছাড়ব? ট্রাম্পকেও বলেছি, আমি আমার আমি দেশে থাকতে চাই। ওটাই আমার প্রথম কথা, ওটাই আমার শেষ কথা। অবশ্যই দেশে ফিরব। কেন নয়? অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার জন্য আমৃত্যু কাজ করব।’

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদে মুসলিম কেন নেই- এমন প্রশ্নে সংগঠনের সাংগঠনিক এই সম্পাদক বলেন, ‘১৯৯০ সাল থেকে সংগঠনের সঙ্গে আছি। এটি সাম্প্রদায়িক সংগঠন নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে। ১৯৮৮ সালে রাষ্ট্রধর্ম করা হয়। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করার বিরুদ্ধেই ঐক্য পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। এজন্যই এখানে মুসলিমরা নেই। কিন্তু, আমাদের সব কর্মসূচিতে সিভিল সোসাইটি থেকে শুরু করে অসাম্প্রদায়িক মুসলিমরা যুক্ত থাকেন।’

আইএম

আড়ও পড়ুন...
মুখ খুলেই প্রিয়া জানালেন, কিভাবে তিনি আমেরিকায়
ভালো নাই, আমি ভালো নাই: প্রিয়া সাহা

 

জাতীয়: আরও পড়ুন

আরও