হাসপাতালে শুয়ে-বসে বলছেন সৈয়দ হক, লিখছেন আনোয়ারা

ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২ পৌষ ১৪২৫

হাসপাতালে শুয়ে-বসে বলছেন সৈয়দ হক, লিখছেন আনোয়ারা

কৈলাস সরকার ৯:০৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৬

হাসপাতালে শুয়ে-বসে বলছেন সৈয়দ হক, লিখছেন আনোয়ারা

দূরারোগ্য ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ফুসফুসে। কিন্তু বাধ সাধতে পারেনি তার চিরায়ত সাহিত্যকর্মে। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে-বসেই রচনা করে চলেছেন কবিতা, নাটক, গল্প। মৃত্যু চিন্তাকে দূরে ঠেলে সাহিত্য রচনায় নিমগ্ন তিনি।

‘হায়রে মানুষ, রঙিন ফানুস, দম ফুরাইলেই ঠুস’, ‘অনেক সাধের ময়না আমার বাঁধন কেটে যায়’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’, ‘তোরা দেখ, তোরা দেখ, দেখ রে চাহিয়া, রাস্তা দিয়া হাইটা চলে রাস্তা হারাইয়া’র মতো গান যার অসংখ্য রচনার অংশ বিশেষ। গদ্যে, পদ্যে, কথায়, সুরে ও ছন্দের এই কারিগর বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং শিল্পের প্রতিটি অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন তার অমিয়ধারা প্রবাহের মধ্য দিয়ে। তার রচিত গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা যোগ করেছে নতুন এক মাত্রার।

প্রবাদপ্রতীম ৮০ বছর বয়সী এই অসামান্য মানুষটি এখন চিকিৎসাধীন রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে। লাখো ভক্ত-শুভানুধ্যায়ীর ভালবাসায় সিক্ত এই সাহিত্যকারকে এখন ইচ্ছে করলেই এক পলক দেখা যাবে না। হাসপাতালের ৬০৪ নম্বর কেবিনের বাইরের দরজায় সাবধানী বার্তাযুক্ত নোটিশ টানানো। ডাক্তার, নার্স এবং একান্ত ঘনিষ্টজন ছাড়া তার কাছে যাওয়া মানা। অবশ্য এসবই তার দ্রুত আরোগ্য লাভের লক্ষে।

এমন অবস্থায় সব্যসাচী এ সাহিত্যকারের বর্তমান শারীরিক অবস্থা জানতে পরিবর্তনের পক্ষে প্রয়াস চালানো হয় শুক্রবার বিকেলে। হাসপাতালে গিয়ে বোঝা গেল যে কবির কাছাকাছি যাতে কেউ সহজে না যেতে পারে এজন্য প্রতিটি কর্মচারী, নিরাপত্তারক্ষীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকেই নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে।

অনেক চেষ্টার পর কেবিন পর্যন্ত যাওয়ার পর দরজার সামনেই থেমে যেতে হয়। এগিয়ে আসেন কবি পত্নী, সাহিত্য জগতের আরেক প্রতিভা আনোয়ারা সৈয়দ হক। তিনিই জানালেন কবির সর্বশেষ অবস্থা।

পরিবর্তনের সাথে কথোপকথনের সময় আনোয়ারা হক আন্তরিকভাবেই জানান, ‘ওনার নাকে অক্সিজেন মাস্ক দেওয়া আছে। তাই ভেতরে যাওয়া সমীচীন হবে না।’

তিনি বলেন, ‘কবির শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা স্বাভাবিকভাবেই চলছে।’

কবিপত্নী জানালেন, ‘ওনার ব্রেইন অ্যাকটিভ আছে। আর তাই ছোট ছোট কবিতা, নাটকের ছোট ছোট এপিসোড (পর্ব) লেখা অব্যাহত রয়েছে।’

তবে সৈয়দ শামসুল হক নিজে হাতে লিখতে পারেন না বলে সহধর্মিনী আনোয়ারা হক স্বামীর মুখ থেকে শুনে শুনে লিখে রাখছেন।

‘মাঝ রাতে, শেষ রাতে বা হঠাৎ করে যখন ঘুম ভাঙে এবং কোনো কিছু মাথায় আসে, আমাকে ডাকেন। উনি বলেন, আমি সেগুলো লিখে ফেলি’— বলেন আনোয়ারা হক।

কথায় কথায় আনোয়ারা সৈয়দ হক জানালেন, ইচ্ছে হলে নিজেই বিছানায় উঠে বসেন কবি। কম বেশি চলা ফেরাও করেন কেবিনের মধ্যেই। ডাক্তার, নার্স আত্মীয়-স্বজনের সাথে সীমিত কথাবার্তা বলেন। টয়লেট-বাথরুমের কাজ নিজেই করতে পারেন। তবে সহযোগিতা করা হয় সাবধানতার লক্ষে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালের সরবরাহ করা খাবার খান তিনি।

এ ব্যাপারে কবিপত্নী বলেন, ‘খাওয়া-দাওয়া স্বাভাবিক, যদিও উনি সবসময়ই খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে একটু চুজি।’

এর মাঝে এক প্রশ্নের জবাবে কবিপত্নী বলেন, ‘সুস্থ হয়ে কবি হাসপাতাল হতে কবে বাসায় ফিরতে পারবেন এ রকম কোনো সবুজ সংকেত আমরা ডাক্তারদের কাছ থেকে পাইনি।’

জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ যাবৎ একটা কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছে বলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন। আরো দিতে হবে কি-না তাও ডাক্তাররাই ভাল জানেন।’

কবির সার্বক্ষণিক এই সঙ্গী আরো জানালেন, বর্তমানে সৈয়দ শামসুল হকের ফুসফুসে ক্যান্সার। এর আগে ১৯৮৮ সালে তার হার্টে বাইপাস সার্জারি করা হয়।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর গত ১৫ এপ্রিল স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হককে নিয়ে লন্ডন যান উন্নত চিকিৎসার জন্য। সেখানে রয়্যাল মার্সডেন হাসপাতালে চার মাস চিকিৎসার পর গত ২ সেপ্টেম্বর দেশে ফিরে ভর্তি হন ইউনাইটেড হাসপাতালে।

এর মধ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে হাসপাতালে যান কবির সঙ্গে দেখা করতে। কবির খোঁজ খবর নেওয়ার পর তার চিকিৎসার যাবতীয় খরচ বহন করারও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী।

এ জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আনোয়ারা হক। এসময় তিনি দেশবাসীর কাছেও দোয়া কামনা করেন। ‘উনি যেন দ্রুত ভাল হয়ে ওঠেন সেজন্য সকলের ভালবাসা এবং শুভেচ্ছা কামনা করছি’— বলেন আনোয়ারা হক।

কথায় কথায় জানা গেল জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে থেকেও কবির ইচ্ছে আগামী ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার।

এ ব্যাপারে সৈয়দা হক বলেন, ‘এ ধরনের বিশেষ উপলক্ষ যখন আসন্ন, তখন কার না সাধ হয়।’

কবি, ঔপন্যাসিক, শিশুসাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক এই ব্যক্তিত্ব কাব্যনাট্য, চিত্রনাট্য, সিনেমা, চিত্রকলা, ভাস্কর্যসহ শিল্পকলার বিবিধ শাখা প্রশাখার এই সফল কারিগর ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন কুড়িগ্রাম জেলায়। বাবা প্রয়াত সিদ্দিক হুসাইন, পেশায় হোমিওপ্যাথি ডাক্তার, মা হালিমা খাতুন। আট ভাই বোনের মধ্যে তিনিই সবার বড়। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর উদযাপন হয় তার ৮০তম জন্মদিন।

কুড়িগ্রাম মাইনর স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে সৈয়দ হক মাধ্যমিকে পড়ার সময় লেখালেখিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৪৯-৫০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার পরে ব্যক্তিগত খাতায় লিখে ফেলেন দুইশ’ কবিতা। এরই মধ্যে ১৯৫১ সালে ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ পত্রিকায় ছাপা হয় প্রথম লেখা। ১৯৫২ সালে জগন্নাথ কলেজে মানবিক শাখায় ভর্তি হন এবং ১৯৫৪ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। কিন্তু স্নাতক পাসের আগেই পড়ালেখা ছেড়ে দেন ১৯৫৬ সালে। লেখালেখিকে একমাত্র ব্রত করে নেন।

তার গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘অনুপম দিন’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘নীল দংশন’, ‘স্মৃতিমেধ’, ‘মৃগয়া’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘বড়দিনের শিশু’, ‘বনবালা কিছু টাকা ধার নিয়েছিল’, ‘ত্রাহি’, ‘তুমি সেই তরবারি’, ‘কয়েকটি মানুষের সোনালী যৌবন’, ‘নির্বাসিতা’, ‘খেলারাম খেলে যা’, ‘মেঘ ও মেশিন’, ‘ইহা মানুষ’, ‘মহাশূন্যে পরান মাস্টার’, ‘বালিকার চন্দ্রযান’, ‘আয়না বিবির পালা’, ‘কালধর্ম’, ‘দূরত্ব’ প্রভৃতি।

ছোটদের জন্য লেখা 'সীমান্তে সিংহাসন', 'আবু বড় হয়' ও 'হাডসনের বন্ধু' পেয়েছে বিপুল পাঠকপ্রিয়তা। তার অতুলনীয় কাব্যনাট্য 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়', 'নূরলদীনের সারাজীবন' ইত্যাদি। তার ছোটগল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শীত বিকেল’, ‘রক্ত গোলাপ’, ‘আনন্দর মৃত্যু’ প্রভৃতি।

তিনি রচনা করেন ৩০টির মতো চিত্রনাট্য। ‘মাটির পাহাড়’, ‘তোমার আমার’, ‘রাজা এলো শহরে’, ‘শীত বিকেল’, ‘সুতরাং’, ‘কাগজের নৌকা’ তাদের মধ্যে অন্যতম। চলচ্চিত্রের জন্য গানও রচনা করেন তিনি। লেখালেখি ছাড়াও সৈয়দ শামসুল হক পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

মানুষের ভালবাসার পাশাপাশি লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পদক, একুশে পদক, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, পদাবলী কবিতা পুরস্কার, জাতীয় কবিতা পুরস্কার, স্বাধীনতা পদকসহ অনেক পুরস্কার।

এক ছেলে ও এক মেয়ের জনক সৈয়দ হক ব্যক্তিজীবনে প্রথিতযশা লেখিকা ডা. আনোয়ারা সৈয়দ হকের স্বামী।

কেএস/একে