অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ‘ভাগের মা’

ঢাকা, ১ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ‘ভাগের মা’

শাহাদাৎ স্বপন ১০:৩৯ অপরাহ্ণ, মে ০৮, ২০১৯

অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ‘ভাগের মা’

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ আগ্নিকাণ্ডের পর ফায়ার সার্ভিস ১২০টি ভবন অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছে।

এসব ভবনে ‘ভবনটি অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে ব্যানার টানিয়ে দিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

অনেকটা ব্যানার সেঁটে দায়িত্ব শেষ করেছে ফায়ার সার্ভিস। উপরন্তু সংস্থাটির দেখভালের অভাবে ভবন মালিকরা ওইসব ব্যানার সরিয়ে ফেলছেন।

যে কারণে এসব ভবনে কর্মরত লাখ লাখ কর্মজীবী মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে এফআর টাওয়ারের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায়-দায়িত্ব কে নেবে?

এ ব্যাপারে জানতে এই প্রতিবেদক ফায়ার সার্ভিস, রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কড়া নেড়েও এর সদুত্তর পায়নি।

অনেকটা ভাগের মায়ের মতো। ভাগের মা যেমন গঙ্গা পায় না, তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ এসব ভবনের কেউ দায়িত্ব নিতে চাননি।

তবে, রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসকে দুষলেন।

এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের দায়-দায়িত্ব (লাইবেলিটিজ) কেউই এড়াতে পারে না।

গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানীর এফআর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৬ জন মৃত্যু ও ৭৩ জন আহত হওয়ার ঘটনায় নড়েচড়ে বসে ফায়ার সার্ভিস, রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

ফায়ার সার্ভিস রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভবনগুলো পরিদর্শন করে দেখে অধিকাংশ ভবনে নেই অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা। এরপর সংস্থাটি ওইসব ভবনে ‘ভবনটি অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ’ ব্যানার সেঁটে দেয়।

ভবন মালিকরা অগ্নি ঝুঁকিমুক্ত করতে নেয়নি কোনও উদ্যোগ।

ফায়ার সার্ভিসকেও আর কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি এসব ভবনের বিরুদ্ধে।

তাহলে এসব ভবনের অগ্নি ঝুঁকিমুক্ত করতে কে উদ্যোগ নিবে- কে নেবে এর দায়িত্ব?

ফায়ার সার্ভিস বলছে, এই দায় পুরোপুরি তাদের নয়।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং দুই সিটি করপোরেশনও বলছে, অন্তত অগ্নি ঝুঁকি বিষয়ে তাদেরও কোন দায় নেই।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের উপ পরিচালক দেবাশীষ বর্ধণ বলেন, ঢাকা শহরে আমরা ১২০টি ভবনে অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ব্যানার লাগিয়েছি। আমাদের পুলিশি ক্ষমতা নেই। তাই ভবন মালিকরা কিছু দিন পর ব্যানার খুলে রাখে।

তাহলে মালিকদের বিরুদ্ধে মামলা করছেন না কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক আব্দুল হালিম বলেন, এ সুযোগটি আমাদের নেই। এটা আমাদের আইনে কাভার করে না। ফায়ার সার্ভিসের আইনি সীমাবদ্ধতা আছে।

অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিতে গুলশান, বারিধারা ও বনানী এলাকায় অভিযান পরিচালনাকারী টিমের প্রধান ও ফায়ার সার্ভিসের বারিধারা স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, দেখুন একটু খোলামেলা বললে, ভবন মালিকদের ভবনে গিয়ে যদি আমরা ফায়ার এক্সিট ব্যবস্থা দিয়ে আসি তাহলেও তারা তা রাখতে চাইবে না। তাদের মানসিকতা হচ্ছে তারা ভবনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে আর সুবিধা নেবে।

তিনি বলেন, বনানীর এফআর টাওয়ারে আগুনের ঘটনায় বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এরপর গুলশান, বারিধারা ও বনানী এলাকার বাকী ভবনগুলো সার্ভে করেছি। এসব অধিকাংশ ভবনে ফায়ার সিকিউরিটির কিছুই নাই। এজন্য সেই ভবনগুলোতে আমরা সাইনবোর্ড লাগিয়েছি। এফআর টাওয়ারে আগুনের ভয়াবহতা দেখেও অন্তত মালিকদের কনসাস হওয়া উচিত ছিল। উল্টো ভবন মালিকরা প্রাসটিস ইস্যু মনে করে সাইনবোর্ডগুলো খুলে ফেলেছে। ফলে ভবনগুলো অগ্নি ঝুঁকিতে থেকেই যাচ্ছে।

এ বিষয়ে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (ইঞ্জি:) সামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (অব.) এ প্রতিবেদককে বলেন, সাত তলার উর্ধে কোন ভবন নির্মাণ করতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস থেকে ভবনের নকশা অনুমোদনের অনাপত্তি সনদ নিতে হয়। ভবনটি আবাসিক, বাণিজ্যিক বা শিল্প ভবন যাই হোক না কেন। এক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিস ওই ভবনে ইমারত নির্মাণ বিধি অনুযায়ী নকশায় অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা যথাযথ পেলেই শুধুমাত্র এ অনাপত্তি সনদ প্রদান করে।

তিনি বলেন, পরবর্তীতে সেই অনাপত্তি সনদ দেখে রাজউক সেই বহুতল ভবন নির্মাণের নকশা অনুমোদন দেয়। এরপর বিল্ডিং নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর কী হলো তার দায় রাজউকের থাকার কথা নয়।

এ ব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী ড. তারেক বিন ইউসুফ বলেন, অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ফায়ার সার্ভিসই নির্ধারণ করবে। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে এর কোন রিলেশন নেই।

তার ভাষ্য, সিটি করপোরেশন শুধু শত বর্ষের পুরনো বিল্ডিং ব্যবহার অনুপযোগী কিনা তা দেখবে। এর বাইরে বিল্ডিং কাঠামোয় কী ত্রুটি আছে সেটা দেখবে রাজউক। ফায়ার রিলেটেড ঝুঁকি থাকলে সেটা দেখবে ফায়ার সার্ভিস।

তিনি বলেন, ভবন নির্মাণের সময় ফায়ার সার্ভিসের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া রাজউককে কোনভাবেই নকশার অনুমোদন দেওয়ার কথা নয়।

তিনি বলেন, যখন কোন বহুতল ভবন পরিবদর্শনের পর ফায়ার সার্ভিস দেখেছে সেখানে ফায়ার সিকিউরিটি নেই, তাহলে তারা মামলা করুক। সেটা তারা করেন না কেন?

তিনি আরো বলেন, তাছাড়া ফায়ার সার্ভিস যেকোন ভবনে ফায়ার এক্সিট সিস্টেম না পেলে রাজউককে তারা প্রতিবেদন দিতে পারে। শুধুমাত্র অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন লেখা সাইনবোর্ড লাগালে চলবে না। যেই আইনে তারা ভবন পরিদর্শন করে সেই একই আইনে তারা তা প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয় না কেন?

এ বিষয়ে নগর বিশেষজ্ঞ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, অগ্নি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের লাইবেলিটিজ কেউই এড়াতে পারে না। অগ্নি নির্বাপক সম্পর্কিত যে কয়টি আইন এবং বিধিমালা আছে সেখানে ফায়ার সার্ভিসকে পরিষ্কার লাইবেলিটিজ দেওয়া আছে। ফায়ার সার্ভিসের অনাপত্তি সনদ ব্যতীত দেশে কোন বহুতল ভবন নির্মাণ হয়নি। রাজউক থেকে অনুমোদনই পাওয়ার কথা নয়।

তিনি বলেন, আবার স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০০৯ এর মধ্যে পরিষ্কার বলা আছে, অগ্নি নির্বাপকের জন্য সকল ব্যবস্থা সিটি করপোরেশন গ্রহণ করতে পারবে।

তিনি বলেন, জবাবদিহিতাহীন সংস্কৃতি, দায়বদ্ধতাহীন ব্যবস্থাপনা এবং কর্মকাণ্ড এসব দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ভবন অনুমোদন দিচ্ছে, কিন্তু সেই নির্দিষ্ট শর্ত অনুসারে ভবনটি নির্মিত হচ্ছে কিনা এমনকি প্রতিবছর ভবনটির যান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা যথাযথ আছে কিনা, তা দেখভালের কোন প্রক্রিয়াই তাদের নেই।

তিনি বলেন, দুই তলা বিশিষ্ট ভবন এবং দশতলা বিশিষ্ট ভবনের ব্যবস্থাপনা যে একই রকম নয় তা অনেকে জানেই না। অগ্নি নির্বাপকের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে এসব ভবন অনুমোদন পেল কিভাবে? প্রশ্নও রাখেন এ স্থপতি।

এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, দেখুন ফায়ার ঝুঁকির বিষয়টি আমাদের মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে রিলেভেন্স (প্রাসঙ্গিকতা) নয়। ফলে এটা নিয়ে আমরা কিছুই বলতে পারি না। এটা দেখবে ফায়ার সার্ভিস। তাদের যদি কোন হেল্প দরকার হয় তাহলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে তারা হেল্প নিতে পারে।

এসএস/এসবি

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও