বিমানবন্দর ‘খেকো’ মালেক, তদন্তে দুদক

ঢাকা, ১ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

বিমানবন্দর ‘খেকো’ মালেক, তদন্তে দুদক

তাসলিমুল আলম তৌহিদ ১২:৫০ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৯, ২০১৯

বিমানবন্দর ‘খেকো’ মালেক, তদন্তে দুদক

এক’দুটি নয়, ৩৬টি খাত। বেশিরভাগই সেবা। সেবাকে বাণিজ্য বানিয়ে, সেখান থেকেই কামান কোটি কোটি টাকা। বিগত ১০ বছরে রীতিমতো টাকার কুমির বনে গেছেন।

তিনি এমএ মালেক। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রত্যেকটি খাতে সরকারি বিধি রয়েছে। সেটি ভাঙতেই যেন উস্তাদ মালেক। নিয়ম না মেনে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে বিমানবন্দর থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

প্রকৌশলী এমএ মালেকের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরের ৩৬টি উন্নয়নমূলক খাত থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পেয়ে তা অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে এই অনুসন্ধান চলছে। অনুসন্ধান টিমের দলনেতা দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সালাউদ্দিন। সদস্য হিসেবে আছেন সহকারী পরিচালক মো. সাইদুজ্জামান। আর সার্বিক বিষয় তদারক করছেন দুদকের পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, এমএ মালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে গিয়ে বিগত ১০ বছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিভিন্ন কাজ থেকে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এয়ার কন্ডিশনার ডাক্ট স্থাপন, এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম আপগ্রেডেশন, বিমানবন্দরে কাউন্টার এবং কনভেয়ার বেল্ট স্থাপন, তার যন্ত্রাংশ সরবরাহ, নতুন বোডিং ব্রিজ স্থাপন, পুরাতন বোডিং ব্রিজে যন্ত্রাংশ সরবরাহ ও স্থাপন, বিমানবন্দরের বিভিন্ন স্থানে এলইডি লাইট কেনা ও ফিটিংস, বাগান আলোকসজ্জা, এইচটি এবং এলটি সুইচগিয়ার স্থাপন কাজের নামে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

বিমানবন্দরের ফ্লোর মাউন্টেড এবং ওয়াল মাউন্টেড প্যানেল স্থাপন, বিমানবন্দরে বিভিন্ন সাইজের পাওয়ার ক্যাবল সরবরাহ, এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইটিং সিস্টেম স্থাপন, রানওয়ে/টেক্সিওয়ে/এপ্রোন লাইট ও লাইট ফিটিংস সরবারহ, আবাসিক ভবনে ইন্টারন্যাল ইলেকট্রিফিকেশন কাজ, সিএএবির নতুন সদরদফতর ভবনের বিভিন্ন ইকুপমেন্ট সরবরাহসহ ইএম সংক্রান্ত কাজ, সিএএবির নতুন সদরদফতর ভবনের বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, সিএএবির সদরদফতর ভবন, টার্মিনাল বিল্ডিংসহ বিমানবন্দরের অন্যান্য ভবনের ডেকোরেশেন সংক্রান্ত কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ইএম কাজ, বিভিন্ন স্থানে এপ্রোন মাস্ট লাইট স্থাপন, সিসিআর বিল্ডিং সংশ্লিষ্ট সকল ইএম কাজ, রানওয়ে লাইটিংয়ের জন্য বিভিন্ন সাইজের ক্যাবল সরবরাহ ও সংস্থাপন কাজে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া এমএ মালেকের বিরুদ্ধে বিমানবন্দরের সিসিআর ও কনট্রোল টাওয়ার থেকে রানওয়ে টেক্সিওয়ে ও এপ্রোন ক্যাবল সরবারহ স্থাপনের কাজ, বিভিন্ন স্পিলিট টাইপ ও উইনডো টাইপ এসি সরবারহ ও সংস্থাপন, রানওয়ে/টেক্সিওয়ে/এপ্রোন লাইটিংয়ে জন্য স্টান্ডবাই ক্যাবল ও জেনারেটর সরবরাহ, বিভিন্ন সাইজের সাইনেজ স্থাপন, ফায়ার এলার্ম ও ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ব্যতিত ইএমের বিভিন্ন কাজের আওতায় ডাবলক্যাব পিক-আপ/জিম কেনাসহ তিন বছরের জন্য তাদের ড্রাইভার, তেল ও মেইনটেন্স খরচ, বিমানবন্দরে ব্যাগেজ সিস্টেম আধুনিকায়নের নামে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা খরচ, টর্মিনাল ভবনে কোটি কোটি টাকার লাইট এবং লাইট ফিটিংস সরবারহ ও সংস্থাপন, টার্মিনাল ভবনসহ বিমানবন্দরের বিভিন্ন ভবনে লিফট স্থাপনসহ তার বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সরবারহ, টার্মিনাল ভবনে বিভিন্ন ইএম কাজ যথা: এসি, লিফট, ব্যাগেজ সিস্টেম, বোডিং ব্রিজ প্রভৃতি স্থাপনের ইকুপমেন্টের জন্য ১/৩/৫ বৎসরের বিভিন্ন ঠিকাদারের সঙ্গে অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তির আওতায় সম্পাদিত কাজে জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে দুদকের এক কর্মকর্তা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘বেবিচকের প্রকৌশলী এমএ মালেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ এসেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে আমরা ৩৬টি খাতের দুর্নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছি।’

তিনি বলেন, ‘৩৬টি খাতে দুর্নীতি অনেক বড় ইস্যু। বলা চলে বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এই ব্যক্তি একা গিলে খেতে চাইছেন। একসঙ্গে সবগুলোর অনুসন্ধান সম্ভব নয়। ১০টি করে বেবিচকের টেন্ডার বা কাজের তথ্য চাওয়া হচ্ছে। তার ভিত্তিতে এমএ মালেকের দুর্নীতির তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।’

দুদকের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সরকারি কাজ না করে এমএ মালেক অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তদন্ত যাতে সঠিক এবং আমাদের বোধগম্য হয়, সেজন্য আমরা এক্সপার্ট বা প্রকৌশলী রেখেছি। একটু সময় লাগলেও তাকে জালে ঠিকই ধরা হবে। কারণ, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স।’

দুদক সূত্রে জানা গেছে, বেবিচকে নির্মাণকাজ বা উন্নয়নমূলক কাজে টেন্ডার নিয়ে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। ইতোমধ্যে দুদকে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বিরুদ্ধে একাধিক তদন্ত চলমান রয়েছে। আরও বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বেবিচকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমএ মালেকের মোবাইল ফোনে একাধিকার যোগাযোগ করেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

টিএটি/আইএম

 

পরিবর্তন বিশেষ: আরও পড়ুন

আরও