যেসব সুবিধা পাবেন ড্রিমলাইনারের যাত্রীরা

ঢাকা, বুধবার, ২১ নভেম্বর ২০১৮ | ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

যেসব সুবিধা পাবেন ড্রিমলাইনারের যাত্রীরা

তাসলিমুল আলম তৌহিদ ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২০, ২০১৮

যেসব সুবিধা পাবেন ড্রিমলাইনারের যাত্রীরা

জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে যুক্ত হতে যাওয়া বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্বলিত সম্পূর্ণ নতুন বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ (আকাশবীণা)। রোববার বিকেল  ৫ টা ২৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমানের ড্রিমলাইনার  আকাশবীণা। এর মধ্যে দিয়ে বিমানবহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়ালো ১৫টি।

জানা যায়, বিজি-২৮০১ ফ্লাইটটি যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল পেনফিল্ড থেকে কোন যাত্রা বিরতি ছাড়াই টানা সাড়ে ১৪ ঘন্টা উড়ে ঢাকায় আসে। বোয়িংয়ের ক্যাপ্টেন রিচার্ড এম ডেনটন, ক্যাপ্টেন চার্লি ক্রিস্টেনসন, বিমানের ক্যাপ্টেন ফজল ও ফার্স্ট অফিসার আনিতা রহমান ফ্লাইটটি পরিচালনা করেন।

সিয়ালটলে বোয়িং ফ্যাক্টরি থেকে ড্রিমলাইনার বিমানটি গ্রহণ করেন বিমান পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) ইনামুল বারীর নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল। বহরে যুক্ত হওয়া ড্রিমলাইনারকে শাহজালাল বিমানবন্দরে ওয়াটার ক্যানন স্যালুটের মাধ্যমে স্বাগত জানানো হয়।

এ সময়  উপস্থিত ছিলেন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও এ এম মোসাদ্দিক আহমেদ, পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম, পরিচালক (গ্রাহক সেবা) আলী আহসান, পরিচালক অর্থ বিনিত সুধ, পরিচালক পরিকল্পনা এয়ার কমোডর মোহাম্মদ মাহবুব জাহান খান (অবঃ), পরিচালক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড ম্যাটেরিয়াল ম্যানেজমেন্ট গ্রূপ ক্যাপ্টেন কেএইচ সাজ্জাদুর রহিম (অবঃ),  পরিচালক বিপণন ও বিক্রয় আশরাফুল আলম, মহাব্যবস্থাপক শাকিল মেরাজ সহ বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের  উদ্ধর্তন কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।

বিমানের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) শাকিল মেরাজ জানান, ড্রিমলাইনার দিয়ে প্রাথমিকভাবে ঢাকা-সিঙ্গাপুর ও ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করা হবে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর হবে বিমানটির প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা। ট্যাক্স ও চার্জ বাদে ঢাকা-সিঙ্গাপুর-ঢাকা রুটে ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া ২০০ মার্কিন ডলার এবং ঢাকা-কুয়ালালামপুর-ঢাকা রুটে ইকোনমি ক্লাসের ভাড়া ২৯০ মার্কিন ডলার।

বিমান পরিচালনা পর্যদের চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল ইনামুল বারী (অব.) বলেন,  'আগামী ১ সেপ্টেম্বর বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সংবলিত সম্পূর্ণ নতুন বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমানের প্রথম ফ্লাইট উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার পছন্দে এর নামকরণ হয়েছে আকাশবীণা।'

বিমান সূত্রে জানা যায়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ২০০৮ সালে মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং কোম্পানির সঙ্গে ১০টি নতুন বিমান ক্রয়ের জন্য ২ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউএস ডলারের চুক্তি করে। ইতোমধ্যে বহরে যুক্ত হয়েছে ছয়টি বিমান। বাকি চারটি বিমান হলো বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রিমলাইনার। এর প্রথমটি রবিবার বিমান বহরে যুক্ত হলো। বাকী তিনটির একটি এবছর নভেম্বরে এবং সর্বশেষ দুটি আসবে আগামী বছর সেপ্টেম্বর মাসে।

ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারটি ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজের নাম দিয়েছেন। যার প্রথমটি হচ্ছে আকাশবীণা। বাকি তিনটা হচ্ছে হংসবলাকা, গাঙচিল ও রাজহংস।

১৬ ঘন্টা উড়তে সক্ষম:

টানা ১৬ ঘণ্টা উড়তে সক্ষম এই ড্রীমলাইনার চালাতে অন্যান্য বিমানের তুলনায় ২০ শতাংশ কম জ্বালানি লাগবে। এটি ঘণ্টায় ৬৫০ মাইল বেগে উড়তে সক্ষম। বিমানটির ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেক্ট্রিক (জিই)। বিমানের শব্দ কমাতে ইঞ্জিনের সঙ্গে শেভরন যুক্ত রয়েছে। বিমানটি নিয়ন্ত্রণ হবে ইলেক্ট্রিক ফ্লাইট সিস্টেমে। কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল দিয়ে তৈরি হওয়ায় এই বিমান ওজনে হালকা। ভূমি থেকে বিমানটির উচ্চতা ৫৬ ফুট। দুটি পাখার আয়তন ১৯৭ ফুট।

ড্রিমলাইনারের যাত্রীদের জন্য থাকছে নানা সুবিধা:
আকাশবীণায় আসন সংখ্যা ২৭১টি। এর মধ্যে বিজনেস ক্লাস ২৪টি আর ২৪৭টি ইকোনমি ক্লাস। বিজনেস ক্লাসের আসনগুলো বানিয়েছে অ্যাসটেলা। আর ইকোনমি ক্লাসের আসনগুলো হেইকোর বানানো। বিজনেস ক্লাসে ২৪টি আসন ১৮০ ডিগ্রি পর্যন্ত সম্পূর্ণ ফ্ল্যাটবেড হওয়ায় যাত্রীরা আরমদায়কভাবে ভ্রমণ করতে পারবেন। দু’পাশের প্রত্যেক আসনের পাশে রয়েছে বড় আকারের জানালা। একইসঙ্গে জানালার বোতাম টিপে আলো নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। জানালা থেকে শুরু করে কেবিনেও রয়েছে মুড লাইট সিস্টেম। ফলে যাত্রীরা সহজেই পরিবর্তন করতে পারবেন লাইটিং মুড। দীর্ঘ সময় ভ্রমণেও যাত্রীরা যেন ক্লান্তি অনুভব না করেন সেজন্য এর ভেতরে এয়ার কম্প্রেসার সিস্টেম অন্যান্য বিমানের তুলনায় উন্নত।

আসন নিলাম:
ড্রিমলাইনার ফ্লাইট উড্ডয়নের পরে বিজনেস ক্লাসে কোনও আসন ফাঁকা থাকলে ইকোনমি ক্লাসের যাত্রীরা সেটিতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এজন্য উড়ন্ত অবস্থায় একটি নিলামে অংশ নিতে হবে তাদের। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা টাকা পরিশোধ করে ইকোনমি ক্লাস থেকে বিজনেস ক্লাসের আসনে স্থানান্তরের সুবিধা পেয়ে যাবেন।

দেখা যাবে টেলিভিশন:
ড্রিমলাইনারের ইন ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট (আইএফই) সেবা দিতে প্যানাসনিক এভিওনিকস করপোরেশনের সঙ্গে চুক্তি করেছে বিমান। প্রতিটি আসনের সামনে প্যানাসনিকের এলইডি এস-মনিটর রয়েছে। মনিটিরে বিবিসি, সিএনএনসহ ৯টি টিভি চ্যানেল দেখা যাবে। একইসঙ্গে ড্রিমলাইনারের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট সিস্টেমে (আইএফই) থাকবে ১০০টির বেশি ক্ল্যাসিক থেকে ব্লকবাস্টার চলচ্চিত্র। এছাড়া রয়েছে বিমানের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত ভিডিও গেমস।

ওয়াইফাই সুবিধা:
অত্যাধুনিক বোয়িং ৭৮৭-৮ ড্রীমলাইনার সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪৩ হাজার ফুট দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময়ও ওয়াইফাই সুবিধা পাবেন যাত্রীরা। বিমানে ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে প্রত্যেক যাত্রী ১৫ মিনিটের জন্য বিনামূল্যে ১০ মেগাবাইট ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবেন। এরপরও কোনও যাত্রী ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হলে চার্জ দিতে হবে। ১০০ মেগাবাইটের জন্য ৮ ডলার, ৩০০ মেগাবাইটের ১৬ডলার আর ৬০০ মেগাবাইটের জন্য ৩২ ডলার হারে চার্জ দিতে হবে যাত্রীদের।

মোবাইলে কথা বলা:
এছাড়া মোবাইল ফোনে রোমিং সুবিধা থাকলে আকাশে উড্ডয়নের সময় কল করতে পারবেন যাত্রীরা। এজন্য ২৫টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে করা হয়েছে চুক্তি। বিমানটি যে স্থানের ওপর দিয়েই যাবে, যাত্রীদের সামনে তখন স্ক্রিনে দেখা যাবে থ্রিডি ম্যাপ। একইসঙ্গে উঠে আসবে সেই স্থানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

কেনাকাটা:
ড্রিমলাইনারে ভ্রমণকালীন যাত্রীরা চাইলে আকাশে কেনাকাটাও করতে পারবেন। এই উড়োজাহাজে অলঙ্কার ও সুগন্ধিসহ বিভিন্ন পণ্য কেনা যাবে শুল্কমুক্ত সুবিধায়। যাত্রীদের পছন্দমতো খাবারও থাকবে ড্রিমলাইনারে।

উড়োজাহাজটির ককপিট:
উড়োজাহাজটির ককপিটে রয়েছে নতুনত্ব এটি একটি পেপারলেস এয়ারক্রাফট সেখানে থাকছে হেডআপ ডিসপ্লে। এর মাধ্যমে চোখের সামনের প্রয়োজনীয় তথ্য দেখতে পারবেন পাইলটরা। সার্বক্ষণিক ইন্টারনেটের মাধ্যমে ঢাকায় বিমানের ফ্লাইট অপারেশন রুমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এটি। এর মাধ্যমে উড়োজাহাজের ইঞ্জিন, ককপিট, ফুয়েল, নেভিগিয়েশনসহ সব তথ্য জানতে পারবেন ফ্লাইট অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তারা। যেকোন সমস্যা সৃষ্টি হলে তারা অপারেশন রুম থেকে পাইলটকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারবেন। এজন্য ঢাকায় বিমানের প্রধান কার্যালয়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সার্ভার স্থাপন করা হয়েছে।

কোন ক্রুটি থাকলে জানা যাবে:
ফ্লাইট শেষে দেশে ফেরার আগেই ড্রিমলাইনারের কোনও সমস্যা আছে কিনা তা জানতে পারবেন প্রকৌশলীরা। তাই ত্রুটি পেলে উড়োজাহাজটি দেশে পৌঁছানোর আগেই প্রস্তুতি নিতে পারবেন তারা। ফলে যেকোনও সময় ককপিট থেকে ফ্লাইট অপারেশন রুমের সহায়তা নিতে পারবেন পাইলটরা। একইসঙ্গে আকাশে ওড়ার সময় আইপ্যাড ও ট্যাব ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য নিতে পারবেন তারা।

উড়োজাহাজ পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষণ:
ড্রিমলাইনার পরিচালনার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বিমানের ১৪ জন পাইলট। ড্রিমলাইনার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে প্রকৌশল বিভাগের ১১২ জনকে। এছাড়া কেবিন ক্রূদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

এয়ারক্রাফটগুলো চালাবেন বিমানের শীর্ষ ১৪ জন বৈমানিক। তারা হলেন- ক্যাপ্টেন আমিনুল ইসলাম, সিদ্দিক, শোয়েব চৌধুরী, তানভীর, ইমরান, সাজ্জাদুল হক, মাহবুবুর রহমান, নাদিম হাসান, ইসতিয়াক হোসেন, ইমামুল, ইলিয়াস হোসেন, আদম চৌধুরী, জয়নাল মিয়া ও নারী ক্যাপটেন আলেয়া মান্নান। এই ১৪ জনই স্বপ্নের বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজ চালনায় যুক্ত হয়েছেন।

এর আগে ২০১১ সালে যখন বিমানের বহরে প্রথম চতুর্থ প্রজন্মের উড়োজাহাজ ৭৭৭-৩০০ ইআর যুক্ত হয়, তখন পরিস্থিতি এ রকম ছিল না। বিদেশি বৈমানিক দিয়েই এই উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে হয়েছিল।

ফলে এবারই প্রথম ফ্লাইট থেকেই বিদেশি বৈমানিক ছাড়া বিমান নিজস্ব বৈমানিক দিয়ে নতুন উড়োজাহাজ চালনার পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে করে বিমান কোটি কোটি টাকা অর্থ সাশ্রয় করতে পারবে বলে বিমান কর্তৃপক্ষ মনে করছেন।

টিএটি/