খুনিদের রাজত্ব আর কোনো দিন আসবে না: প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা, রবিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫

খুনিদের রাজত্ব আর কোনো দিন আসবে না: প্রধানমন্ত্রী

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ১০:৩২ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৮

খুনিদের রাজত্ব আর কোনো দিন আসবে না: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আর কোনো দিন খুনিদের রাজত্ব ফিরে না আসার ব্যাপারে দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ আর কোনো দিন খুনিদের ক্ষমতায় আসতে দেবে না।’

বৃহস্পতিবার বিকেলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতির পিতার ৪৩তম শাহাদৎবার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত স্মরণসভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ আস্থা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘খুনিদের রাজত্ব এদেশে আর আসবে না, আসতে দেয়া হবে না। মুজিব আদর্শের প্রতিটি সৈনিককেই এই প্রতিজ্ঞা নিয়ে চলতে হবে, কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া যাবে না।’

জাতির পিতার হত্যকাণ্ডের বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে যত বড়ই হোক, কেউ যদি কোনো অন্যায় করে তার বিচার বাংলাদেশের মাটিতে হবেই।’

তিনি বলেন, ‘যারা বংশপরম্পরায় এই চক্রান্ত করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণকে বলব— এদের সম্পর্কে আপনাদেরও সচেতন থাকতে হবে। কারণ, এরা বাংলাদেশের উন্নয়ন, মানুষের কল্যাণ, মানুষের ভাল দেখতে চায় না। শুধু নিজেরাই ভালো থাকতে চায়।’

নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টার অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীদের দেশের উন্নয়ন সহ্য হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘যারা শিশুদের নিয়ে খেলতে চায়, তাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়, তারা বাংলাদেশের জনগণের ভবিষ্যতকেই আসলে অন্ধকারে ঠেলে দিতে চায়। আলোর পথে যাত্রায় বাধা দিতে চায়।’

অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া প্রমুখ বক্তৃতা করেন।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম, সিমিন হোসেন রিমি, কেন্দ্রীয় নেতা আনোয়ার হোসেন আলোচনায় অংশ নেন। সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন আহকাম উল্লাহ।

দলের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম স্মরণ সভাটি পরিচালনা করেন।

শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, ‘আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা এবং ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে জাতির পিতার খুনিদের বিচারের পথ রুদ্ধ করেছিলেন অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলকারী সেনাশাসক জিয়াউর রহমান। আর তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ভোট চুরি করে সেই খুনিদের জাতীয় সংসদে বসিয়েছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘তার অর্থ কি দাঁড়াচ্ছে জিয়া শুধু নিজেই নয়, তার স্ত্রীও ১৫ আগস্ট হত্যার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

খুনিরা সব সময়ই খুনিই হয় উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সেই খুনিরাই ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা করেছে এবং বারবার হত্যার চেষ্টা করছে। কাজেই, এদের হাতে ক্ষমতা গেলে দেশের উন্নতি কি হবে? প্রশ্ন রাখেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অন্যায়ের মাধ্যমে যাদের ক্ষমতায় আরোহন তারা কখনো ন্যায়বিচার করতে পারে না।’

তিনি এ সময় শহীদ রমিজউদ্দিন স্কুলের দুই শিক্ষার্থীর সম্প্রতিক বাসচাপায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা আবার সক্রিয় হয়েছিল উল্লেখ করে বলেন, ‘বাস চাপায় দুটি শিশু মারা গেল, সঙ্গে সঙ্গে তার সরকার পদক্ষেপ নিয়ে ওই ঘাতক বাসের ড্রাইভার-হেলপারকে গ্রেফতার করলেও ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় বেরিয়ে আসার পর কারা উস্কানি দিয়েছে।’

তিনি বলেন, তার করে দেয়া ডিজিটাল বাংলাদেশের সুযোগ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে উস্কানি দিয়ে দিয়ে, মিথ্যা কথা বলে বলে দেশে একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য কি?

এখানে উস্কানিদাতাদের অনেকেই অনেক বড় বড় আঁতেল হলেও তাদের রক্তের সূত্রটা ওই পাকিস্তানেই উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি এদের কাউকে কাউকে গ্রেফতারে আবার মিডিয়ায় অহেতুক আলোড়নের সমালোচনা করে বলেন, কেউ যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোমলমতিদের উস্কানি দিয়ে ভুল পথে পরিচালিত করতে চায় তাহলে তাদের গ্রেফতার করে ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে স্কুলছাত্র সেজে স্বার্থান্বেষী মহলের অনুপ্রবেশের উল্লেখ করে বলেন, ‘ওই বুড়োদের আবার গুড়ো হওয়ার সাধ জাগলো কেন? উদ্দেশ্যটা কি? ব্যাগে বইয়ের পরিবর্তে দা, চাইনিজ কুড়াল, পাথর, অস্ত্রশস্ত্র তাহলে এরা আবার কোন স্কুলের ছাত্র?’

তিনি এ সময় দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী এবং এক শ্রেণির মিডিয়ার কাঠোর সমালোচনা করে তাদের দেশ ও জাতির স্বার্থে বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশনের আহবান জানান এবং তার সরকারের সময় বলবৎ থাকা মিডিয়ার অবাধ স্বাধীনতার অপব্যবহার করে কেউ যেন দেশ ও জাতির কোনো ক্ষতি সাধন না করেন সেদিকে সতর্ক করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার যাতে জনপ্রিয়তা হারায় তা নিশ্চিত করাই যেন কিছু কিছু পত্রিকার কর্তব্য। কারণ, দেশে যখন অসংবিধানিক সরকার থাকে, দেশে যদি কোনো গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকে, তখন এই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীদের কাছে তাদের কদর বাড়ে। এরা একটা পতাকা পাবে, ব্যবসা পাবে, এরাই সুযোগ সন্ধানী।

তিনি অভিযোগ করেন, এদের কারণেই বাংলাদেশের মানুষকে বারবার বিপদে পড়তে হয়েছে। এদের কারণেই দেশের মানুষ বারবার তাদের অধিকারহারা হয়েছে। বাংলাদেশ বারবার গণতন্ত্র হারিয়েছে, এরাই সংবিধান ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। আর এরা এখনো তাদের পূর্বপ্রভূদের ভুলতে পারে না। পাকিস্তানিদের পদলেহন করাই তাদের চরিত্র।

ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে গেল বলে আজকে এই শ্রেণির মন খারাপ, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

জাতির পিতার হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্তদের অধিকাংশ তার আশপাশের মানুষ- মেজর নূর শেখ কামালের সঙ্গে আতাউল গণি ওসমানির এডিসি, মেজর ডালিম, জিয়াউর রহমান এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের সর্বক্ষণই ধানমন্ডি ৩২ এর বাড়িতে যাতায়াত ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বেঈমানী-মুনাফেকির জন্য কার কথা বলব, কাকে দোষ দেব, আমার বাবার সঙ্গে যারা ছিলেন দীর্ঘদিনের সাথী, ক্ষমতার লোভে পড়ে, পাকিস্তানিদের দোসর হিসেবে তারা বেঈমানী-মুনাফেকি করেছেন।

তিনি বলেন, খুনি মোস্তাক রাষ্ট্রপতি হলো, সেই হত্যাকাণ্ডের ঘোষণা দিলো মেজর ডালিম। যে স্ত্রী-শাশুড়িসহ ২৪ ঘণ্টা আমাদের বাসায় পড়ে থাকতো। জিয়াকে একজন মেজর থেকে প্রমোশন দিয়ে জাতির পিতাই তাকে মেজর জেনারেল করেছিলেন এবং জিয়া এবং তার স্ত্রী প্রায়ই আমাদের বাসায় আসতেন।

তাদের বাসায় এসব ষড়যন্ত্রকারীদের ঘনঘন আসার নেপথ্যেই তাদের ষড়যন্ত্র চরিতার্থ করার উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল কিনা প্রশ্ন উত্থাপন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এভাবেই যদি আমি একটার পর একট ঘটনা বিশ্বেষণ করতে যাই তাহলে অনেক কিছুই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’

তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ভাগ হয়ে গেল। ছাত্রলীগকে ভাগ করে জাসদ করল। স্বাধীনতার সময় আমাদের সঙ্গে থাকা এসব শক্তিই সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠলো- কোনো কিছুই যেন তাদের ভালো লাগে না। কথায় কথায় জাতির পিতাকে গালি দেয়া এবং তাঁর বিরোধিতা করাই যেন তাদের একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, কিন্তু তারা কি তখন একটু উপলদ্ধি করেছিলেন- যে এই বিরোধিতা করার ফলে এদেশে কি অঘটন ঘটতে পারে। তারা কি একবারো ভেবেছিলেন তাদের এই বিরোধিতার সূত্রধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কত বড় সর্বনাশ হতে পারে? মনে হয় সে উপলদ্ধিটা তাদের ছিল না। থাকলে জাতির পিতাকে অন্তত কিছুদিন সময় দিতেন, দেশটাকে গড়ে তোলার এবং স্বাধীনতার ভিত্তিটাকে মজবুত করার, স্বাধীনতাকে অর্থবহ করার।

জাতির পিতাকে হত্যার পরই বাংলাদেশের নাম পরিবর্তন করে গণপ্রজাতন্ত্রীর বদলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র করে পাকিস্তানের আদলে প্রথমে ঘোষণা দেয়া হয়েছিল, যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই দেশে অপ্রচার শুরু হয়েছিল এবং সেই অপপ্রচার করে করেই জনগণের মাঝে একটি দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল।

তিনি বলেন, তবে ফারুক-রশিদ বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত এই দুই খুনি বিখ্যাত সাংবাদিক এন্থনি মাসকারহেন্সের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছিল, বঙ্গবন্ধু এতই জনপ্রিয় ছিল যে অপপ্রচার চালিয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা কম করতে সমর্থ না হওয়ায় তাদের তাঁকে হত্যা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না।

জাতির পিতা এদেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন এবং আমরা তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরে এদিয়ে যাচ্ছি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে, আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ, আমরা মহাকাশ জয় করেছি, আজকে দেশের মানুষের পেটে ভাত আছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত করেছি, ইনশাল্লাহ আমরা দারিদ্রমুক্ত করেই একে গড়ে তুলব।

জাতির পিতার আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না। জাতির পিতার স্বপ্নের সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব— এটাই আজকের দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা।

এসইউজে/আইএম

আরও পড়ুন...
‘বুড়োরা হঠাৎ স্কুলড্রেসে ছোট হতে চাইল’
জনপ্রিয়তাই বঙ্গবন্ধুর কাল হয়েছিল: প্রধানমন্ত্রী
গর্বিত এক বাংলাদেশের ছবি!
‘ছাত্র আন্দোলনের উস্কানিদাতা সবুর খানের বংশধররা’