ঈদে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে সড়ক

ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ঈদে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে সড়ক

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২:২৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৮

ঈদে দুশ্চিন্তা বাড়াচ্ছে সড়ক

ঈদযাত্রায় এবার সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দেশের সড়ক-মহাসড়ক। মহাসড়কে গত ১৫ দিনের মড়কের পরিসংখ্যানই এ আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠার প্রধান কারণ। ১ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১৫ দিনে সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৮০ জন। গত জুলাইয়ে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির দেওয়া তথ্যে উঠে আসে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৮৬০টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে ৩ হাজার ২৬ মানুষ। আহত হয়েছে ৮ হাজার ৫২০ জন।

গত মাসের ২৯ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে যে অভূতপূর্ব আন্দোলন রচনা করেছে সে সময়ই দেশের পরিবহন খাতের নগ্নচিত্র উন্মোচিত হয়েছে। যে চিত্র কখনো কেউ কল্পনাও করেনি সে চিত্রই ধরা পড়েছে সর্বত্র।

সারা দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা, অবৈধ, অপেশাদার চালকদের দৌরাত্ম্য, পুলিশ, বাস মালিক-শ্রমিকদের যোগসাজশে কী ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা পরিবহন খাতে বিদ্যমান তা দৃশ্যমান হওয়ার পর ভয় ও আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে। এ ছাড়া সড়কে নানা অব্যবস্থাপনার কারণে যাত্রাপথে ভোগান্তির বিষয়টিও ভাবাচ্ছে যাত্রীদের।

সেগুনবাগিচা এলাকার গৃহিণী সাহেনা আক্তার (৪০) গতকাল খোলা কাগজকে বলেছেন, আমার বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়ায়। প্রতি ঈদেই বাড়ি যাই। এবারও যাব। চেষ্টা করব ট্রেনে যাওয়ার। কিন্তু ট্রেনের টিকিট না পেলে বাড়ি যাব না। কারণ সড়কের যে অবস্থা পত্র-পত্রিকায় উঠে আসছে তাতে আতঙ্ক বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের সময় নাকি ফিটনেসবিহীন সব গাড়িই গ্যারেজে ঢুকানো হয়েছিল। এখন সেসব লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি রংচং করে রাস্তায় নামানোর প্রস্তুতি চলছে। এসব দেখার কেউ আছে বলে মনে হয় না। ১০ দিনের ট্রাফিক সপ্তায় যে পরিমাণ গাড়ি মামলা খেয়েছে সে গাড়িগুলোতে সড়কে চলবেই। তা হলে আমার জীবনের নিরাপত্তা বিধান করবে কে?

তিনি বলেন, এ ছাড়া, কোরবানির ঈদে পথে ভোগান্তি একটু বেশিই থাকে। কারণ পথে যত্রতত্র কোরবানি পশুর হাট বসে। এসব কারণে ভোগান্তির অন্ত থাকে না।

ইতোমধ্যে ঈদযাত্রায় দূরপাল্লায় লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি রাস্তায় নামানোর জন্য রং করার মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে। ঈদে যাত্রীদের বাড়তি চাপের সুযোগ নিয়ে অসাধু বাস মালিকরা ফিটনেসবিহীন লক্কড়ঝক্কড় বাস নামানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এ সময় চাপের কারণে দক্ষ ও পেশাদার চালকেরও অভাব থাকে। ফলে অবৈধ, অপেশাদার চালক এবং সহকারীদের দিয়ে গাড়ি চালানো হয় সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে। ফলে ঈদযাত্রা হয়ে ওঠে যাত্রীদের মরণযাত্রা।

রাজধানীর ডেমরা ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ ঘুরে দেখা গেছে সেখানকার সব ওয়ার্কশপেই চলছে পুরনো বাস রং করার মহাযজ্ঞ। ডেমরার এক ওয়ার্কশপের কর্মী, নাম প্রকাশ না করার শর্তে খোলা কাগজকে বলেন, প্রতিবছরই তো ঈদের আগে আমরা এসব বাস সারাই এবং রং করি। ঈদের সময় চাপও বেশি থাকে। এমনও হয়েছে একটা বাস আমি চার বছর ধরে সারাই আর রং করেছি। 

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিপুল পরিমাণে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ঈদে রাস্তায় নামে। এমনকি রাজধানীতে চলাচলকারী লক্কড়ঝক্কড় লোকাল বাসগুলোও ঈদের সময় দূরপাল্লায় যাতায়াত করে। এসব বাসচালকরা শহরের বাইরে গেলেই খেই হারিয়ে ফেলে। ফলে তারা রাস্তায় যানজট, দুর্ঘটনা ইত্যাদির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাজধানীসহ সারা দেশে কত সংখ্যক ফিটনেসবিহিন গাড়ি রয়েছে এ হিসাব জানা নেই দেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির (বিআরটিএ)। জানা গেছে, ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ফিটনেস নবায়ন না করা ৫৫ হাজার যানবাহনের তালিকা করেছে বিআরটিএ। বেসরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে ৫০ লাখের বেশি পরিবহন রয়েছে। চলতি বছরের ৩১ জুন পর্যন্ত বিআরটিএর তথ্যমতে দেশে বাস, মিনিবাস ও হিউম্যান হলারসহ মোট নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৩৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৭০টি। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় চলাচল করে ১১ লাখ ৪৩ হাজার ২৪৩টি। অবশ্য এসব পরিবহনের মধ্যে ২২ লাখের বেশি মোটরসাইকেল। এর মধ্যে কত সংখ্যক পরিবহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই তার হিসাব জানা নেই বিআরটিএর কাছে।

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির জরিপ বলছে বিআরটিএর নিবন্ধিত মোট পরিবহনের ৪০ শতাংশেরই ফিটনেস নেই। ৫০ লাখ যানবাহনের মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে মাত্র ৩৫ লাখ যানবাহনের। বাকি ১৫ লাখের কোনো সনদই নেই। আইন অনুযায়ী যেসব যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন নেই সেসব যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেটও নেই।

কেকে/আরপি