সড়ক তথৈবচ: ১৫ দিনে মৃত্যু ৮৪

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫

সড়ক তথৈবচ: ১৫ দিনে মৃত্যু ৮৪

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২:০০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ১৬, ২০১৮

সড়ক তথৈবচ: ১৫ দিনে মৃত্যু ৮৪

নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নজিরবিহীন আন্দোলনের কোনো ইতিবাচক প্রভাবই লক্ষ করা যাচ্ছে না দেশের সড়ক-মহাসড়কে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে লাইসেন্স ও ফিটনেসবিহীন যান নিষিদ্ধের দাবি তুলেছিলেন শিক্ষার্থীরা।

অনভিজ্ঞ, অপেশাদার চালক ও সহকারী দিয়ে গাড়ি চালনা বন্ধের পাশাপাশি বেপরোয়া যান চলাচলের কারণে সড়কে অব্যাহত মৃত্যু-বিভীষিকা বন্ধের আওয়াজও তুলেছিলেন তারা। তাদের দাবি মেনে নিয়ে রাজপথ থেকে তাদের নিরস্ত করলেও সড়কে মৃত্যু-বিভীষিকা রচনাকারী চালকদের বেপরোয়া যান চলাচল থেকে নিরস্ত করা যাচ্ছে না। বন্ধ করা যাচ্ছে অবৈধ ও ফিটনেসবিহীন যান চলাচলও।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন আইন সংশোধন করে তার খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ সভায়। সেখানে বিদ্যমান আইনে দোষী চালকদের সাজা তিন বছর থেকে বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর করা হয়েছে। সংসদের আগামী অধিবেশনে এ খসড়া উত্থাপিত হবে বলে জানা গেছে। আন্দোলনের চাপে গত ৫ আগস্ট থেকে বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করেছে পুলিশ। ট্রাফিক সপ্তাহের সাত দিনে সড়কের শৃঙ্খলা না মানায় চালক, মালিক, সহকারীদের বিরুদ্ধে এক লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৪টি মামলা দিয়েছে পুলিশ। জরিমানা করা হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯ হাজার ২২৩ টাকা। একই সময়ে ৪৬ হাজার ৭২৩ চালকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং তিন হাজার ৭৭৭ যানবাহন আটক করা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ সদর দপ্তর। ট্রাফিক বিভাগ পরে ট্রাফিক সপ্তাহ আরও তিন দিন বাড়িয়ে ১০ দিন করে।

এত আয়োজন, এত আঁটঘাট বাঁধার পরও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারছে না সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও মন্ত্রণালয়। গতকাল বুধবারও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী ও কিশোরগঞ্জে। সকালে রাজশাহী নগরীর নওদাপাড়া বাজার এলাকায় একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি দোকানে ঢুকে যায়। এ সময় এক মোটরসাইকেল আরোহীকেও চাপা দেয় বাসটি। এতে দুই মোটরসাইকেল আরোহী ও এক স্কুলছাত্রী নিহত হন। একই দিন বিকালে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে বাসচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার তিন যাত্রী নিহত হয়েছেন।

শুধু গতকালই নয়, চলতি মাসের গত ১৫ দিনই কোনো না কোনো সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে একাধিক মানুষের। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে বেপরোয়া ও নিয়ন্ত্রণহীন যান চলাচল এবং ফিটনেসবিহীন বাস, ট্রাকের কারণে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা খবর থেকে সড়ক দুর্ঘটনার যে তথ্য পাওয়া গেছে তাতে ১ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ১৫ দিনে সারা দেশে ৮০ জনের মৃতু্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০০ জন।

গত ১ আগস্ট মারা গেছে ৩ জন। এর মধ্যে দিনাজপুরে ১, সাতক্ষীরায় ১ ও কুমিল্লায় ১ জন রয়েছেন। ২ আগস্ট দুর্ঘটনায় মৃত্যুর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ৩ আগস্ট মারা গেছেন ৮ জন। তার মধ্যে রাজধানীর মগবাজারে ১, টাঙ্গাইলের সখিপুরে ১, ধামরাইয়ে ৪, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে ১ ও টাঙ্গাইলে ১ জন রয়েছেন। ৪ আগস্ট গাজীপুরে ১, নরসিংদীতে ১ এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ১ জনসহ মারা গেছেন ৩ জন। ৫ আগস্ট মারা গেছেন ৫ জন। তার মধ্যে নারায়ণগঞ্জে ১, পাবনায় ১, গাজীপুরে ১, চাঁদপুরে ১ এবং ঝিনাইদহে রয়েছেন ১ জন। ৬ আগস্ট সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ২ জন; জয়পুরহাটে ১ ও কুড়িগ্রামে ১ জন। পরদিন ৭ আগস্ট দিনাজপুরে ২ ও নীলফামারীতে মারা যায় ১ জন। ৮ আগস্ট সিলেটের গোলাপগঞ্জে ২ জন ও গাজীপুরে ১ জন মারা যায়। ৯ আগস্ট মারা যায় ৩ জন। তার মধ্যে চুয়াডাঙ্গায় ১, লক্ষ্মীপুরে ১ ও কুড়িগ্রামে রয়েছেন ১ জন। ১০ আগস্ট সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯। তার মধ্যে লালমনিরহাটে ৩, গাইবান্ধায় ২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১, সাভারে ১, আড়াইহাজারে ১ এবং খাগড়াছড়িতে রয়েছে ১ জন। ১১ আগস্ট মারা যায় ১১ জন। তার মধ্যে ময়মনসিংহে ২, ফেনীতে ১, ঝিনাইদহে ১, নেত্রকোনায় ১, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ১, জয়পুরহাটে ১, গাজীপুরে ১, নীলফামারীতে ১, লালমনিরহাটে ১ এবং গাইবান্ধায় রয়েছেন ১ জন। ১২ আগস্ট সড়কের মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪ জন; রাজধানীর গুলিস্তানে ১, নাটোরের বড়াইগ্রামে ১, ব্রাহ্মবাড়িয়ায় ১ এবং রংপুরে ছিল ১ জন। রংপুরে বাসচাপায় মৃত্যু হয় জিয়ন নামের এক স্কুলছাত্রের। তার মৃত্যুতে বিক্ষোভ করেছেন তার স্কুল রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। ১৩ আগস্ট নাটোরে ৩ জন, দিনাজপুরে ১ জন, পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ১ এবং কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে ১ জনসহ মারা গেছেন ৮ জন। ১৪ আগস্ট সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এদিন মারা গেছেন ১২ জন। তার মধ্যে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বিয়ের বরযাত্রীবাহী মাইক্রোবাসের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা গেছেন নারী-শিশুসহ ৭ জন। এছাড়া নওগাঁয় ১, সাতক্ষীরায় ১, গাজীপুরে ১, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ১ এবং শেরপুরে মারা গেছেন ১ জন। সর্বশেষ গতকাল সকালে রাজশাহী নগরীর নওদাপাড়ায় দোকানে বাস উঠিয়ে দিলে ৩ জন এবং কিশোরগঞ্জে বাসচাপায় সিএনজি অটোরিকশার তিন যাত্রী নিহত হয়েছেন।

এর আগে গত জুলাই মাসে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৮৬০টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। যেখানে মারা গেছে ৩ হাজার ২৬ জন। আর আহত হয়েছে ৮ হাজার ৫২০ জন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ ব্যাপারে খোলা কাগজকে বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে সড়কে নিরাপত্তা বিধানে আইনকে আরও শক্তিশালীকরণ, পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলা আনয়নের ব্যাপারে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করছি। পরিবহন সেক্টরে সিন্ডিকেট বাণিজ্যসহ এবং নানা ধরনের অনয়িম, দুর্নীতি, অসাধু মালিক-চালক-সহকারী সর্বস্তরে অপেশাদার মনোভঙ্গির বিরুদ্ধে কথা বলে আসছি।

তিনি বলেন, আমাদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামকে আমলে নেয়নি সরকার। তাই জনমনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। যা থেকে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীরা একযোগে সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার দাবিতে মাঠে নামে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা দেখিয়ে দিয়েছে সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও সড়কে শৃঙ্খলা কীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়। আমাদের শিক্ষার্থীরা একটা নাড়া দিতে পেরেছে। সরকার দ্রুত পরিবহন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের সহায়তায় তহবিল গঠন, চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্দিষ্টকরণ, নারী ও প্রতিবন্ধী যাত্রীদের আসন সংরক্ষণ, সিটবেল্ট ব্যবহারসহ বেশ কিছু ইতিবাচক ধারা সংযোজন করা হয়েছে আইনে। আমরা দাবি জানিয়েছি, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ এর সম্পূর্ণ খসড়া জনস্বার্থে প্রকাশ করতে হবে।

কেকে/আরপি