দস্যুতায় রাজুরা, টাকা ‘বড় ভাইদের’ পকেটে

ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ৮ কার্তিক ১৪২৫

দস্যুতায় রাজুরা, টাকা ‘বড় ভাইদের’ পকেটে

মোহসীন-উল হাকিম ১১:০১ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ২১, ২০১৮

দস্যুতায় রাজুরা, টাকা ‘বড় ভাইদের’ পকেটে

সুন্দরবন, গোলপাতা আর লতাগুল্মের নান্দনিকতা। আছে চোখ জুড়িয়ে যাওয়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার, কতশত পশু-পাখির কিচির-মিচির। এতসব সৌন্দর্যের লীলাভূমিতেও বাস করে ভয়, আতঙ্ক। না, বাঘে ধরবে, সাপে কাটবে- এ আতঙ্ক নয়। আতঙ্ক মানুষ নামের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাণীকে নিয়ে, সুন্দরবনে যাদের নাম দেয়া হয়েছে বনদস্যু। এরা অগ্নিশর্মা চোখে রাত-বিরাতে অবিরত ছুটে চলে, হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। বারুদ পুড়িয়ে অন্যের স্বপ্ন কাড়ে, বোনে নিজের স্বপ্ন।

এদের কেউ ইচ্ছে করে বনদস্যু। কেউ বাধ্য হয়ে। কেউ বা প্রতিশোধের আগুন নেভাতে গিয়ে অন্ধকার গহ্বরে ডুবে গেছেন। দিন শেষে তাদেরও ভাবনায় আসে- আমি ভালো হব, অন্য সবার মতই সংসারী হব। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সুখের দিন গড়ব। কিন্তু, দস্যুতা জীবনের একটিই পিছুটান- একবার যে এ পথে পা বাড়ায়, ফিরে যাওয়ার থাকে না উপায়। মরে না হয় মেরে টিকে থাকে।

এতেই কী জীবনের সমাপ্তি! না, দিনশেষে যে সুখ স্মৃতিগুলো সম্পদ, সেখান থেকেই দস্যুরাও ফিরে আসতে চায় স্বাভাবিক জীবনে? হয় তো চায়, হয় তো না!

ভুল পথে সুন্দরবনের এসব স্বপ্ন বুনে চলা দস্যুগুলোর জন্যই আলোকবর্তিকা হয়ে আসেন মোহসীন-উল হাকিম। পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও যিনি গভীরে ভেবেছেন দস্যুদের একান্ত কষ্টগুলো। তাই তো বেসরকারি টেলিভিশন যমুনা টিভি’র এই বিশেষ প্রতিনিধি এগিয়ে গেছেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে সুন্দরবনের আতঙ্ক দস্যুদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

ইতোমধ্যে অনেকে ফিরে এসেছেন। আরও অনেকে আসার প্রক্রিয়ায় আছেন। কিন্তু, তাদের ফেরানোর পথে তাকে কতশত দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। জীবনকে হাতের মুঠোয় নিতে হয়েছে। গহীন বনে না খেয়ে, না নেয়ে ঘুরতে হয়েছে।

এরই মাঝে কোনো দস্যুর জীবনের গল্প শুনে হয়তো কেঁদেছেন, কারোটাতে ক্রোধে জ্বলেছেন। সে সব ক্ষুদ্র হাসি- কান্না, দুঃখ-বেদনা আর জীবন নিয়ে জীবন গড়ার জমিয়ে রাখা স্মৃতিগুলো মোহসীন-উল হাকিম ‘জীবনে ফেরার গল্প’ শিরোনামে পরিবর্তন ডটকমের পাঠকদের জানিয়েছেন—

জীবনে ফেরার গল্প- ২৩

রূপসার ছোট রাজু এক সময় আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করতো। তখন থেকেই ছোটখাটো অথচ হিংস্র মানুষটির ফেরারি জীবনের শুরু। পলাতক সেই জীবন থেকে বাঁচতে ছোট রাজু নাম লেখায় বনদস্যু বাহিনীতে।

এই দস্যুনেতার সঙ্গে প্রথম দেখা ২০১১ সালে রাজু বাহিনীতে। দ্বিতীয় দফা দেখা ২০১৩ সালে ইলিয়াস বাহিনীতে। সেখান থেকে দল ভাগ হয়ে জাহাঙ্গীর বাহিনীতে যোগ দেয় সে।

সুন্দরবনের দস্যু জাহাঙ্গীর বাহিনীর প্রধান ‘নাটা জাহাঙ্গীর’ নামে পরিচিত ছিল। দস্যুদের আত্মসমর্পণ শুরু হওয়ার পর থেকেই তার দলের সদস্যরা আগ্রহী হয়ে ওঠে। কিন্তু, দস্যুনেতা জাহাঙ্গীরের মাথায় তখন অন্য পরিকল্পনা।

সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য একবার তার দলের কয়েকজন সদস্য বৈঠকে বসে। জাহাঙ্গীর সাফ জানিয়ে দেয়, সে আত্মসমর্পণ করবে না। পরের রাতেই ছোট রাজুর নেতৃত্বে ছয় দস্যু পালিয়ে যায় অস্ত্র-গুলিসহ।

সেই দলটি অল্প কিছুদিন আলাদাভাবে দস্যুতা করে। ছোট রাজুর নামেই পরবর্তীতে সুন্দরবনের এই ডাকাত দলের নাম হয় ছোট রাজু বাহিনী (এই বাহিনীর নামকরণ নিয়ে গল্প আগেই লিখেছি)। হাড়বাড়িয়া, চরাপুটিয়া, ঘসিয়াংগাড়ি থেকে ছাপড়াখালি পর্যন্ত তাদের প্রভাব ছিল।

সুন্দরবনের চরাপুটিয়া থেকে তাদের আত্মসমর্পণের জন্য উঠানো হয়। সেই সফরের নেতৃত্বে ছিলেন বরিশাল র‍্যাবের অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার, উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবীরসহ তাদের টিম। আর আমার সঙ্গে ছিলেন বড় ভাই আবু সুফিয়ান, পলিন, ইয়ামিন ভাই।

ছোট রাজুর বাড়ি খুলনার আলাইপুরে। ক’দিন আগে দেখতে গিয়েছিলাম সাবেক জলদস্যু ছোট রাজুর ঘর-সংসার। বাড়ি বলতে জং ধরা টিনের চালের একটি ভাঙা মাটির ঘর।

নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা এখন সাবেক দস্যুনেতা ছোট রাজুর। তাহলে এত বছর দস্যুতা করার ফলাফল কী? পরিষ্কার উত্তর তিনি না দিলেও অনেকেই জানে এই টাকাগুলো কোথায় যায়?

ছোট রাজুর মত বিপন্ন ফেরারি মানুষদের ব্যবহার করে শহরের ভদ্রবেশী বড় ভাইরা। টাকাগুলো সেই বড় ভাইদের পকেটে ঢোকে। আর জঙ্গলে বছরের পর বছর দস্যু জীবন কাটিয়ে ছোট রাজুরা ফিরে খালি হাতে। অবশ্য কপাল যাদের খুব ভালো, তারাই ফিরতে পারে জীবনে। বনের ভেতরে গুলিতে কতজনের প্রাণ যায়, তার খবর তো আর লোকালয়ে খুব একটা আসে না।

আত্মসমর্পণের মাধ্যমে সুন্দরবনের ভয়ঙ্কর দস্যুরা ফিরে আসছে স্বাভাবিক জীবনে। জীবনে ফিরে তারা নতুন করে জীবন সাজানোর চেষ্টা করছে।

বয়সে তরুণ যারা, তাদের কাছে যুদ্ধটা অনেক সহজ। কিন্তু, ছোট রাজুর মত মধ্যবয়ষ্কদের জন্য তা অনেক চ্যালেঞ্জের।

ছোট রাজু এখন বাড়ির পাশের ভৈরব নদীতে মাছ ধরেন। আর অন্যের কাছে থেকে লিজ নেয়া ছোট্ট একটি মাছের ঘেরটিকে ঘিরেই তার জীবনে ফেরার স্বপ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তাদের এই কঠিন পথের সারথী হয়েছে সরকার। তবে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে যারা সংগ্রাম করছে, তাদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে র‍্যাব।

বরিশাল র‍্যাবের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে পুনর্বাসন প্রকল্প ‘সুন্দরবনের হাসি’। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এই প্রকল্পের সহযোগিতায় জীবনে ফিরবে আত্মসমর্পণ করা বনদস্যুরা। চলবে...।

আইএম

আরও পড়ুন...
জমির বিরোধে অলি হলেন দুর্ধর্ষ দস্যু
সুন্দরবনে মুখে মুখে ফেরে মেজর আদনান
মুক্তিপণের অভাবের ক্ষোভে ভয়ঙ্কর দস্যু হন ইলিয়াস
দস্যুদের প্রথম আত্মসমর্পণে লেগেছিল ৭ বছর
দস্যুদের জীবনে ফেরার গল্প
অস্ত্র ধরা আলমের শক্ত হাতে ইজিবাইক
জাহাঙ্গীরের নামেই কাঁপতো পুরো সুন্দরবন
যেভাবে ‘গায়ক’ এমদাদ হয়ে উঠলেন হিংস্র দস্যু (ভিডিও)
জীবনে ফেরার জন্যই দ্বন্দ্বে জড়ান ছোট রাজু
বাচ্চুর মৃত্যু আরিফকে এখনো কাঁদায়
কারাগারে বসেই জীবনের অর্থ খুঁজে পান দস্যু আকরাম
দস্যু নেতার সাহস দেখলাম সেদিন
‘লুঙ্গি পরেই আসেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসায় যাব’
‘দয়াল ফেরার কিছুদিনের মধ্যেই ভুল ভাঙল’
‘দস্যুরা বাবার ছবির পাশে রাখে আমার ছবি’
মোয়াজ্জিন হয়ে জীবনের অর্থ খুঁজছেন দস্যু রাঙ্গা