সড়ক দুর্ঘটনায় মেলে না ক্ষতিপূরণ

ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ৩ ভাদ্র ১৪২৫

সড়ক দুর্ঘটনায় মেলে না ক্ষতিপূরণ

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২:০২ পূর্বাহ্ণ, মে ২৫, ২০১৮

print
সড়ক দুর্ঘটনায় মেলে না ক্ষতিপূরণ

দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক ছিলেন মোজাম্মেল হোসেন মন্টু। ১৯৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর রাজধানীর শান্তিনগরে আনন্দ ভবনের সামনে উল্টো দিক থেকে আসা বাংলাদেশ ট্রান্সকম বেভারেজ কোম্পানির একটি মিনি ট্রাকের ধাক্কায় আহত হন।

 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৩ দিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে ১৬ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। দুই বছর পর তার স্ত্রী ক্ষতিপূরণ মামলা করেন। ১৪ বছর পর নিম্নে আদালত ক্ষতিপূরণের পক্ষে রায় দেয়। এরপর মামলাটি চলে যায় হাইকোর্টে। ২০১০ সালে উচ্চ আদালতও ক্ষতিপূরণের পক্ষে রায় দেয়। ছয় বছর পর ২০১৬ সালে আপিল বিভাগ ক্ষতিপূরণের রায় বহাল রেখে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে। এরপর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণের একটাকাও পাননি পরিবার।

পরিবহন ব্যবস্থায় নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা ও মালিক-চালকদের বেখেয়ালিপনা ও বেপরোয়া মনোভাব বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম সড়ক দুর্ঘটনাপ্রবণ দেশ। গত ১২ বছরে ৫১ হাজার সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সাড়ে ৫৭ হাজার মানুষ। ২০১৭ সালে ৪৯৯৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন প্রায় ৭ হাজার ৩৯৭ জন। গত কয়েকমাসে গণমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারিয়ে একের পর এক মৃত্যুর খবর দেশবাসীকে নাড়া দিয়েছে। এরমধ্যে রাজধানীর কারওয়ানবাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারানো রাজীব হাসানের মৃত্যু সবাইকে কাঁদিয়েছে। বাসে ঝুলে থাকা তার ছিন্ন হাতের ছবি আতঙ্কে বিহ্বল করেছে সবাইকে। হাত হারানোর সংবাদ প্রকাশিত হবার পর এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজীবকে কেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না- সে বিষয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। তার মৃত্যুর পর রাজীবের ভাইদেরকে কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে আদেশ দেন আদালত। তবে আপিল বিভাগ সেই রায় স্থগিত করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অবহেলাজনিত মৃত্যু ও অঙ্গহানির নানা ঘটনা ঘটলেও ভুক্তভোগী পরিবারের আদালতে যাওয়ার নজির খুব কম। কেউ কেউ আদালতে গেলেও মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যায়। আবার নিম্ন আদালত থেকে হাইকোর্ট হয়ে মামলা আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির পরও বিবাদীরা নানা অজুহাতে আদালতের আদেশও বাস্তবায়ন করেন না। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন, ঠিক তেমনি আদালতে শরণাপন্ন হতে আগ্রহী হচ্ছেন না। শুধু আলোচিত দুর্ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে মামলা হচ্ছে কিংবা উচ্চ আদালতে কেউ রিট করছে। এ রকমই আরেকটি আলোচিত মামলা চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও মুশীক মুনীর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ঘটনাটি। এ মামলায় ক্ষতিপূরণ দেবার রায় দিয়েছেন আদালত। যুগান্তকারী ওই রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছিলেন, এ রায়ের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আইনের শরণাপন্ন হবার দ্বার খুলল। তবে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা ও সংস্কৃতিতে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারের ক্ষতিপূরণ পাওয়াটা বেশ কঠিন। এ পর্যন্ত কেউই পাননি ক্ষতিপূরণ।

জাহাজের সঙ্গে ডিঙি নৌকার যুদ্ধ, ২৪ বছর আদালতের বারান্দায়
‘২৪ বছর অপেক্ষার পর এই রায় পেয়েছি। এটা জাহাজের সঙ্গে ডিঙি নৌকার যুদ্ধ করার মতো অবস্থা। আমি অনেক ছোট মানুষ। একটি কোম্পানির সঙ্গে লড়াই করে অনেক কষ্টে মামলা চালিয়েছি- কথাগুলো মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর স্ত্রী রওশন আক্তারের। ২০১৪ সালে আপিল বিভাগ যখন নিম্ন আদালত ও হাই কোর্টের দেওয়া ক্ষতিপূরণ আদেশ বহাল রেখে আদেশ দেন, সে সময় এভাবেই প্রতিক্রিয়া জানান অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক। জীবন সায়াহ্নে এসে থামেনি তার যুদ্ধ। আপিল বিভাগের সেই আদেশের পর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও একটাকাও ক্ষতিপূরণ পাননি তিনি। বছর বয়সী এই বৃদ্ধা এখন সবশেষ উপায় হিসাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ চান।


স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় রওশন আক্তার ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ট্রান্সকম বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেড এবং ট্রাক ড্রাইভারের বিরুদ্ধে তিন কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে ঢাকা তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেন। ওই মামলায় ২০০৫ সালের ২০ মার্চ আদালত ট্রান্সকম বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেডকে দুই কোটি ৫২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে ট্রান্সকম বেভারেজ কোম্পানি হাইকোর্টে আপিল আবেদন করে। ওই আবেদনের বিষয়ে ২০১০ সালের ১১ মে হাইকোর্ট রায় দেন। রায়ে মন্টুর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দুই কোটি এক লাখ ৪৭ হাজার টাকা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ফের আপিল করে ট্রান্সকম বেভারেজ কোম্পানি। ২০১৪ সালের ২০ জুলাই ক্ষতিপূরণের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। কিন্তু সে রায়ের অনুলিপি প্রকাশ না হওয়ায় ফের শুনানি শেষে ২০১৬ সালের ১৫ এপ্রিল ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেন আপিল বিভাগ। তবে বিবাদীপক্ষ ওই অর্থ দেয়নি। তাই অর্থ আদায়ের জন্য ডিক্রি জারি মামলা করা হয়। বিচারিক আদালত বিবাদীপক্ষের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন। এর পর ওই কোম্পানির তেজগাঁওয়ের পাঁচ বিঘা জায়গা নিলামে বিক্রির নির্দেশ দিয়ে ওই অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত দেন আদালত। তবে দুই দফা নিলাম ডাকা হলেও ক্রেতা না পাওয়ায় ওই জায়গা বিক্রি করা যাচ্ছে না।

ক্ষতিপূরণ পাননি তারেক মাসুদের পরিবার
২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোকা এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান চলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিশুক মনির। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে চুয়াডাঙ্গাগামী একটি বাসের সংঘর্ষ হয়। এতে তারেক মাসুদ ও মিশুক মনিরসহ মাইক্রোবাসের পাঁচ আরোহী নিহত হন। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা করে। ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা মানিকগঞ্জ জেলা জজ আদালতে মোটরযান অরডিন্যান্সের ১২৮ ধারায় বাস মালিক, চালক এবং ইনস্যুরেন্স কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ চেয়ে পৃথক দুটি মামলা করেন। পরবর্তী সময়ে সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুসারে মামলা দুটি হাইকোর্টে বদলির নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করেন বাদীরা। এক রুল আবেদনের পরিপেক্ষিতে মামলা দুটি হাই কোর্টে বদলি করা হয়।

২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেন। বাসের মালিক, চালক ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানিকে এই ক্ষতিপূরণের টাকা তিন মাসের মধ্যে দিতে বলা হয়। তবে সে টাকা এখনও পায়নি পরিবার।

রাজীবের পরিবারকে দেওয়া ক্ষতিপূরণের আদেশ আপিলে স্থগিত
গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর কারওয়ান বাজারে দুই বাসের রেষারেষিতে এক হাত হারান তিতুমীর কলেজর ছাত্র রাজীব হোসেন। গত ১৬ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। হাত হারানোর পর গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হলে আদালতে রিট করেন আইনজীবী রুহুল কুদ্দুস কাজল।

গত ৮ মে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ রাজীবের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেয়। এই টাকার অর্ধেক দিতে বলা হয় রাষ্ট্রীয় পরিবহন কোম্পানি বিআরটিসিকে এবং বাকি অর্ধেক দিতে বলা হয় স্বজন পরিবহনকে। এক মাসের মধ্যে এ ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। গত ২২ মে হাইকোর্টের এই আদেশ স্থগিত করেছে আপিল বিভাগ।

প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) ও স্বজন পরিবহনের করা লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে এ আদেশ দেন। আদেশে বলা হয়, কমিটি ক্ষতিপূরণ দিতে দায় নিরূপণ করবে। আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। দায়ীপক্ষ বা দায়ীপক্ষগুলো পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেবে।

কেকে/এএস

 
.


আলোচিত সংবাদ