কোটা নিয়ে ক্ষোভের নেপথ্যে কর্মসংস্থানের অভাব

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫

কোটা নিয়ে ক্ষোভের নেপথ্যে কর্মসংস্থানের অভাব

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৮

কোটা নিয়ে ক্ষোভের নেপথ্যে কর্মসংস্থানের অভাব

চাকরিতে কোটা কমানোর দাবিতে রাজধানী শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বড় ধরনের বিক্ষোভ ও সমাবেশ হয়েছে গত রোববার। তাদের দাবি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)সহ সব সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার সংস্কার করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ আসনে কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়।

তাদের ক্ষোভের কারণ চাকরির অভাব নাকি সরকারি চাকরি কেন্দ্রিক মানসিকতা এমন প্রশ্নে জবাবে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের অনারারি ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান গতকাল বিবিসিকে বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও শিক্ষিতদের মধ্যে চাকরির সম্ভাবনা সংকুচিত হচ্ছে। যে হারে চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে তার থেকেও বেশি হারে চাকরি প্রার্থী ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ থেকে পাস করে বের হচ্ছে। চাকরির বাজারে প্রতিবছর যত ছেলেমেয়ে আসছে সে তুলনায় কর্মসংস্থান তৈরি করা যাচ্ছে না।

ড. মুস্তাফিজ আরও বলেন, এ কারণে আমরা দেখছি একটা চাপ, অনেক ছেলেমেয়ে চাকরির জন্য রাস্তায় নামছেন। তিনি বলেন, এখানে দুটি বিষয় কাজ করে। সরকারি চাকরির পরীক্ষা যেহেতু দুই-তিন বছর পর পর হয় ফলে সেখানে একটা চাপ পড়ে। আবার বেসরকারি বিভিন্ন চাকরির জন্য যে বিজ্ঞাপন হচ্ছে সেখানেও দেখছি প্রতিটি পদের জন্য অনেক বেশি প্রতিযোগী বাড়ছে। সেটার একটা চাপ সরকারি খাতের ওপর বাড়ছে। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশের চাকরি ক্ষেত্রের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে বিদেশি নাগরিকদের হাতে।

তার ভাষায়, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বের হয়ে আসছে অনেক ছেলে-মেয়ে। কিন্তু তাদের অনেকেই চাকরির বাজারে যখন আসছে তখন খুব প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে হচ্ছে তাদের। অথবা যে ধরনের চাকরির যোগ্যতার প্রয়োজন পড়ছে সে ধরনের তারা হয়ে উঠতে পারছে না। এজন্য আমরা দেখছি বাংলাদেশের বাইরে থেকে এসে অনেকে কাজ করছে কিন্তু আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরা সেসব জায়গায় যেতে পারছে না। তিনি মনে করেন, সবাই যে সরকারি চাকরি করতে চান সেটাও না। কিন্তু ব্যক্তি খাতে নিজ উদ্যোক্তা হওয়ার যে চেষ্টা বা সুযোগের সম্ভাবনাও কম। শিক্ষিত বেকারদের জন্য সংকট আরও বেশি বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের যারা স্বল্প-শিক্ষিত তারা কিন্তু দেশের বাইরেও কর্মসংস্থানের জন্য যেতে পারছেন। কিন্তু যারা উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন তাদের দেশের ভেতরেই কর্মসংস্থান খুঁজতে হচ্ছে। আবার চাকরির ক্ষেত্রে চাহিদার যে দিকটি তার সাথে তাদের প্রস্তুতিও খাপ খাচ্ছে না।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে ২২ লাখ কর্মী শ্রমবাজারে প্রবেশের উপযুক্ত হয়। কিন্তু তাদের মধ্যে কাজ পায় মাত্র সাত লাখ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০১৬ সালে প্রকাশিত) বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে জাতীয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার লাখ ৫৫ হাজার ১৮৪ জন শিক্ষার্থী স্নাতক পাস করেছে। আর ৮৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছে ৬১ হাজার ৪৮২ জন। সেই হিসাবে ২০১৫ সালে মোট স্নাতক পাস করেছে পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ৬৬৬ জন। তবে ওই বছরে সরকারি কর্মকমিশনসহ (পিএসসি) অন্য সরকারি চাকরিতে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে নিয়োগ হয়েছে ১৫ থেকে ২০ হাজার কর্মী। এ ছাড়া সরকারি পর্যায়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি এবং বিভিন্ন ব্যাংকসহ বেসরকারি চাকরিতে নিয়োগ পাওয়া কর্মীর সংখ্যা দুই লাখের বেশি হবে না। তাতে দেখা যাচ্ছে, পাস করা বাকি তিন লাখ স্নাতকই বেকার রয়ে গেছে।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের হার কমেছে। পরের তিন বছর অর্থাৎ ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের পাশাপাশি সারা বিশ্বেই শ্রমবাজার সংকুচিত হবে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে কর্মসংস্থান কমেছে ৪.২ শতাংশ হারে। ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কমবে ৪ শতাংশ হারে।

২০১৫ সালে প্রকাশিত আইএলওর আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বেকারত্ব বাড়ছে- বিশ্বে এমন ২০টি দেশের তালিকায় ১২ নম্বরে রয়েছে বাংলাদেশ। আইএলওর মতে, বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির বর্তমান হার ৩.৭ শতাংশ। ২০১৯ সাল শেষে তা বেড়ে দ্বিগুণ হবে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রকাশিত শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৫ অনুযায়ী, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে শিক্ষিতদের জন্য মাত্র ছয় লাখ নতুন কর্মসংস্থান হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র তিন লাখ উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি চাকরি বা কাজ পেয়েছেন।

চাকরির বাজার কঠিন হয়ে পড়ায় মেডিকেল কিংবা প্রকৌশলে পড়াশোনা করেও অনেকে বাধ্য হয়ে যোগ দিচ্ছেন সাধারণ কোনো পেশায়। আবার বিশেষায়িত বিষয়ে পড়ালেখা করেও অনেকে চাকরি করছেন অন্য খাতে। সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাংলা, ইসলামের ইতিহাস বা দর্শনের মতো বিষয়ে পড়ালেখা করেও ব্যাংকে চাকরি নিচ্ছেন, এমন উদাহরণ মিলবে অনেক। এ ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, পরে সে বিষয়ে চাকরি না পাওয়ায় পেশার ক্ষেত্রেও উৎকর্ষ সাধন হচ্ছে না।

দেশে এখন ৩৯টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম চালু থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৮৫টি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথম পছন্দ থাকে সাধারণত বিবিএ (ব্যাচেলর অব বিজনেস অ্যাডমিনেস্ট্রেশন)। তবে পাস করার পর তারাও চাকরির বাজারে হন্যে হয়ে ঘোরে, জুতসই চাকরি জোটে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেন, মূলত দুই কারণে শিক্ষিত বেকার বাড়ছে। প্রথমত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। দ্বিতীয়ত স্কিল গ্যাপ (যোগ্যতার ঘাটতি) বাড়ছে। আমাদের দেশে এখন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কৃষি, সেবা ও শিল্পে। কিন্তু ডিমান্ড (চাহিদা) অনুযায়ী লোকবল সাপ্লাই (সরবরাহ) করা যাচ্ছে না। আমাদের শিক্ষিত বেকার বাড়লেও গার্মেন্ট, টেক্সটাইল ও লেদার গুডসে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কাজ করছে। মূলত যেসব খাতের গ্রোথ বেশি সেখানেই বিদেশিরা বেশি কাজ করছে। এখন সরকারের উচিত মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দেওয়া। যাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। আর যে ধরনের শিল্প গড়ে উঠছে তার সঙ্গে সংগতি রেখে কর্মী তৈরি করতে হবে। এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। বেশি জোর দিতে হবে কারিগরি শিক্ষায়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়েই এখন যেসব বিষয়ের চাহিদা রয়েছে বাংলাদেশে সেসব বিষয়ে পড়ার সুযোগ কম। বিশেষ করে ন্যানো প্রযুক্তি, বায়োটেকনোলজি, প্রকৌশল, নিউক্লিয়ার প্রকৌশল, প্রাণিসম্পদ, ভ‚মি ও পানিসম্পদ, দারিদ্র্য বিমোচন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বনজসম্পদ, মৎস্যসম্পদ, খনিজসম্পদ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও গ্যাস উত্তোলন, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নার্সিং, চর্মশিল্প, টেক্সটাইল প্রকৌশল, ফ্যাশন ডিজাইন, অ্যাপারেল ম্যানুফেকচারিং, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যাল, অটোমোবাইল প্রকৌশল, মেরিন আর্কিটেকচার, মেরিন বায়োলজি, সামাজিক বিজ্ঞান, পরিবেশ বিজ্ঞান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি বিষয়ে দু-চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকলেও তাতে আসন সংখ্যা খুব বেশি নয়।

কেকে/এমএসআই